বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার দুরবস্থা

Pub: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৮, ২০১৯ ২:৫৩ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৮, ২০১৯ ২:৫৩ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বদরুদ্দীন উমর :
তাহলে বাংলাদেশ থেকে কি এখন নির্বাচনের ব্যাপারটা একেবারে উঠেই গেল? গণতন্ত্রের লেশমাত্র আর থাকল না? সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচন নামে যা ঘটল, এর থেকে অন্য কোনো সিদ্ধান্তে আসা আর সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৫৯টি আসন পেয়েছে, অর্থাৎ তাদের জন্য রেখেছে।

অন্য দলগুলো যে ৪১টি আসন পেয়েছে তাকে পাওয়া বলে না। সেগুলো আওয়ামী লীগ তাদেরকে দিয়েছে হিসাব করে। কারণ যেভাবে নির্বাচন হয়েছে তাতে ৩০০ আসনের মধ্যে ৩০০ আসনই আওয়ামী লীগ পেতে পারত। সেটা না করে বদান্যতা দেখিয়ে তারা বিএনপিকে ৫টা আসনসহ অন্যদের ৪১টি আসন দিয়েছে।

৬ জানুয়ারি ঢাকার Daily Star পত্রিকা ‘Voting for Sheaf of Paddy, A village under siege’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে প্রথম পৃষ্ঠায়। তাতে বলা হয়েছে, রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার কলমা নামক গ্রামের ১৯০৯ জন ভোট দিয়েছেন। তার মধ্যে ১২৪৯ জন ভোট দিয়েছেন ধানের শীষে।

এজন্য সেই গ্রামটিকে ঘেরাও করে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। এ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, রোববার নির্বাচনের পরদিন সোমবার সকালেই আওয়ামী লীগের লোকরা লাঠিসোটা নিয়ে গ্রামের প্রবেশপথে অবস্থান নেয়।

এভাবে অবস্থান নিয়ে তারা বাস থেকে নিয়ে রিকশা, এমনকি সাইকেল পর্যন্ত চলাচল বন্ধ করে। শুধু তাই নয়, তারা গ্রামের গভীর নলকূপটি দখলে নেয়, যা ব্যবহৃত হয় চাষাবাদের জন্য। এর সঙ্গে তারা বন্ধ করেছে বাড়ি বাড়িতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন যোগাযোগ। লোকজনকে তারা বাড়ি থেকে বের হতে না দিয়ে ঘরে ঘরে আটক রাখে।

স্থানীয় লোকরা এজন্য মূলত দায়ী করে স্থানীয় কলমা ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যানকে। বিএনপির ভোট দাতাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য চেয়ারম্যান এখন ঢালাও প্রতিশোধের ব্যবস্থা করেন, যার থেকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন লোকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকে।

কলমা গ্রামের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের নির্বাচন পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে কার্যকর করেছে, তাতে ৩০০ আসনের মধ্যে প্রতিটি আসনের অবস্থাই দাঁড়িয়েছে প্রায় একই প্রকার। যুগান্তরের প্রকাশক সালমা ইসলাম প্রার্থী ছিলেন তার নিজের এলাকা ঢাকা-১-এর।

তার জয়লাভের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল এবং তিনিই ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সালমান এফ রহমানের সব থেকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু পুলিশের সহায়তায় আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা তাদের ওপর এমন ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত তিনি তার নির্বাচনী প্রচার কাজ পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীদের এমন হামলা পুলিশের ছাত্রছায়ায় চালানো হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত এক বিবৃতি দিয়ে তিনি বলেন, তাদের নিরাপত্তা পর্যন্ত হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় তিনি আর তার আসনে নির্বাচন প্রচারণা করবেন না।

কিন্তু শুধু এ দুই-একটি উদাহরণ নয়, ৩০০ আসনের প্রতিটিতেই এই একই ধরনের পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ খুব পরিকল্পিতভাবে করেছিল। ম্যাজিকের মতো তারা নিজেদের যে বিজয় দেখিয়েছে, এটাই তার মূল কারণ।

২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ এক ব্যতিক্রমী ও ভয়াবহ নির্বাচন করেছিল। কিন্তু এবারকার নির্বাচন হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ এবং তা দীর্ঘদিনের বিস্তারিত পরিকল্পনার ব্যাপার। ডিসিদেরকে রিটার্নিং অফিসার করা থেকে নিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রত্যেক স্তরে কিভাবে নির্বাচনকে একটা অকার্যকর ব্যাপারে পরিণত করে নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে হবে, এর খুঁটিনাটি পর্যন্ত এবার হিসাব করা হয়েছে এবং হিসাব মতোই সব কার্যকর করা হয়েছে।

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ যাকে বলা হয়, তার নামমাত্র কোথাও না থাকলেও আওয়ামী লীগের বিশেষ অনুগত প্রধান নির্বাচন কমিশনার তোতা পাখির মতো পুরো সময়টা বলেই গেছেন যে, নির্বাচন ক্ষেত্রে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ভালোভাবেই আছে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই সমান সুবিধা পেয়েছে এবং কারও ওপর কোনো আক্রমণ হয়নি।

