সংলাপের প্রস্তাব কামাল হোসেনের সরকার কি নতুন নির্বাচন দেবে?

Pub: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোবায়েদুর রহমান:
কয়েক দিন আগে ঐক্যফ্রন্টের তরফ থেকে ড. কামাল হোসেন সরকারের কাছে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন। সাথে সাথে আ. লীগ সেই প্রস্তাব লুফে নিয়েছে। কিন্তু কি লাভ হবে এই সংলাপে? ড. কামাল আগামী ২/৩ মাসের মধ্যে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুননির্বাচন চেয়েছেন। তেমন একটি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে সেই দাবিটি সরকারের নিকট থেকে ছিনিয়ে আনতে হবে। সেই শক্তি কি কামাল হোসেনের আছে? তা হলে কেন সেই সংলাপ? সেই সংলাপে জাতীয় পার্টি, মেনন, ইনুর দলসহ সকলকেই নাকি ডাকা হবে।
সেখানে কামাল হোসেনের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে মাখামাখি করতে গিয়ে বিএনপির সাথে যদি কামাল হোসেনের মতান্তর ঘটে তাহলে কী হবে? গত ৩০ ডিসেম্বর ঠিক কোন জাতের ভোট হয়ে গেল সেটি সাধারণ মানুষের বুঝতে বহু সময় লাগবে। সাধারণ মানুষ কেন, অসংখ্য শিক্ষিত মানুষও এই ভোটের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না। সাধারণ নির্বাচনের নামে সেদিন কী ঘটে গেছে সেটি এখন কোটি কোটি মানুষের মুখে মুখে ঘোরাফেরা করছে। এই পটভূমিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন জাতীয় সংলাপের আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ৩ মাসের মধ্যে জাতীয় সংলাপের ভিত্তিতে আবার সাধারণ নির্বাচন করতে হবে।
কীভাবে কামাল হোসেন সাহেবরা পুননির্বাচনের দাবি আদায় করবেন? তারা নাকি জাতীয় সংলাপ করবেন। কার সাথে জাতীয় সংলাপ? বলা হয়েছে যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুননির্বাচন করতে হবে। আবার নির্দলীয় সরকার? ইলেকশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঐক্যফ্রন্টের যে সংলাপ হলো সেখানেই তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দলীয় সরকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে ৯০ শতাংশ ভোট লাভের পর তারা আবার নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুননির্বাচনে যাবে কেন? তারপরেও প্রশ্ন আছে। কার সাথে এ সংলাপ হবে? সে প্রশ্নটি সেদিন তার সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার করা হয়নি। নিশ্চয়ই এটি সরকারের সাথে নয়। কারণ সরকার এ ধরনের সংলাপে বসবেই না। তাহলে কার সাথে? একটি পত্রিকা অবশ্য এই মর্মে জল্পনা করেছে যে, সুধী বা নাগরিক সমাজের সাথে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সুধী সমাজ বা নাগরিক সমাজের সাথে এই ধরনের সংলাপ করে লাভ কী? কে শুনবে তাদের কথা? বরং ব্যাপারটি হবে উল্টো।
৩০ তারিখে কোন ধরনের ভোট হয়েছে সেটির একটি চিত্র তুলে ধরেছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ফেসবুক পেজ এবং একটি দৈনিকের কলামে লিখেছেন। তিনি এবার কটিয়াদি-পাকুন্দিয়া থেকে ধানের শীষ নিয়ে ভোট করছিলেন। এর আগেও তিনি দুবার ধানের শীষ নিয়ে এমপি হয়েছিলেন। এবার তার প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ। মেজর আক্তার ৩০ তারিখে তার এলাকার ভোটের যে বিবরণ দিয়েছেন তা মোটামুটি নিম্নরূপ:
তার জবানিতে ভোটের আগের রাতে পুলিশ ভোট কেন্দ্রে যায়। সেখানে সিল মেরে ভোট বাক্স ভরায়। এভাবেই নৌকার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাঙ্গলের বিজয়ের ৫০ ভাগের বেশি তারা রাতেই নিশ্চিত করে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় ভোট। ভোট শুরুর আগেই মেজর আক্তারের পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ভোট শুরুর ঠিক পূর্বাহ্নে পুলিশ তাদের বের করে দেয়। যারা ভোট দিতে এসেছিলেন সেই ভোটারদের অধিকাংশের হাত থেকে কাগজ নিয়ে নেওয়া হয়। তারপর তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। অতঃপর শুরু হয় নৌকায় সিল মারার উৎসব। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ নৌকায় ভোট দিচ্ছে, এটি দেখানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাক পরা অনেক মানুষ এবং তাদের সাথে আওয়ামী লীগের লোকগুলো লাইন দিয়ে ভোট দেয়। মেজর আক্তার বলছেন, শুধু তাই নয়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে তাদের উপস্থিতিতে নৌকার লোকজনকে দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যালট পেপারে সিল মারায়। তিনি ফেসবুকে অভিযোগ করেন যে, তাদের এই অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করার কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, এরশাদের ভোট অথবা বেগম জিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটের চেয়েও এই ভোট খারাপ ছিল। তাঁর অভিযোগের অনেক স্থানে তিনি এই ভোটকে ‘পুলিশের ভোট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যত্র তিনি লিখেছেন, আমার একটি কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগ দাঁড়াতে পারে নাই। সব কেন্দ্রে পুলিশ নিজে ভোট দিয়েছে। পুলিশ কর্মীদেরকে মারধর করেছে। বেপরোয়াভাবে গ্রেফতার করেছে। কর্মীরা ঘরে থাকতে পারে নাই। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে মেজর আক্তার বলেছেন, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা আমার নির্বাচনী ঘরোয়া বৈঠকে সরাসরি আমাকে ও আমার ছেলেকে আক্রমণ করে আমাদের উভয়কে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। শুধু হামলা করেই ওরা ক্ষান্ত হয় নাই। গত দুই দিনে ও রাতে এলাকার কয়েকশ নিরিহ নিরাপরাধ গ্রামবাসীকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ার পুলিশ অন্যায়ভাবে যাকে যেখানে পাচ্ছে সেখানেই গ্রেফতার করে যাচ্ছে।
দুই
অবাক করার মতো ব্যাপার হলো এই যে, এই সংসদে কোনো বিরোধী দল নাই। জাতীয় পার্টির ২২ জন সদস্য মহাজোটের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায় রওশন এরশাদ, জিএম কাদের এবং মশিউর রহমান রাঙ্গা দাবি করেছিলেন যে, তারা মহাজোটের পার্টনার হিসেবে বিগত ৫ বছর এই সরকারের সাথে কাজ করেছেন এবং এই সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। এবারও তারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের মিত্র হিসেবে ইলেকশন করেছেন। তাই তারা এবারেও সরকারে অংশগ্রহণ করতে চান এবং মন্ত্রী হতে চান। জাতীয় পার্টির এই সিদ্ধান্ত শাসক দলকে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। কারণ দেশে একটি সরকার থাকবে, অথচ কোনো বিরোধী দল থাকবে না, সেটা বিশ্ববাসীর সামনে কেমন দেখায়? আমার তাই ধারণা, এই পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দল হস্তক্ষেপ করে। তারই পরিণতিতে গত ৪ জানুয়ারি শুক্রবার জেনারেল এরশাদ নিজের স্বাক্ষরিত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা করেছেন যে, জাতীয় পার্টি পার্লামেন্টে বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে এবং তারা মন্ত্রিসভায় যোগদান করবে না। এরশাদ নিজে হবেন পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দলের নেতা এবং তার ভাই জিএম কাদের হবেন প্রধান বিরোধী দলের উপনেতা।
গত ৬ জানুয়ারি রবিবার ইংরেজি ডেইলি স্টারে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবর বেরিয়েছে। খবরটির শিরোনাম, ‘Voting for Sheaf of Paddy/
A village under siege’. অর্থাৎ ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য আস্ত একটি গ্রাম অবরুদ্ধ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার কলমা নামক গ্রামের ১৯০৯ জন ভোট দিয়েছেন। তার মধ্যে ১২৪৯ জন ভোট দিয়েছেন ধানের শীষে। এজন্য সেই গ্রামটিকে ঘেরাও করে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা গ্রামবাসীর ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, রোববার নির্বাচনের পরদিন সোমবার সকালেই আওয়ামী লীগের লোকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামের প্রবেশপথে অবস্থান নেয়।
এভাবে অবস্থান নিয়ে তারা বাস থেকে নিয়ে রিকশা, এমনকি সাইকেল পর্যন্ত চলাচল বন্ধ করে। শুধু তাই নয়, তারা গ্রামের গভীর নলকূপটি দখলে নেয়, যা ব্যবহৃত হয় চাষাবাদের জন্য। এর সঙ্গে তারা বন্ধ করে বাড়িতে বাড়িতে থাকা স্যাটেলাইট টেলিভিশন যোগাযোগ। লোকজনকে তারা বাড়ি থেকে বের হতে না দিয়ে ঘরে ঘরে আটক রাখে। স্থানীয় লোকরা এজন্য মূলত দায়ী করে স্থানীয় কলমা ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যানকে। বিএনপির ভোট দাতাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য চেয়ারম্যান ঢালাও প্রতিশোধের ব্যবস্থা করেন, যার থেকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন লোকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা সত্তে¡ও পুলিশ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকে। এসব কারো মনগড়া কাহিনী নয়। ডেইলি স্টারের মতো পত্রিকা তাদের রিপোর্টার আনোয়ার আলীর নাম দিয়ে রিপোর্টটি ছেপেছে। অর্থাৎ রিপোর্টটির পুরো দায় দায়িত্ব তারা নিয়েছে।
এ খবরের পর কামাল হোসেনের নতুন করে সংলাপের প্রস্তাব কি আর হালে পানি পাবে?
journalist15@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1156 বার