একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচন ও কালো অধ্যায়

Pub: বুধবার, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯ ২:০৪ অপরাহ্ণ   |   Upd: বুধবার, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯ ২:০৪ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সায়েক এম রহমান :

এক.
গণতন্ত্রের প্রতিক, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী, সাবেক তিন বারের প্রধানমন্রী, বিএনপির চেয়ার পার্সন বেগম খালেদা জিয়া সহ প্রায় ৭০ হাজারের অধিক নেতাকর্মীদের পরিকল্পিত জেলে রেখে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও পরিকল্পিত সাজা দিয়ে ও লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর মাথায় গায়েবী মামলার হুলিয়া জারি রেখে, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ৭ টি দফার একটি দফা না মেনে, নির্বাচনী মাঠকে পাহাড় সম ব্যবধান রেখেই, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ পৃথিবীর সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে, পার্লামেন্ট বহাল রেখে, পুরো একটি রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, একদল নির্বাচন কমিশনার সহ লক্ষাধিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে, সর্ব ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে, সরকারি সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ বাংলাদেশে একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে গেলেন।
শুধু তাই নয়,,যেখানে গত ১০ বৎসরে বিএনপির নেতাকর্মীদের জেল জুলুম, খুন, গুম, ক্রসফায়ার ও বিভিন্ন প্রকার নির্যাতনের মাধ্যমে নিহত হয়েছেন ১,৫১২ জন। জেলবন্দী আছেন ৭০ হাজারেরও অধিক। ৯০ হাজার মামলায় আসামি আছেন প্রায় ২৬ লক্ষ। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিরতিহীন ভাবে চলছিলো আওয়ামী লীগ ও ইসির সহযোগিতায় বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সন্ত্রাস, হামলা, গ্রেপ্তার ও জুলুম। শুধু তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন দিন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার।
এছাড়া অবিশ্বার্ষ হলেও সত্য যে, ১৭ জন প্রার্থীকে কারাগারে রেখে, ৫০ জনের মতন প্রার্থীকে বিভিন্নভাবে হামলার মাধ্যমে জখম, আরও ৪৬ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ভয়ভীতির মাধ্যমে এক মহুর্তের জন্য মাঠে নামতে না দিয়ে এবং ৫৭ জন প্রার্থীকে মামলা দিয়ে দৌড়ে রেখে এবং ধানের শীষের কোন পোষ্টার লাগানো মাত্র ছিঁড়ে ফেলা ও অনেক স্হানে পোষ্টারিং করতে না দেয়া। এত সব করেও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট আগের রাতেই সিল মেরে বাক্সে ভরে রেখে নির্বাচন সম্পূর্ণ করা।
হায়রে তামাশার নির্বাচন! হায়রে ভোট ডাকাতির নির্বাচন! দেশের অনেক সত্তরর্ধ ও আশির্ধ সিনিয়র সিটিজেনরা বলছেন, ৫৪ সালের নির্বাচন থেকে ভোট দিয়ে আসছি কিন্তু এ ধরনের ভোট ডাকাতির নির্বাচন কোন দিন দেখিও নাই, দেই ও নাই, জীবনে কোন দিন শুনি ও নাই। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্বসহ জাতির কাছে ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগ একদম উলঙ্গ হয়ে গেছে। পাঠক লেখাটি যখন লিখছি তখন, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর “উলঙ্গ রাজা” কবিতাটির প্রতিটি লাইন মনে হচ্ছিল আর প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছিল, ” হে রাজা, তোর কাপড় কোথায়???

দুই.

