fbpx
 

তোমার আমার ঠিকানা থেকে ‘টেকড়ু’ শুনে পাঞ্জাবিরা হেসেছিল(প্রথম পর্ব)

Pub: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০ ৪:০৮ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম ছয়বারের সাংসদ। মন্ত্রী ছিলেন ২ বার। তাঁর আত্মজৈবনিক বই ‘সৈনিক জীবন গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’ গতকাল একুশের মেলায় এসেছে। প্রথম প্রকাশিত বইটি থেকে কয়েক কিস্তি ছাপার শুরু আজ থেকে।

১৯৭০ সাধারণ নির্বাচনের বছর। সেনা কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আলাপ না করলেও বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের মধ্যে বিভেদের অদৃশ্য দেয়াল ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বাঙালিদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সৈনিকদের সঙ্গে বাক্যালাপ চালাতে হয় উর্দুতে, এ কারণে এ ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হয় কর্মকর্তাদের। উর্দুতে বক্তব্য দিতে হয় (আইপি) ক্লাসে। কিন্তু উর্দু ভাষায় বাঙালিরা দুর্বল, আমাদের উচ্চারণ শুনে পাঞ্জাবিরা হাসাহাসি করে।
আমাদের সিন্ডিকেটে আমরা তিনজন বাঙালি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। আমি, লেফটেন্যান্ট মাহবুব এবং সিগন্যাল কোরের ক্যাপ্টেন মনসুরুল আজিজ। মনসুর সংস্কৃতিমনা, ভদ্র অফিসার, উর্দু ভাষায় একবারেই আনাড়ি। তার উর্দু শুনে প্রশিক্ষক ও কোর্সের অন্য অফিসাররা খুবই মজা পাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ার উর্দু প্রতিশব্দ ‘টেকড়ি’। মনসুর বক্তৃতার ক্লাসে উচ্চারণ করে ‘টেকড়ু’, শুনে পাঞ্জাবিরা হেসে গড়িয়ে পড়ে। সব প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে এই টেকড়ু শব্দটি ছড়িয়ে পড়ে। মনসুরকে দেখলেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা অন্যদিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করে ‘টেকড়ু’। ক্রমেই মনসুর অতীষ্ঠ হয়ে ওঠে। একদিন সকালে সে ইনফ্যান্ট্রি স্কুলের কমান্ড্যান্টের (ব্রিগেডিয়ার) রুমে ঢোকে। ‘বাংলা আমার মাতৃভাষা, অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমি পূর্ব পাকিস্তানি বলেই পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। আমি এর প্রতিকার চাই।’ মনসুরের বলিষ্ঠ বক্তব্য। কমান্ড্যান্ট বিব্রত হলেন এবং মনসুরকে আশ্বস্ত করেন। পরদিন পুরো কোর্সের দুই শতাধিক অফিসারকে একত্র করে তিনি কড়া বক্তব্য দেন মনসুরের পক্ষে। সবাইকে সতর্ক করে দেন, যদি কেউ পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাষা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মনসুর তাৎক্ষণিক হিরো বনে গেল, সবাই সমীহ করে কথা বলে তার সঙ্গে।
সপ্তাহে দুই দিন বেয়নেট ফাইটিংয়ের ক্লাস হয়, প্রশিক্ষক পাঞ্জাবি সুবেদার। রাইফেলে বেয়নেট লাগিয়ে কয়েক গজ দৌড়ে, ‘চার্জ’ বলে চিৎকার করে খড় ও চটের তৈরি টার্গেটে আঘাত হানতে হয়। মনসুরের মাথায় হঠাৎ আইডিয়া এলো, আমরা চার্জের পরিবর্তে ‘জয় বাংলা’ বলে বেয়নেট ফাইটিং করবো। একদিন প্ল্যানমাফিক আমরা তিন বাঙালি ‘জয় বাংলা’ বলে চিৎকার করে টার্গেটে আঘাত করলাম। সিন্ডিকেটের পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এমন শব্দ কেউ শোনেনি। প্রশিক্ষক কাছে এসে বললেন, ‘সাব, কেয়া বোলা আপলোগ (আপনারা কী বলছেন)?’ মনসুর জানালো, ‘চার্জ বলেছি। বাঙালিদের অ্যাকসেন্ট তো, তাই অন্য রকম শোনাচ্ছে।’ মনসুরকে কেউ ঘাঁটাতে চাচ্ছে না। আমরাও ‘জয় বাংলা’ বলে ফাইটিং চালিয়ে গেলাম। কোর্সের শেষ ভাগে বেয়নেট ফাইটিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ভাগ্যক্রমে আমি এতে প্রথম স্থান অধিকার করে একটি সুদৃশ্য ট্রফি অর্জন করি। কোর্সের চূড়ান্ত ফলাফল বের হলো, কোনো মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হয়নি। আমার গ্রেডিং এওয়াই+। ক্যাপ্টেন মাহমুদ জানালেন, এর চেয়ে উচ্চতর গ্রেডিং কেউ পায়নি।
পল্টনে ফিরে এসে দেখি কাজী গোলাম দস্তগীরের পরিবর্তে কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাঙালি লে. কর্নেল রেজাউল জলিল। আমেরিকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ অফিসার, মেজাজ কিছুটা কড়া ধাঁচের।
