নির্বাচনে জয়, কিন্তু দেশের পরাজয়?

Pub: সোমবার, জানুয়ারি ৭, ২০১৯ ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, জানুয়ারি ৭, ২০১৯ ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে একটি পর্যালোচনা
শেহরিয়ার ফাজলি :
বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী বিএনপি বয়কট করায় এবং কার্যত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করায় সঙ্গত কারণেই তা ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিজয় ছিল আরো বেশি ফাঁপা।

দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগে জেলে থাকার পরও আওয়ামীবিরোধী বৃহত্তর জোটের আওতায় বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নাম দিয়ে যার প্রধান হয়েছিলেন শ্রদ্ধাভাজন আইনবিদ ও সাবেক পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। ঐক্যফ্রন্ট ২৯৮টি আসনে অংশ নিয়ে সাতটিতে জয়ী হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরেছে ২৮৮টি আসনে জয়ী হয়ে। আশঙ্কা অনুযায়ী, বিরোধী দল ফলাফল প্রত্যাখ্যন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। এই দাবিকে একসময় সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের মতো আওয়ামী লীগপন্থী প্রতিষ্ঠানও সমর্থন করেছিলো।

ভোটাদের ভীতিপ্রদর্শন, বিরোধী পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দান কিংবা বহিষ্কার এবং আওয়ামী লীগসমর্থিত প্রিজইডিং ও ডেপুটি প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করাসহ নানাভাবে কারচুপি অনেক পর্যবেক্ষককেই অবাক করেছে। নির্বাচনের আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধী দলের হাজার হাজার সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে, বেশ কয়েকজন বিরোধী দলীয় প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ কারণে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষক পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে নজিরবিহীন টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত হওয়া দৃশ্যত অনিবার্য হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফাঁকও রাখা হয়নি। নির্বাচনের আগে ব্যবস্থাদি ও নির্বাচনের দিন জালিয়াতি প্রমাণ করে যে ক্ষমতাসীন দল বিন্দুমাত্র ঝুঁকি গ্রহণ করেনি।

বাংলাদেশের জিরো-সাম রাজনীতি গত ৫ বছরে চরম পর্যায়ে ঠেলে দেয়ায় হাসিনা দৃশ্যত আক্ষরিকভাবেই নির্বাচনকে বাঁচা-মরা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে কঠিন বাস্তবতা হলো, ২০১৪ সালের বিতর্কিত বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা সুসংহত করার পর তার মুঠো খুবই ভঙ্গুর বলে মনে হয়েছে। এই সুসংহতকরণকে মোটা দাগে তিন পর্যায়ে ভাগ করা যায়: প্রথমত, ১৯৭১ সালের নৃশংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের জন্য অত্যন্ত রাজনীতিকরণ করা আন্তর্জাতিক ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বকে ধ্বংস করা; আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি’র উপর আঘাত, যার চূড়ান্ত রূপ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে ও দৃশ্যত উত্তরসী তারেক রহমানকে দণ্ডিত করা; এবং ব্যাপকভাবে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে ভীতি প্রদর্শন। এই সময়ে দুটি বড় ধরনের নিরাপত্তা অপারেশন বাহ্যত হাসিনার আইন-শৃঙ্খলার বিশ্বাসযোগ্যতাকে উজ্জ্বল করে: এর প্রথমটি ছিলো ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে কথিত আইএসআইএস সমর্থকদের হামলার পর সন্ত্রাস দমন অভিযান। হলি আর্টিজান বেকারির হামলায় ২০ জনের বেশি নিহত হয়েছিলো। দ্বিতীয়টি ছিলো, নৃশংস মাদক বিরোধী অভিযান। দুটি অভিযানকালেই বিরোধী দলের একটিভিস্টসহ শত শত মানুষকে বিচারবহির্ভুত হত্যা ও গুম করার অভিযোগ ওঠে।

