তারেক রহমানকে সেদিন যে ভাবে দেখেছি

Pub: Thursday, September 3, 2020 3:47 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা: কাজী মাযহারুল ইসলাম দোলন

আজ বাংলাদেশের রাজনীতির আস্থার প্রতীক তারেক রহমানের ১২ তম কারামুক্তি দিবস। এই দিনটির সাথে আমার চিকিৎসক জীবনের একটা যোগসূত্র আছে। সেই স্মৃতির কিছুটা আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করতেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

মানুষের জীবনের কিছু কিছু সময় থাকে যাকে ক্রান্তিকাল বলা যায়। রাজনীতিতেও এমন সংকট চলে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন। তাদের মতে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে অদৃষ্টের গলিপথ ধরে সময় নদীর স্রোতে কঠিন সময় এসে যায়। আর এই সময়কে সাহস, মনোবল ও জনগণের সমর্থন নিয়ে যারা অতিক্রম করে তারাইতো গণমানুষের নেতা। তাদের মাঝ থেকেই একটি জাতি খুঁজে পায় তাদের ভবিষ্যতের কর্ণধার । আগামীর রাষ্ট্রনায়ক। কোন তর্কবাগীশ নয় এটা নির্ধারণ করবে সময়। যার প্রতিফলন ইতিমধ্যেই প্রত্যুষের সূর্যালোকের মত প্রতিভাত। প্রতিষ্ঠিত সত্য তারেক রহমান এখন অবিসংবাদিত নেতা। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারক ও বর্তমান প্রজন্মের প্রাণপুরুষ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক।

কাকতালীয় ভাবে আমি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাথে জড়িয়ে পড়ি। পিএইচডির এনরোলমেন্ট এর জন্য কিছু অফিসিয়াল কাগজপত্র সংগ্রহে অর্থোপেডিকস এর চেয়ারম্যান স্যার এর কম্পিউটারে কাজ করছিলাম।

কানে খট খট শব্দ। স্যার আমি এক অপরের দিকে তাকালাম। এমন শব্দের সাথে আমরা কেউ পরিচিত নয়। কিছু বোঝে উঠবার আগেই হুড়মুড় করে কিছু উর্দি পড়া কারা রক্ষী, পুলিশ রুমে ঢুকেই সামরিক কায়দায় অবস্থান নিলো। একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। গলা শুকিয়ে গেল। পুলিশের আধিক্য দেখে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। স্যারও আমার দিকে একবার তাকিয়ে আর তাকাচ্ছেন না। তিনি বোধয় হিসেব মিলাতে চেষ্টা করছেন। এতোটা ভাববার সময় কোথায়। ওরা বেশী সময় নিলো না। অফিসার গুছের একজন হুকুমের সুরে বললো “একটা ঝামেলার রুগী আসছে কেউ রুম থেকে বের হতে পারবেন না ।” পিজি হাসপাতালে প্রিজন সেল থাকায় জেল থেকে প্রায়ই রোগী আসে। কিন্তু আজকের পরিবেশ ভিন্ন। তবু সহজ হতে আপন মনে কম্পিউটারে নিজের কাজ করে যাওয়ার ভান করে যাচ্ছিলাম।
প্রায় ২০-২৫ মিনিট পর দেখলাম ধাক্কাধাক্কি করে আরও একদল পুলিশ মাঝখানে কাউকে ঘিরে রুমে ঢুকলো। কৌতূহল বশত: উকি দিতেই যা দেখলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শুধু অবাক নয় বাক রুদ্ধ হয়ে গেলাম। মনে হলো হাজার মাইলের দুটি যুদ্ধবিমান আমার দু’কানের পাশদিয়ে উড়ে গেছে। কয়েক মিনিট বোধ শক্তি ছিল না। সম্বিত ফিরতেই মনে প্রশ্ন জাগলো এও কি সম্ভব! আমি কি সত্যি দেখছি। নাকি মতিভ্রম ঘটেছে আমার! আমার সারা শরীরে শিহরন। পিঠ দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। চোখে হাজার প্রশ্ন? সজারু কাঁটার মত বুকে কি যেন বিঁধছে। বাংলাদেশে গড়ার কারিগর স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রাণ পুরুষ, তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে পুলিশ বেষ্টিত হয়ে এভাবে দাড়িয়ে আছে। না ভাবা যায় না। যিনি কখনও কোন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ছিলেন না। কোন সভ্য দেশে এটা সম্ভব নয়। কখনো ভাবিনি এ ভাবে দেখা হবে।

পাঠক নিশ্চয়ই ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছেন মাঝের মানুষটি আর কেউ নন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমান।

এ প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ। কয়দিন আগেও যাকে দেখেছি বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া রূপসা থেকে পাথুরিয়া। কৃষক শ্রমিক ছাত্রদের ভাগ্য উন্নয়নে যিনি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতেন । যে মানুষটির মাঝে আমার মত দেশের ষোল কোটি মানুষই জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতো। সেই মানুষটিকে এভাবে কখনও দেখবো । এ যেন স্বপ্নেরও অতীত। প্রাণচঞ্চল মানুষটির একি হাল? এটা কি করেছে অবৈধ কুচক্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার?