এছাড়া নির্বাচনের দিন এবং আগের দিন রাতে কি পরিমান অনিয়ম এবং নির্বাচনের নামে নামে প্রহসন করে কি ভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে, কিছুটা চিত্র নীচে তুলে ধরা চেষ্টা করছি।

১। ইকোনমিস্ট পত্রিকার রিপোর্টে প্রকাশ, ঢাকা ১৫ আসনে মনিপুর হাইস্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনের দিন দেখা গেছে, হাজার হাজার ক্ষুব্ধ নারী পুরুষ ঘন্টার পর ঘন্টা স্কুলের বাহিরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদেরকে ভোট না দিয়েই বাড়িতে ফেরত যেতে হয়েছে। কারন পুলিশ ও লীগের কর্মীরা খুবই সামান্য ভোটারকে একটি দরজা দিয়া ভিতরে যেতে দিচ্ছিলেন। অতচ ৩৬টি ব্যালট বাক্স ছিল। দুপুরের মধ্যেই দেখা গেল একটি কক্ষে মাত্র ৪১ জন ভোটার ভোট দিতে পেরেছিলেন। অতচ এখানে ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধিত ছিলেন এক হাজার ভোটার!

২। ঢাকা ৮ ও ৯ আসনের প্রায় সবগুলি কেন্দ্র থেকে ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের মারধর করে বের দিয়েছে পুলিশের সহায়তায় লীগ কর্মীরা, যা সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে আছে। ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ ভোটাররা চিৎকার করে বলছেন, এই দেখেন আমাদের আইডি কার্ড। আমরা ভোট দিতে পারি নাই কেন? আমরা কি এই দেশের নাগরিক নয়?

৩। নরসিংদী ৪ আসনে কাস্তে মার্কা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সিপিবির কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন,” আমার এলাকার একটি ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার নির্বাচনের আগের দিন আমার কাছে স্বীকার করেন যে, তার কাছে প্রশাসনের নির্দেশ ৩৫ শতাংশ ভোটের মিল যেন নির্বাচনের আগের রাতেই দেয়া হয়। পরিশেষে আওয়ামী লীগের চাপে তা ৪৫ শতাংশ হয়ে যায়।

৪। আর গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমম্বয়ক জোনায়েদ সাকি ঢাকা ১২ আসনের প্রার্থী। ১২ জানুয়ারী তিনি গণ শুনানিতে বলেন,” নির্বাচনের আগের দিন রাতেই কেন্দ্র ভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট সিল মেরে ব্যালট বাস্কে ভরে ফেলা হয়েছে। আমরা যারা প্রার্থী ভোট দিতে গিয়েছিলাম, দেখেছি, একটা ভোট কেন্দ্রে ভোটারের তেমন কোন ভিড় নেই অতচ ৯টা বা সাড়ে ৯টার মধ্যেই ব্যালট বাস্কগুলি ভরে গেছে। তাঁহার প্রশ্ন এই বাস্কগুলা কেমন করে পূর্ণ হল?

৫। এছাড়া ঢাকা ৮ আসনের প্রার্থী শম্পা বসু মই মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি অভিযোগ করেন, সকালে সেগুন বাগিচা হাইস্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, কেন্দ্রে কোন ভোটার নাই। অতচ ব্যালট বাক্স ভোটে ভর্তি রয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসারকে জিজ্ঞেস করে জানা যায়, এ পর্যন্ত মাত্র ১০০ টি ভোট পড়েছে। তা হলে বাক্স ভর্তি এত ভোট কোথায় থেকে এলো?
পাঠক, এ ভাবে আর কত লিখব? লিখতে হলে লিখা শেষ হবে না কারণ প্রায় ৪০ হাজার কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রের অবস্থা প্রায়ই এ রকম । অনেক কেন্দ্রে কিন্তু ভোটের তালিকার সংখ্যার চাইতে কাষ্টিং অনেক বেশি ও হয়েছে। এসব জবাব কি নির্বাচন কমিশন দিবে?

৬। এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে ব্যাপক অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটি পূর্ণ বলে মন্তব্য করল ১৫ জানুয়ারি। প্রতিষ্টানটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দিয়াছে। ৩০০ আসন থেকে লটারির মাধ্যমে ৫০ টি আসনকে বেচে নিয়ে পুংঙ্খানুরুপে জরিপ করা হয়। জরিপে দেখা যায়, ৫০ টির মধ্যে ৪৭ টি আসনেই অনিয়ম হয়েছে। এবং ঐ ৫০ টি আসনের মধ্যে ৪১ টিতে জাল ভোট পড়েছে এবং নির্বাচনের আগের রাতে সিল মারা হয়েছে ৩৩ টি আসনে।


