কোন পথে বিএনপি :একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে হতাশ নেতাকর্মীরা

Pub: বুধবার, মে ১৫, ২০১৯ ৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, মে ১৬, ২০১৯ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে হতাশ নেতাকর্মীরা : বগুড়া-৬ উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে তৃণমূলের চাপে দলটি * দুই শতাধিক নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চান তারা

গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। কোনো সিদ্ধান্তেই অনড় থাকতে পারছেন না দলটির নেতারা। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নেতারা বলেছিলেন দলীয় সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না।

পরে তারা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০ দল নিয়ে ভোটে গেছেন।

ভোটের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখান থেকে বেরিয়ে জোটের কারও সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই শেষ দিন শপথ নিয়ে সংসদে গেছেন। সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন নিতে যাচ্ছে দলটি। কৌশলগত কারণে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি।

এখন ওই আসন শূন্য ঘোষণা করায় বিএনপি পুনর্নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। নির্বাচন ও শপথ ইস্যুতে এভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেয়নি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন- কোন পথে বিএনপি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে না পারার পেছনে যোগ্য নেতৃত্বের সংকট। তারা মনে করেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো নেতৃত্ব দলে অনুপস্থিত। যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালিত হচ্ছে বলা হলেও এতে কেউ বিচক্ষণতা দেখাতে পারছেন না।

এ কারণে গত এক বছরে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দলটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত খুব কমই নিতে পেরেছে। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত বিএনপিকে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে দলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতিও তারা বিশ্বাস করবে না। মনে করবে, দলটি তাদের এমন প্রতিশ্রুতি থেকে যে কোনো সময় সরে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা দেখাতে পারেনি দলটি। বারবার কৌশলের কথা বললেও সেই কৌশলেরই বলি হচ্ছেন নেতারা।

একাদশ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার পর এমপিদের শপথ গ্রহণকে কৌশলের অংশ বলে চালানো হয়। একইভাবে বগুড়া-৬ থেকে নির্বাচিত দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ না নেয়াকেও বলা হয় কৌশলের অংশ।

এতে আসনটি শূন্য ঘোষণা করায় সেখানে উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়েছে। নেতাকর্মীদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে- এ উপনির্বাচনে অংশ নেয়াটা কোন ধরনের কৌশলের অংশ। কারণ বিএনপির নেতা শপথ না নেয়ায় আসনটি শূন্য হয়। এখন সেই আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে তা হবে দেশের রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা।

কারণ, অতীতে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। অন্যদিকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর নির্বাচন বয়কট করা হলে তা হবে দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত। তাই শপথ নেয়ার পর উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে নৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বগুড়ার উপনির্বাচনে অংশ নিলে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো ভোটে বিএনপি যাবে না- ভবিষ্যতে দলের এমন অবস্থানও থাকবে না। নির্বাচনে অংশ নিলে এ ইস্যুতে রাজপথে কর্মসূচি দেয়াও তাদের জন্য কঠিন হবে। তাই সবমিলে কোন পথে হাঁটবে বিএনপি, তা নিয়ে দলের মধ্যে চলছে অস্থিরতা।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, এমপিদের শপথ ইস্যুতে দল ছাড়া শরিকদের মধ্যে কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

২০ দলীয় জোটের শরিকদের বিষয়টি আমরা ব্যাখ্যা করেছি। এতে তারা সন্তুষ্ট। আশা করি, বিষয়টি সবার কাছেই আরও স্পষ্ট হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিতে অনেক সময় কৌশলী হতে হয়।

এজন্য আগের অনেক সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসতে হয়। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই আমরা কিছু সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি। এটা ভালো না খারাপ, তা ভবিষ্যতেই বলে দেবে।

বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর তা প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ বিরোধী জোট। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির হাইকমান্ড।

কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে দলের নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যাওয়া নিয়ে চাপে ছিল দলটি। শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে শপথ নেন দলের পাঁচ এমপি। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে সরে পাঁচ এমপির শপথের বিষয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেন তারা। হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় দলের নেতাকর্মী এমনকি জোটের শরিকরা চরম ক্ষুব্ধ হন।

ক্ষোভ ও হতাশা থেকে জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ। জোটের ঐক্য সুদৃঢ় রাখতে তড়িঘড়ি করে সোমবার শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

সেখানে শপথ নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন তারা। এতে কিছুটা হলেও শরিকদের ক্ষোভ নিরসন হয়। কিন্তু ওই বৈঠকেই সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেয়া হবে বলে দলের এমন সিদ্ধান্তের কথা শরিকদের অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে বগুড়া-৬ উপনির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারেও ইতিবাচক মনোভাব দেখান বিএনপি নেতারা।

হঠাৎ দলটির এমন সিদ্ধান্তে জোটের শরিক এবং নেতাকর্মীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তারা মনে করেন, এভাবে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটিকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি এখন যে অবস্থায় পড়েছে তাতে সিদ্ধান্ত নেয়া তাদের জন্য কঠিন।

বিএনপির নেতারা যেখানে বলছেন নির্বাচনই হয়নি এবং সেটা দেখিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়নি, আবার ঘুরে গিয়ে এখন নির্বাচনে অংশ নেবেন, শপথ নেবেন- এসব তো স্ববিরোধী।

তার মতে, উপনির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করার মানে হবে তাদের ১৮০ ডিগ্রি টার্ন করার মতো। যারা বলছে নির্বাচন আমরা মানি না, তারা ঘুরে গিয়ে আবার উপনির্বাচনে অংশ নেবে, সেটা বিএনপির ইমেজ সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বিএনপি যদি বগুড়া-৬ উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তবে আগে ২০ দলীয় জোট এবং বিএনপির যে অবস্থান ছিল সেখান থেকে আমরা সরে যাচ্ছি।

বগুড়ায় প্রার্থী দিলে তখন জনগণের মনে প্রশ্ন আসবে, তাহলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কোরবানি দেয়া হল কেন। আবার জনগণও এত কষ্ট করবে কেন। বারবার সিদ্ধান্ত পাল্টালে তো নেতাকর্মী ও জনগণের কাছে আমাদের কোনো অবস্থান থাকবে না।

সূত্র জানায়, উপনির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে তৃণমূলের ব্যাপক চাপ রয়েছে। এমনিতেই পাঁচ এমপি সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ায় দুই শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন উপনির্বাচন ও সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয়া হলে ওইসব নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের চাপ আসবে।

এছাড়া তৃণমূল নেতাকর্মীদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে বলেও আশঙ্কা করছেন নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ায় দুই শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এত সংখ্যক নেতাকে বহিষ্কারের ঘটনা দলের ইতিহাসে আর ঘটেনি।

বহিষ্কৃতদের মধ্যে অধিকাংশ নেতাই দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন যদি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাহলে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। নাহলে দলের প্রাণশক্তি তৃণমূল নেতাকর্মীদের দলের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা কমে যাবে, যা ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম বলেন, সংসদে যাওয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গত জোটের বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়ে আমাদের অবহিত করা হয়।

তিনি বলেন, বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের সাতজন এমপি সংসদে গিয়েছে। তাহলে মহিলা এমপি কেন যাবে না। বগুড়া উপনির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে জোটের বৈঠকে আলোচনা হয়নি।

তবে আমরা মনে করছি, নির্বাচনে অংশ নেয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ইবরাহিম বলেন, বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আমরা বৈঠকে বলেছি।

তখন বিএনপি থেকে বলা হয়, এ নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে কাটানো যায়, সেজন্য সবাই মিলে চেষ্টা করা হবে। তবে দূরবর্তী সময়ের অবস্থা মূল্যায়ন করে বর্তমান সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1174 বার