বাইরে ঠিক কি ঘটেছে বুঝতে পারছি না। নানান আশংকা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি অনেক কষ্টে চোখ তুলে তাকালাম। না তিনি ব্যথায় কাতার হলেও ভরকে যান নি এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। স্বভাব সুলভ ভাবে চোখ তুলে তাকালেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে আমার পেছনের চেয়ারটিতে বসলেন। চোখে মুখে স্পষ্ট ব্যথার ছবি ফুটে উঠলেও ভেঙ্গে পড়েন নি।

ডাক্তার হিসেবে আমার যা কর্তব্য ও অগ্রগণ্য তাই শুরু করলাম। আমার মাথায় অন্য কিছু ভাববার সময় নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যাই থাকুক ব্যথা সংক্রামক আজই প্রথম বুঝলাম। তীব্র ব্যথার যন্ত্রণা আমারও অনুভূত হতে লাগলো।
সংক্ষেপে শারীরিক সমস্যা শুনলাম। চিকিৎসকদের ভাষায় কেস হিস্ট্রি। কিছু বললেন কিছু এড়িয়ে গেলেন । তিনি মৃদুস্বরে বললেন ‘‘ চোখ বেঁধে ত্রিশ চল্লিশ ফুট উপরে ঝুলিয়ে রেখে হটাৎ করে দড়ি ছেড়ে দেয়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আবার শুরু করলেন “ উপর থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ব্যথায় যখন কাতরাচ্ছিলাম তখন ওরা পাশে দাড়িয়ে হাসি ঠাট্টা করছিল।”

কেন যে এমনটা আমার মনে হলো অন্য কোন সময় অন্য কোন লেখায় বলবো। আঘাতের ধরণ নিজেই কথা বলে। ডাক্তারি বিদ্যা অন্ত এতটুকু বোঝার ক্ষমতা আমাকে দিয়েছে। এখন বুঝি তখন সব কিছু বলার অবস্থা ছিল না।

সরকারী নিয়ম কানুন ও প্রত্যক্ষ পরোক্ষ হুকুম ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বলা যায় এক রকম যুদ্ধ করে উনাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ভর্তিতো হলেন ঠিকই কিন্তু অযাচিত লোকদের অযথা খবরদারীর কারণে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছিলো না। সে অনেক কথা! এ নিয়ে না হয় আরেকদিন লিখবো। কলেবর বৃদ্ধিকরে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না।

৩১ শে জানুয়ারি ২০০৮ থেকে ৩রা সেপ্টেম্বর ২০০৮। পুরোটা সময় কত কি যে পার করে দেশের স্বার্থে জাতীর স্বার্থে তারেক রহমান কে নিরাপদ রাখার সংগ্রাম করেছি তার বেশীর ভাগই এখনো বলার মত পরিবেশ হয়নি। শুধু এতটুকু বলতে পারি । প্রতিটি মুহূর্ত আতংক ও আশংকায় কেটেছে।

নস্টালজিয়ায় যখন আক্রান্ত হই। তখন স্বপ্নের মত মনে হয়, কানে স্পষ্ট শুনতে পাই উনার মুখে শুনা সেদিনের ভয়াবহ কথামালার প্রতিধ্বনি। কি অমানুষিক ভাবে চালানো সেই নির্যাতনের কথা। এভাবে আর কত অশ্রু লুকানো যায়। দুচোখে এখনও অঝোরধারায় নামে বৃষ্টি।

মনে এখনও আশা জিয়ে রেখেছি। ভাবি, নিশ্চয়ই আল্লাহ তারেক রহমানের মাধ্যমে ভালো কিছু করাবেন বলে এতো কিছুর পরও তাঁকে আজো নিরাপদ রেখেছেন।
৩রা সেপ্টেম্বর আল্লাহর অসীম কৃপা ও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের দো’য়ায় তারেক রহমান মুক্তি পেলেন। দীর্ঘ ৭ মাস উনাকে নিয়ে অবৈধ সরকারের সংগে লড়াই করেছি। পরিবার পরিজন আর নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন একটা কথা বিশ্বাস করতাম। তারেক রহমানের প্রশ্নে কোন আপোষ হতে পারে না। আমার পরিবারও আমাকে বলে দিয়েছিল ‘আমাদের কথা ভাববে না। যত্ন ও সেবার কোন কমতি যেন না হয় ।’ আমার শিশু সন্তানকেও দেখেছি এ নিয়ে কোনদিন প্রশ্ন করেনি।