কোয়েটা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরেই নির্বাচনের উত্তাপ অনুভূত হলো। নভেম্বর মাসে পার্লামেন্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে জনগণ ভোট দিতে পেরেছে ১৬ বছর আগে, ১৯৫৪ সালে। সে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে সমূলে উৎখাত করে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে যুক্তফ্রন্ট, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ে শাসকগোষ্ঠী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নির্বাচনের পথ পরিহার করে ষড়যন্ত্রের পথ ধরে। যার ফলে সাধারণ মানুষ পরে বহু বছর আর ব্যালট বাঙের নাগাল পায়নি। যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা দুই মাসও শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা প্রয়োগ করে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করে কেন্দ্রীয় শাসন প্রবর্তন করে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ গণতন্ত্রপ্রিয়। ১৯৩৭ সাল থেকে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছে। পূর্ব বাংলার জনগণ মুসলিম লীগকে ১৯৪৬ সালে ভোট দিয়ে পাকিস্তান অর্জনের পথ সুগম করেছে, অথচ সে নির্বাচনে পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ বেলুচিস্তানে মুসলিম লীগ তথা পাকিস্তানপন্থিরা বিজয়ী হতে পারেনি।
পাকিস্তান অর্জনের পরপরই বাঙালিদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। ভাষার দাবি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের দাবি, গণতন্ত্রের দাবি প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হয়। চেপে বসে সামরিক শাসন। পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনিরূপে শাসিত হতে থাকে। অধিকারবঞ্চিত মানুষ স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শিরোনামে একটি প্রচারপত্র বাঙালিদের জাগিয়ে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ স্বাধিকার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’, ‘ঢাকা না পিন্ডি-ঢাকা, ঢাকা’-এ ধরনের স্লোগান অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের লক্ষ্যে প্রদত্ত ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য জনগণই ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতারূপে গণ্য করেন। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত গোয়েন্দা বিভাগ ইয়াহিয়াকে ধারণা দেয় যে, দুই প্রদেশ মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হতে পারবে না।
পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠেছে, এ সময় উপকূলীয় অঞ্চলে ১২ই নভেম্বর আঘাত হানে এক ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস। ভোলা ও পটুয়াখালীর নিম্নাঞ্চলে অন্তত চার লাখ মানুষ নিহত হয়। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও ফসল হারিয়ে অগণিত মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেকালে রাস্তাঘাট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল এবং নিম্নমানের। ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সংগ্রহ করতেই কেন্দ্রীয় সরকারের এক সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেল। ১০-১২ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কিংবা সরকারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কেউ দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে আসেননি। সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলো, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চীন সফর শেষে ঢাকা হয়ে রাজধানী পিন্ডিতে উড়ে গেলেন, কিন্তু দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে গেলেন না। দেশের এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি কী নিদারুণ অবহেলা, অমানবিক আচরণ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সহায়-সম্বলহীন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌঁছায়। বয়োবৃদ্ধ মওলানা ভাসানী দুর্যোগকবলিত এলাকা পায়ে হেঁটে পরিদর্শন করে এসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় তাঁর সেই বিখ্যাত বা বহুল প্রচারিত খেদোক্তিটি করেন, ‘ওরা কেউ আসেনি।’ আমারও জনা বিশেক নিকটাত্মীয় ভোলার সেই ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান। আমার পিতা লালমোহন উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন, ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। আমি চার দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি লালমোহনে যাই। রাস্তায়, খেতে, নদী-নালায় তখন অগণিত লাশ ভেসে আসছে। স্মরণকালের এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা দেখে হতবাক হয়ে পড়ি।

Hits: 43


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