বিরোধী দল প্রায় অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালে রাজপথে আওয়ামী লীগের নৈতিক কর্তৃত্ব মারাত্মকভাবে পরীক্ষিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৮ সালের বিজয় ২০১৪ সালের চেয়েও বেশি বিতর্কিত হয়েছে।
তিনি গণতান্ত্রিক বৈধতার চেয়ে সিঙ্গাপুর ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
বিরোধী দল প্রায় অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালে রাজপথে আওয়ামী লীগের নৈতিক কর্তৃত্ব মারাত্মকভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত বছরের প্রথমার্ধে হাজার হাজার ছাত্র ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনে। এই কোটা ব্যবস্থার সুফলভোগীরা হলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছেন তারা ও তাদের উত্তরসূরিরা। শেষ পর্যন্ত হাসিনা এ নিয়ে আপোষ করতে বাধ্য হন (যদিও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি)।

আর দ্বিতীয়ার্থে, জুলাইয়ে ঢাকায় একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় দুই ছাত্রের মৃত্যুর পর স্কুল শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তারা নিরাপদ সড়ক ও আরো জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের দাবিতে আন্দোলনে নামে। আওয়ামী লীগ সরকার আন্দোলন দমনের জন্য এতে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে, ব্যাপক ধরপাকড় চালায়। এমনকি প্রখ্যাত ফটো সাংবাদিক শহিদুল আলমকে পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়। চার মাস পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এই আন্দোলনে জড়িত তরুণদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিলো না। এরপর ক্ষমতাসীন দলকে অক্টোবরে গঠিত হওয়া বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত শক্তি জাতীয় ঐক্যজোটের মুখোমুখি হতে হয়, যারা বড়জোর দাবি দাওয়া পেশ করতে পারে।

এখন কী হবে? দেশটির সহিংস রাজনৈতিক ইতিহাসের তুলনায় রোববারের ১৭ জন নিহতের ঘটনা খুবই ক্ষীণ। তাই, সরকার বলতে পারে এবারের নির্বাচন সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনের সময় শত শত লোক নিহত হয়েছিল। বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মিত্ররা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে যাবে, তবে তাতে কোন কাজ হবে না। তারা আগেরবারের মতো সহিংসতার আশ্রয় নেবে, এমন সম্ভাবনাও কম। সেজন্য তাদেরকে অনেক রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে, তাদের অনেক নেতা, এক্টিভিস্ট আইনি বিপত্তির শিকার হয়েছে। সল্প ও মধ্য মেয়াদে চাপ যা আসতে পারে তা হয়তো আসবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। তবে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই এশিয়ান অংশীদার ভারত ও চীন আওয়ামী লীগের অতিরঞ্জিত ম্যান্ডেটকে মেনে নিয়েছে। বিএনপিকে বিশ্বাস করে না ভারত। জাতায়াতের সঙ্গে সখ্যতা ও ভারতীয় জঙ্গিদের বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় দেয়ার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এখনো ম্লান হয়ে যায়নি। রাজনৈতিক সংঘাত নিজের সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত মোদি সরকার চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চাইবে না। আর গণতান্ত্রিক বিষয়াদির তেমন পরোয়া করে না বেইজিং । ফলে বিষয়টি রয়ে গেল কেবল পাশ্চাত্যের হাতে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সামাল দিয়ে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। অবশ্য রোববারের নির্বাচনের পর তার সুনাম অনেকাংশেই ক্ষুণ্ন হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে ইইউ অর্থনৈতিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমনটি হবে কিনা তা একটি প্রশ্ন।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের সমাজকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সামনে এগিয়ে আসতে হবে। একসময় শেখ হাসিনার শক্ত ভিত ছিল উদার, সেক্যুলার অবস্থান। ২০০৭-২০০৮ সালে কথিত কেয়ারটেকার সরকারের মেয়াদে যখন সেনাবাহিনী তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা চালিয়েছিলো তখন সমাজের ওই অংশটিই তাকে টিকিয়ে রেখেছিলো। এখন তারাই তার কাছ থেকে সরে গেছে। এমনকি যে ড. কামাল ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ও হাসিনার বাবা মুজিবুর রহমানের সহকর্মী, তিনিও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। শেখ হাসিনার শাসন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। আগের মতো তিনি আর জনসমর্থনের ওপর ভরসা করতে পারছেন না। তিনি আর ভোটের ওপর নয়, সিঙ্গাপুর ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ওপর ভর করতে চান। তাহলে এটা সেই কথাকেই সত্য করে যে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশেকে শাসন করা যায়। কিন্তু ২০১৮ সালের বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে, ওই কথাটি কতটা ভঙ্গুর।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র অ্যানালিস্ট ও রিজিওন্যাল এডিটর।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