10606336_879610775396394_6912274762014603341_n

ব্যক্তি কোন স্বার্থ নয় দেশের স্বার্থই ছিল বড় কথা। ডাক্তার হিসেবেই তারেক রহমানের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানবিক ও পেশাগত কর্তব্য থেকে। এই দলটির প্রতি অনুগত ছিলাম সেই আত্মিক কারণে। কখনও অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করিনি। ভালবাসা বিনিময়যোগ্য নয়। মাথায় একটাই চিন্তা কাজ করেছে আগামীর রাষ্ট্র নায়ককে সেবা দিয়েই সুস্থ করে তুলতে হবে।

পিজি হাসপাতালের জানালায় দাড়িয়ে যখন আকাশের বুকে তাকাতাম তখন কানে বেজে উঠতো কবিতার ছন্দ। আমি কবি না । কিন্তু ভাবতাম অনেকটা এ রকম।

মানুষ চাই মানুষ

মানুষ চাই মানুষ? বলতে পার কোন মানুষ
মনুষ্যত্বহীন মানুষ? নাকি পশুত্বহীন মানুষ?
বিবেক বর্জিত মানুষ? নাকি হিংসাহীন মানুষ?
কীটের মত ছুটে বেড়ায় হাজার হাজার মানুষ
তবু মানুষ চাই? মানুষ! এমন একটা মানুষ….

চাই সততায় উদ্ভাসিত মানবিক গুনে সজ্জিত
দিগবিজয়ী একজন স্পষ্টবাদী অনুকরণীয় মানুষ
নির্ভীক, সংশপ্তক, লোভহীন ক্ষমতা বিদ্বেষী
একজন জনবান্ধব সত্যবাদী দেশপ্রেমিক মানুষ!

স্বার্থের খোলস ছেড়ে পালায় নিরাশা
এক তুড়িতে উড়িয়ে দেয় সব সর্বনাশা
বিনম্র সৎ মানবিক গুনে মূর্ত মানুষ!
মানুষ চাই মানুষ! এমন একটা মানুষ….

যিনি উৎসর্গ করতে পারে নির্দ্বিধায় জীবন নূপুর
দিতে পারবে একটি শুভ্র সকাল, সোনালী দুপুর
একটি গোধূলি সন্ধ্যা, নতমুখী চাঁদ রূপালি রাত
এক মুঠো হাওয়া, এক মুঠো মেঘ নির্মল প্রভাত

শিশির ভেজা শিউলি বকুল, বৃষ্টি ঝরা বর্ষা
অঞ্জলি ভরা বসন্ত, প্যাকেট বন্দি চৈত্র নকশা
এক কাপ চায়ের সাথে দুঃসংবাদহীন সকালের কাগজ
মনুষ্যজট বিহীন গণপরিবহন, জ্যামহীন রাস্তা, দিগন্তে অগ্রজ

ন্যায্যমূল্যের বাজার আর স্বাস্থ্য বান্ধব খাবার
হাতের কাছে হাসপাতাল, সুলভ পথ্য সবার
হাতের নাগালে বাড়ি ভাড়া আর শিক্ষা
ন্যায়বিচার আর রাষ্ট্রীয় সকল সেবা

ন্যায্য মজুরি মৌলিক অধিকারে অফুরন্ত সংযোজনা
স্লোগান মুক্ত চাহিদা পূরণে সক্ষম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা
যার চোখে ধ্রুবতারা ! ছড়ায় ভবিষ্যতের আলো
যার চোখে বিমূর্ত বাংলাদেশের সম্ভাবনা

দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি মুহূর্তে দিতে পারে জলাঞ্জলি
শাসনের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য নয়
মানুষের জন্য যার জীবন বাজী রাজনীতি
হ্যাঁ, মানুষ চাই মানুষ! এমন একটা মানুষ….

নিভৃতে যে মানুষটি নি:শেষে করে যাচ্ছেন সব দান
তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নায়ক
মৃত্তিকার সূর্য সন্তান গন মানুষের নেতা তারেক রহমান

১১ ই সেপ্টেম্বর যখন উনাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাই তখনো চোখে ছিল প্রতিটি পর্যায়ে আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আজো আলোর মুখ না দেখলেও একজন আশাবাদী মানুষ হিসাবে বিশ্বাস করি সবটুকু শেষ হয়ে যায়নি। বাহান্ন, একাত্তর, নব্বুই কড়া নেড়ে বলে রাত অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। তাই প্রত্যাশা, ভোরের আলো পূর্বাকাশে ফুটে উঠলো বলে……।

লেখক পরিচিতি: লেখক ডা: কাজী মাযহারুল ইসলাম দোলন। ১/১১ সময় তারেক রহমানের চিকিৎসক ছিলেন। লন্ডনে তিনি তারেক রহমানের সাথে যান।তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক।বর্তমানে সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটি বিএনপি ও ১ম যুগ্ম মহাসচিব , ডক্টরস এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ(ড্যাব)।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 10058 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