২০১৪ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন, ২০১৮ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সে কৃতিত্বকে অনেক গুণে ছাড়িয়ে গিয়ে নিজের ‘যোগ্যতা’ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছে বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করেছেন।

পুলিশ, আমলা সবাই এমনভাবে কাজ করেছে যে, তাদেরকে মনে হয়েছে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন। আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা যেভাবে কাজ করেছে এটা এসব সংস্থার সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। নির্বাচনের শেষের দিকে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল।

কিন্তু নির্বাচন পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা রাস্তায় গাড়ি চেক করার কাজ করেছে এবং টহল দিয়েছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে তারা পদক্ষেপ নেয়নি। ভোটের দিনেও যেভাবে পোলিং সেন্টারগুলোতে শক্তি দেখানো হয়েছে, সেখানেও তারা কোনো ভূমিকা পালন করেনি। তারা শুধু টহল দিয়েছে। এর উল্টো ফল হয়েছে। জনগণের মধ্যে, ভোটারদের মধ্যে তার ফলে আতঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

মজার ব্যাপার এই যে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবত এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, ভোটারদের অনেকে প্রথমত ভয়ের কারণে ভোট কেন্দ্রে যাননি। অন্যরা সেখানে গেলেও তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তারা কাকে ভোট দেবেন। এ কাজ করা চলে না, কিন্তু করা হয়েছে। যারা বলেছে, বিএনপিকে ভোট দেবে তাদের হয় সঙ্গে সঙ্গে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, নয়তো মারধর করে নতুবা তাদের নখে কালি লাগিয়ে বলা হয়েছে চলে যেতে।

এছাড়া অধিকাংশ ভোটারকেই ভোট কেন্দ্র থেকে ভোট না দিয়ে ফিরতে হয়েছে; কারণ তাদেরকে বলা হয়েছে যে, তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এই ‘ভোট’ দেয়ার কাজটি পোলিং বুথের মধ্যে বসে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা করেছে। তারা ব্যালট পেপারে নৌকার ছাপ মেরে ভোটের বাক্স ভর্তি করেছে।

এ অবস্থায় ভোটের ওপর আওয়ামী লীগ তার পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। শুধু হিসাব করে যাদেরকে যত আসন ছাড় দেয়ার চিন্তা তারা করেছে, সেগুলোতে লোকদেরকে ভোট দিতে দিয়েছে অথবা নিজেরা নৌকার সিল ব্যালট পেপারে হিসাব করে মেরেছে।

মিরপুরের এক অল্পবয়সী আওয়ামী লীগের সমর্থক বলেছে, সে একাই একশ’ ব্যালট পেপারে সিল মেরে একশ’টা ভোট দিয়েছে। গুলশানের একজন বললেন, তিনি রিকশায় চড়ে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন। রিকশাওয়ালা তাকে বললেন, কেন ভোট দিতে যাচ্ছেন, সব ভোট সকাল ৮টার মধ্যেই দেয়া হয়ে গেছে!!

বাংলাদেশে এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তার চিত্র এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এর থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আমলাতন্ত্র, র‌্যাব-পুলিশসহ সবরকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আওয়ামী লীগ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ও সম্পর্কিত হয়ে একটা শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে।

এখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোনো স্থান নেই। এই মহাশক্তিই এখন বাংলাদেশ শাসন করছে। এছাড়া রয়েছে দেশের অধিকাংশ সুবিধাভোগী লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী- যারা কাজ করছে এই ব্যবস্থার সামাজিক খুঁটি হিসেবে। এর ফলে বাংলাদেশে এমন এক ফ্যাসিজমের উদ্ভব হয়েছে যে সৌদি আরব, মিয়ানমারের শাসকদেরও বাংলাদেশ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।

এর জন্য শিক্ষানবিস হিসেবে তারা বাংলাদেশে নিজেদের বাছাই করা লোকজনকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতে পারে! কারণ ফ্যাসিজম এখানে যত মসৃণভাবে কার্যকর করা হচ্ছে, এটা দুনিয়াতে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

নব অর্জিত শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এখন তারা মহাজোটের শরিকদের কোনো পরোয়া আর করে না। এজন্য তারা তাদের জোট শরিকদের কোনো লোককে আর মন্ত্রিসভায় রাখেনি। নতুন মন্ত্রিসভার যেসব নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরকে যেভাবে বাইরে রাখা হয়েছে সেটাও বিস্ময়কর।

এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, বড় রকম বিজয় সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যথেষ্ট সংকট তৈরি হয়েছে এবং তার মধ্যে এক প্রকার অন্তর্দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। তাদের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে কোথায় নিয়ে যাবে এটা দেখার জন্য বাংলাদেশের জনগণকে অপেক্ষা করতে হবে।

 

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1133 বার