জিয়ার মূল্যায়নে এত কার্পণ্য কেন

Pub: শনিবার, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯ ২:৪২ অপরাহ্ণ   |   Upd: শনিবার, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯ ২:৪৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এমাজউদ্দীন আহমদ: প্রত্যেক জাতি তার কৃতী সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শ্রদ্ধেয় হয়। তার সেরা ব্যক্তিত্বদের জড়িয়ে রাখে সীমাহীন স্নেহ, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার কোমল আঁচলে। এটিই নিয়ম। বাংলাদেশে কিন্তু সব কিছুই উল্টো। স্রোতের বিপরীতে চলার ক্ষমতা না থাকলেও উল্টোপথে চলার হীনম্মন্যতার অভাব নেই এই দেশে। বাংলার মাটি বড় উর্বর। এ মাটিতে যেমন ফলে অনায়াসে সোনার ফসল, তেমনি এ মাটি লাভ করেছে বহু জ্ঞানী-গুণীর কোমল স্পর্শ। বহু কৃতী সন্তানের জননী এ দেশ, বাংলাদেশ। আবুল কাশেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান— শুধু কতগুলো নাম নয়। একেকজন বাংলাদেশ রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অধ্যায়। তাঁদের মধ্যে কে বড় আর কে ছোট—এ প্রশ্ন করার অধিকার কে কাকে দিয়েছে? আজকের বাংলাদেশে যা কিছু গর্বের, যা কিছু সম্মানজনক তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওই সব মহান ব্যক্তিত্বের অবদান। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেই এ জাতি হতে পারে সম্মানীয়। ধন্য।

কিন্তু ওই যে বলেছি, এ দেশে কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা সব কিছুকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত। সবাইকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলে যদি দলের কোনো ক্ষতি হয়! দলীয় নীতি এবং নেতাকে সর্বোচ্চ উপস্থাপন করতে গিয়ে তাই তাঁরা অন্য দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে ধূলিধূসরিত করতে এতটুকু দ্বিধান্বিত হন না। দলীয় নেতাকে আকাশে স্থাপন করতে তাই তাঁরা অন্যকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ করেন না।

স্বল্প উচ্চতাসম্পন্ন বনাঞ্চলে ছোটখাটো গাছপালা মনে করে তাদের শীর্ষই আকাশ স্পর্শ করছে। দূরে কোনো বটবৃক্ষ বা তালগাছকে তাই তারা এড়িয়ে চলে। মনে করে ওইগুলো ব্যতিক্রম। দুই দিন পর তারা ওই সব ছোটখাটোর পর্যায়ে নেমে আসবে। আকাশছোঁয়া বটবৃক্ষ কিন্তু অন্য বটবৃক্ষের মূল্যায়নে কোনো ভুল করে না। জিয়া সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদের মূল্যায়নের দিকে দৃষ্টি দিলে এর সত্যতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। স্বাধীনতাযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কৃতিত্বকে তিনি ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বেতার ভাষণে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমানবাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যূহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্তালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে।’

একই বক্তৃতায় মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উল্লেখ করে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, এই প্রাথমিক বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়াউর রহমান একটি পরিচালনাকেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর। এখানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর বলতে কী বোঝায় এবং এ বক্তব্য অন্য কারো নয় বরং বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হলে তার অর্থ কী হয় তার বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান যা করেছেন তা না করলেও শুধু এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসে নাম  লেখাতে পারতেন স্বর্ণাক্ষরে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই শোনা গিয়েছিল তা-ই নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতেও তা শ্রুত হয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান যখন ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে যান তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি তাঁর সম্মানে প্রদত্ত এক ভোজসভায় ২৭ ডিসেম্বর বলেছিলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দানকারী হিসেবে আপনার মর্যাদা এরই মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর জাতীয় অগ্রগতি ও জনকল্যাণে নিবেদিত একজন জননেতা হিসেবে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে আপনি গভীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।’ Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave freedom fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh. Since you took over the reins of government in your country, you have earned wide respect both in Bangladesh and abroad as a leader truly dedicated to the progress of your country and the well being of your people. (M Shamsul Haq. Bangladesh in International Politics, 1993, P. 96)।

বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্য অবদান কে অস্বীকার করবে? জাতীয়তাবাদের হাজারো সূত্রের বিন্যাসে এবং জনগণকে সেই সূত্রের ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলার কৃতী সন্তান ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীর অবদানকে অস্বীকার করা আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর। তেমনি ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে জিয়াউর রহমানের অবদানকে খাটো করার প্রচেষ্টাও বিরাট এক প্রবঞ্চনা। শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাই নয়, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বই বা কার ওপর ন্যস্ত ছিল? এসব বিষয়ে ইতিহাস নীরব। এই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য কাল্পনিক কোনো তথ্য বা তত্ত্ব সংযোজিত হওয়াও ঠিক নয়।

ইতিহাসের অমোঘ বিধান অনুযায়ী জাতীয় অগ্রগতিতে রয়েছে এক ধারাবাহিকতা। ইতিহাসের এক নায়ক যেখানে শেষ করেছেন অন্যজনের সূচনা সেখান থেকেই। জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তার ক্ষেত্র তৈরি করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। জিয়াও তো শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণা দান করেন। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সুকর্ষিত ভূমিতেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের বীজ বপন করেন। যে ভূমি সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী কর্ষণ করেন তার সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে আগাছা নির্মূলকরণ, পানি সিঞ্চন প্রভৃতি সম্পন্ন হয় তারও আগে, বলতে পারি আবুল কাশেম ফজলুল হক কর্তৃক। এভাবে ধারাবাহিক ক্রমে বহু পেছনে যেতে হবে। যেতে হবে দুদু মিঞা, তিতুমীর পর্যন্ত, এমনকি তারও পেছনে। শুরু করতে পারেন ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন থেকে। বহু ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাজারো মতানৈক্য ছাপিয়ে আজকে আমরা পৌঁছেছি আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে। বহুজনের সীমাহীন ত্যাগ ও কঠোর তিতিক্ষার তীর ঘেঁষে বাংলাদেশে উদিত হয়েছে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। বহু কৃতী নেতার লালিত স্বপ্ন মূর্ত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। পরম শ্রদ্ধাভরে ওই সব ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা উচিত।

বিতর্ক হতে পারে বর্তমানকে নিয়ে। বিতর্ক হওয়া উচিত ভবিষ্যতের কর্মপন্থা সম্পর্কে। অতীত আমাদের গৌরবোজ্জ্বল। সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতের উত্তরাধিকারী আমরা। তা কোনো ক্রমে বিতর্কিত হওয়া উচিত নয়। বিস্তৃত পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একজন যেন অন্যের পরিপূরক। এটিই স্বাভাবিক। সোহরাওয়ার্দী যেমন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের উচ্চমার্গে ভ্রমণ করেছেন, ভাসানী তেমনি নির্ধারিত নীতি বাস্তবায়িত হলে জনগণের জীবনে তার কিরূপ প্রতিফলন ঘটে তার বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুসংহত করার ক্ষেত্রে যেসব নীতি নির্ধারণ করেন, জিয়াউর রহমান ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের ব্যাপকভিত্তিক সংহতির মাধ্যমে একই লক্ষ্য অর্জনে ছিলেন বদ্ধপরিকর। সবারই উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে জনগণের উন্নত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। দীর্ঘদিন পরে কে বড় আর কে ছোট এই বিতর্কে প্রবৃত্ত হওয়া হীনম্মন্যতার নামান্তর। জাতীয় স্বার্থে, জাতীয় ঐক্যানুভূতির স্বার্থে, বিশেষ করে বর্তমানকে ভবিষ্যতের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের স্বার্থে আজকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অতীতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই জিয়াকে মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে, ডান, বাম ও কেন্দ্রের সংমিশ্রণে নেতৃত্ব সংগঠনে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক অবসানে, অর্থনীতি ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ দানে, বিশ্বরাজনীতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রুশ-ভারতের কক্ষপথ থেকে সরিয়ে এনে স্বতন্ত্রভাবে চলার গতিপথ নির্ধারণে, এমনকি আঞ্চলিক পর্যায়ে সংঘর্ষের পরিবর্তে সহযোগিতার পথনির্দেশ দানে জিয়ার যে অবদান তার মূল্যায়ন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে হওয়া অভিপ্রেত। এ ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য অমার্জনীয়।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1083 বার