৭। ৩ জানুয়ারি জার্মানির পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান নরবার্ট রজেন এ নির্বাচনকে নিয়ে এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ” বাংলাদেশের নির্বাচনী কারচুপির মাত্রা দেখে আমি বিস্মিত! এতে দেশটিতে কার্যকর ভাবে এক দলীয় সরকারের শাসন চালু হয়েছে।

৮। ৩ জানুয়ারি বিশ্বখ্যাত দ্যা ইকোনমিস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন ছিল,” একছত্র ক্ষমতাই আওয়ামী লীগের জন্য কাল হতে পারে”।
এ প্রতিবেদনটিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরেছিল। তারই অংশ বিশেষ আমি তুলে ধরছি, প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ” ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৮৮ টিতে জয়ের অর্থ কি দাঁড়ায়? আওয়ামী লীগ সব চেয়ে জনপ্রিয় দলে পরিণত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় সেটি জানার আর কোন উপায় নেই। নির্বাচনের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ নির্বাচনের মাঠ এতটাই অসমতল ছিল, ভোটাভোটি এতটাই ক্রটিপূর্ণ ও ভোট গণনা এতই অস্বচ্ছ ছিল যে, খোদ আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থকও এই ফলাফল নিয়ে সন্দিহান। এভাবেই ইকোনমিস্ট মন্তব্য করল।

৯। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্র দূত এবং থিংক ট্যাংক উইলিয়াম বি মাইলাম এ নির্বাচনের উপর সদ্য যে বক্তব্য বা পর্যালোচনা দিয়াছেন তা লিখেই আমার লেখাটি শেষ করব।
মিঃ মাইলাম বললেন,” সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশে। যেখানে ভোট চুরির সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে দিয়ে শেখ হাসিনা ৯৭,৬৬% আসন নিজের পক্ষে রাখতে সফল হয়েছেন।
তাছাড়া বাংলাদেশের ভাগ্যে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কথা ইঙ্গিত করে বললেন,” ৯০ দশকে যে সেনাবাহিনী গণতন্ত্রের পক্ষে সুনাম কুড়িয়েছিল, তারা এবার স্বৈরাচার ঠিকানোর দায়িত্ব নিয়ে, যে ন্যাক্কারজনক ঘটনার জম্ম দিয়েছে, তাতে এখন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক,,,, যে সেনাবাহিনী নিজ দেশের নির্বাচন অনুষ্টান সঠিক ভাবে করতে সক্ষম নয়, সেখানে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষীবাহিনীতে যোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন।পাঠক, আমার এই ক্ষুদ্র বিশ্লেষন থেকে প্রতিয়মান,,,, আজ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্বের সব শ্রেনীর মানুষ এবং সংস্থা এ নির্বাচনকে একটি ভোট ডাকাতির নির্বাচন ও প্রহসনের নির্বাচন হিসাবে আখ্যায়িত করছে। নির্বাচনের নামে এ সরকার বার বার প্রহসন করছে, জাতিকে বৃদ্ধা অঙ্গলি প্রদর্শন করছে! একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সব কটি প্রতিষ্টানকে ন্যাক্কারজনক ভাবে ব্যবহার করে, সাংবিধানিক গুরুত্ব পূর্ণ প্রতিষ্টানগুলোকে ধ্বংস করে দিল এবং জনগনের নির্বাচন সম্পর্কীয় উৎসাহ ও উদ্দীপনার স্হানে ভয়ের পাহাড় তৈয়ার করল। তবে ইতিহাস বলে, ভোট ডাকাত ও ফ্যাসিষ্টদের শেষ পরিণতি খুবই করুণ হয় । বিশ্বের ইতিহাসে মানুষ বার বার দেখেছে। বাংলাদেশও বিশ্বের মানচিত্রের ভিতরেই একটি দেশ।
অতএব এই ধরণের ভোট ডাকাত ও ফ্যাসিষ্ট সরকারের জন্য একটি করুন পরিণতি অবশ্যম্ভাবী।

উপদেষ্টা সম্পাদক
শীর্ষখবর

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, শীর্ষ খবর ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1401 বার