বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর কপটতা, পাশবিকতা :

Pub: Friday, July 24, 2020 7:28 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা
“কপটতার এ-সুন্দর দেশে মুখে আমরা একটা বলি, কাজে করি তার বিপরীতটা; উপদেশ দিই আধ্যাত্মিক, কিন্তু কাজে করি পাশবিক”- এই আপ্তবচনটি বাংলাদেশের বর্তমান ফ্যাসিষ্ট সরকার এবং দেশে-বিদেশে তাদের নেতাকর্মী, সমর্থকদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তারা তাদের বর্তমান পর্বতসম ভুলক্রটি, অসততা, কপটতা, পাশবিকতা দেখেই না; অথচ পুরো বিশ্ব তা দেখছে। করোনার মহামারীর সময়েও তাদের অসাধুতা, অমানবিকতা, পাশবিকতা বন্ধ নেই। ইতিমধ্যে প্রবাসীরা সরকার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাসপাতাল থেকে করোনার নকল সার্টিফিকেট নিয়ে জাপান, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে চরম হেনস্থার শিকার হয়েছে। ওখানকার বিমানবন্দর থেকে স্বদেশে তাদের ফেরত আসতে হয়েছে পুনর্বার। সরকারী দলের নীতিনির্ধারকদের অসাধুতার কারণে কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, ব্যাংকক, মালয়েশিয়ায় দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, বিবিসি, ইতালি, কুয়েতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই অসাধুতা, অমানবিকতা বারবার প্রচার হয়েছে। দূর্ভাগ্য বাংলাদেশীদের তবুও সরকার এবং তার সমর্থকদের কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না। তারা এখনো উন্নয়নের মিথ্যা ফানুস উড়াতে ব্যস্ত, এক যুগ ধরে জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় থেকেও বিরোধীদের মিথ্যা দুর্নাম ছড়াতে ব্যস্ত।

বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ আসলেই ‘কামধেনু’। তাদের যথেষ্ট দোহন করা যায়। দেশেবিদেশে তাদের অর্জিত সম্পদ হাতিয়ে দিয়ে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ফুলেফেঁপে উঠেছে। জাতিসংঘের হিসাবমতে গত দশ বছরে এদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে নয় লাখ কোটি টাকা। বিদেশে তৈরি হয়েছে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া, আমেরিকায় ফ্ল্যাটবাড়ী, দুবাইতে মার্কেট। এদেশের টাকা জমা হয়েছে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে। এমনকি এখন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ থাকা কেউ কেউ বিদেশী নাগরিক। আমাদের দেশে ‘দ্বৈত নাগরিকত্বে’র একটা আইন আছে। এই আইনের বলে তারা এদেশে আসেন। বিশ্বের কোন ‘উন্নত’ দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে ওই সব বাংলাদেশীদের এখন ‘সেকেন্ড হোম’।

বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কুট-কৌশল এবং জোরজবরদস্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার কথা উন্নত বিশ্বের সরকার এবং মানুষের কাছে অজানা নয়। অজানা নয়, ২০১৪’এর ৫’জানুয়ারী এবং ২০১৮’এর ৩০’ডিসেম্বরের ভোটারবিহীন, কুট কৌশল, জোরজবরদস্তি এবং পাশবিক নির্বাচনের কথাও। গত দশ বছরে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরোধীদের উপর যত গুমখুন, হামলামামলা হয়েছে সবকিছু সম্পর্কে বিদেশীরা ওয়াকিবহাল। এদেশের শাসন-আইন-বিচার বিভাগ কোন পাতালে নেমেছে তা সম্পর্কেও তারা সম্যক অবগত। বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ। উন্নত দেশগুলো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অংশীদার। তাই এসবের খবর রাখা তাদের রাষ্ট্রাচারের অংশ। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, ইইউপি, আমেরিকার কংগ্রেসসহ অনেক দেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের নির্বাচন, মানবাধিকারের অব্যবস্থার নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস সংস্থাগুলোও অনেকবার এসবের নিন্দা জানিয়েছে। এমনকি গত দুটি জাতীয় নির্বাচনে ভারত, ভুটান ছাড়া কোনো দেশ এবং সংস্থা পর্যবেক্ষকই পাঠায়নি।

শাসন-আইন-বিচার বিভাগ এখন সরকারের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছে। সামরিক, বেসামরিক সমস্ত বিভাগই বর্তমান সরকারের হুকুম তামিলেই ব্যস্ত। বিচারের রায়ও হচ্ছে সরকারের চাহিদামাফিক। ইতিমধ্যে অনেকের ফাঁসি এবং কারাদণ্ডও হয়েছে কুট কৌশলে চাহিদামতোই। সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহার ঘটনায় বিচারবিভাগের ‘খুল্লাম খুল্লা’ রূপটি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। বিএনপির চেয়ারপার্সন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনও সরকারের চাহিদাজনিত নাটকের প্লটেরই অংশ। তাঁরা ছাড়াও সমস্ত বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধীদল সরকারের অত্যাচার, পাশবিকতার শিকার। বিরোধীতার লেশমাত্র সহ্য করতে রাজি না এই স্বৈরাচারীরা। অবশ্য এখন আর তারা স্বৈরাচার পর্যায়ে নেয়, তা ফ্যাসিজমে উন্নীত হয়েছে। উন্নত বিশ্ব এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর যথেষ্ট নিন্দা জানিয়েছে যথাসময়ে। এখনো নিন্দা জানিয়েই যাচ্ছে।

দেশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে নিঃসন্দেহে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়ার অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতা, একদলীয় বাকশাল হতে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসা, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এককভাবে জিয়া পরিবারের অবদান অপরিসীম। তাদের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। এভাবে দেশ এবং জনগণের উন্নয়ন এবং দুঃসময়ে এ দলটির অবদান অতুলনীয়। এসব কারণেই দলটি এতো জনপ্রিয়। বর্তমান করোনাকালে দলের চরম দুঃসময় সত্বেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের নির্দেশনায় লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্থ দেশের কমবেশি আড়াই কোটি মানুষকে এখন পর্যন্ত খাদ্য সহযোগিতা দেয়া হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতাদের আমরা জানি যাদেরকে তাদের দেশে জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতি এবং সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু তাঁদের নিয়ে কোনো দেশেই অতিরিক্ত কিছু করা হয় না। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ উপাধি এবং ‘জন্ম শতক’ উদযাপনের নামে বাড়াবাড়ি করা হয় না। আমেরিকার জর্জ ওয়াংশিটন, ফ্রান্সের দ্যগল, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অবদান এবং মর্যাদা তাদের নিজের দেশের জন্য কোনো অংশে কম নয় শেখ মুজিবুর রহমানের তুলনায়। তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল দুর্নীতি, দূর্ভিক্ষ এবং একদলীয় শাসন তথা ‘দেশের প্রথম স্বৈরাচার’ এর কলঙ্কে কলঙ্কিত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ একজনের এরকম কলঙ্কিত জীবন হতে পারে না কখনোই। তাছাড়া তাঁর উত্তরাধিকারীরাও বৈবাহিক সম্পর্ক এবং ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে বাঙ্গালিত্বকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। তাই তাকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বানানোর অর্থ পুরো জাতিতে অবমাননার সামিল। বিশ্বের অন্যান্য জাতীয় নেতার ইতিহাস এরকম কলঙ্কিত ছিল না। আওয়ামী লীগ তাদের নেতাকে নিজস্ব বাগাড়ম্বরতা এবং মেকানিজম দিয়ে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বানিয়েছে। যার সাথে অধিকাংশ বাঙালিই একমত নয়। অবদানের ক্ষেত্রে হাজার বছরে এমন অনেক বাঙালি আছেন যাদের কাছে শেখ মুজিবের অবদান নিতান্তই তুচ্ছ। জোরজবরদস্তি করে ভালোবাসা আদায় করা যায় না। অথচ আওয়ামী লীগ সবসময় তাই চেষ্টা করেছে এবং এখনো করেই যাচ্ছে। বাড়াবাড়ির বর্তমান অনুশীলন শুরু হয়েছে এবছরকে ‘মুজিব বর্ষ’ পালন হিসাবে। এমন নির্লজ্জতা, বাগাড়ম্বরতা এবং বাড়াবাড়ি কোনো জাতি তাদের নেতাকে নিয়ে কখনোই দেখেনি। দুর্ভাগা এই জাতিই এসব দেখতে বাধ্য হচ্ছে। করোনাকালও এই উদযাপনকে থামিয়ে রাখতে পারছে না। আওয়ামী লীগের কাছে যেনো দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে নেতা বড়।

১৯৭০’এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার কারণেই স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে স্বাধীনতা প্রাপ্তি। অথচ স্বাধীন দেশে ১৯৭৩’এর প্রথম নির্বাচনেই জনগনের ভোটাধিকারকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগই ৩০’লাখ শহীদের রক্তকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’। একইভাবে আট বছর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী সংগ্রামে অর্জিত ভোটাধিকার ‘কেয়ারটেকার সরকার’ কে হত্যা করে আওয়ামী লীগই। এভাবে প্রায় অর্ধ সেঞ্চুরিতে অর্জিত অনেক ভাল অর্জনকে এই আওয়ামী লীগ বিসর্জন দিয়েছে। মুখে স্বাধীনতার চেতনার কথা বললেও তাদের কাজেকর্মে সেই চেতনার উপস্থিতি কোথাও নেই। নিজেদের ক্ষমতা এবং অস্তিত্বের স্বার্থেই তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সম্মান সব বিসর্জন দিচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদেরকে ক্ষমতায় রাখার স্বার্থে ভারতকে ট্রানশিপমেন্টের নামে করিডোরসহ প্রায় সবকিছুই দিয়েছে। প্রতিবেশীর সাথে কোনো ‘বার্গেনিং পয়েন্ট’ রাখেনি। অথচ পানি সমস্যা, সীমান্ত সমস্যাসহ অনেক সমস্যা এখনো ঝুলে আছে। দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাথে পর্যন্ত ‘রোহিঙ্গা’ সমস্যায় হেরে বসে আছে। দেশের এবং জনগনের স্বার্থ এখানে নিতান্তই গৌণ। ক্ষমতায় থাকাটাই তাদের জন্য মূখ্য। এমনকি তাদের পারিবারিক জীবনে এর প্রতিফলন দেখি। তাদের পারিবারিক বিবাহবন্ধন বেশীরভাগই ভিনদেশী ইহুদী এবং খ্রীষ্টানের সাথে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বউ আমেরিকান ইহুদী। তার বোনের ছেলে এবং মেয়ে বিয়ে করেছে ব্রিটিশ খ্রীষ্টান। তাদের বেশীরভাগের বসবাস এবং ব্যবসাবাণিজ্যও বিদেশে। এতে তাদের দেশপ্রেমের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা এবং গণতান্ত্রিকতায় উদ্বুদ্ধ একটি দলের জনগণকে ভোটাধিকার এবং স্বাধীনতাকে বঞ্চিত করার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বার বার আওয়ামী লীগ তাই করে এসেছে এবং এখনো করছে। তাই বাংলাদেশের দেশেবিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভাববার সময় এসেছে আসলেই এই দলটি কি আদৌ গণতান্ত্রিক দল না ফ্যাসিবাদী দল??


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