ইতিহাসের পাদপীঠ ডাকসু : নির্বাচনী প্রত্যাশা ও করণীয়

Pub: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯ ৩:৩৯ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯ ৪:১২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামসুজ্জামান দুদু:
ইতিহাসের পাদপীঠ ডাকসু : নির্বাচনী প্রত্যাশা ও করণীয়
প্রায় ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে, এটা সরাসরি বলা যাবে না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। এক কথায় বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে এ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। সরকার সমর্থিত মহল, তারা বোঝানোর চেষ্টা করছে অথবা বলার চেষ্টা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতির আহ্বানের পরই এই নির্বাচন অর্থাৎ ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কথাটা ঠিক না। সব দিক বিবেচনায় এনে অথবা বিশ্লেষণ করে দেখলে বোঝা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠিত করতে বাধ্য হয়েছে।

এই ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও অন্তত ছয় বার গ্রহণ করেছিল। এবং তারিখও ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় নাই। এই সরকারের আমলে এই নির্বাচন সপ্তমবারের মতো উদ্যোগ বলা যায়। যদিও অনেকে আশঙ্কা করছে এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে কি না। তারপরও আমি আশাবাদী হয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

এ নির্বাচন যদি হয়, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পরিবেশ পরিস্থিতি আছে কিনা তা আমাদের একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখা দরকার। এখন আমরা দেখতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান আছে কিনা অর্থাৎ সকল পথ ও মতের ছাত্র সংগঠনগুলো স্বাভাবিকভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে কি না। যদি তা সম্ভব না হয়ে থাকে তাহলে তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা।

আমি যতটুকু জানি, সরকারের সমর্থক ছাত্র সংগঠন এবং সরকার সমর্থিত দল বা গোষ্ঠীর কতিপয় ছাত্র সংগঠনই শুধু ডাকসু নির্বাচন ঘিরে কার্যক্রম চালাতে পারছে। সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠন সেখানে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছে না। দীর্ঘদিন থেকে, প্রায় এক যুগ সেখানে সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে না, হলগুলোতে থাকতে পারে না। এই বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষও জানে। সরকারও জানে। এখন নির্বাচন আসাতেই এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখন পর্যন্ত বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, হলে অবস্থান নেয়ার ন্যূনতম কোনও ব্যবস্থা করে দেয়া হয়নি। অথচ ছাত্রদল ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত একক বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন। এই ছাত্র সংগঠনটি এখন যেমন ক্যাম্পাসে থাকতে পারে না, তেমনই কর্মকাণ্ডও চালাতে পারে না। ছাত্রদলকে শুধু নির্মমভাবে আঘাতই করা হয়নি, তাদেরকে ঠেকানোর জন্য যতরকম নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা আছে বিগত দিনগুলোতে এমনকি এখনও তার সবরকম ব্যবস্থাই করে রেখেছে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো। যদি ভালো একটি নির্বাচন করতে হয়, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করতে হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয় তাহলে প্রধান ছাত্র সংগঠনের অন্যতম জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ করে দিতে হবে।

ছাত্রদল এবং অন্যান্য বিরোধী ছাত্র সংগঠন তাদের যেসব দাবিদওয়া ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করেছে সেই দাবিদাওয়া গুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে তার মীমাংসা করা জরুরি। ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাদে অন্য কোনও ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না। মধুর ক্যান্টিনে বসতে পারছে না এবং হলেও থাকতে পারছে না। তাহলে ভালো নির্বাচন হবে কী করে? এটা কি স্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত করে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার। পাকিস্তানের জামানায় এই ভূমিতে যতগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হয়েছে তার সবগুলোর ভিত্তিমূল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস একেবারেই অসম্পূর্ণ। যে কোনও সময় যে কোনও আন্দোলনে হোক রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক, হোক বুদ্ধিবৃত্তিক সবটাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও না কোনোভাবে সম্পর্ক ছিল। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ অথবা ২৯ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যারা করবেন তাদের এক পক্ষকে সুবিধা দেয়ার জন্য এবং অন্য পক্ষকে ঠেকানোর জন্য আইন হবে কমিটি হবে এটা চিন্তা করাও তো এক ধরনের অপরাধ।

আমি ভাবতেই পারছি না এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেখান থেকে বাংলাদেশের গৌরবমণ্ডিত ঐতিহাসিক সব আন্দোলন হয়েছে সে আন্দোলনের পাদপীঠে শুধু সরকারি ছাত্র সংগঠনগুলো থাকবে ভিন্নমতের কোনও ছাত্র সংগঠন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে না। বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোকে অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হবে, অনুমতি নিয়ে বসতে হবে চলতে হবে! একি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি পেটুয়া বাহিনীদের একটা নির্যাতন ক্যাম্প? স্বাধীনতার ৪৭ বছরে পদার্পণ করে আমাদেরকে এটাও দেখতে হলো!

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা এখন দায়িত্বে আছেন ছাত্রদের লেখাপড়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এবং যাদের মাধ্যমে আগামী ডাকসু নির্বাচনের দায়িত্ব পড়েছে তাদের কাছে সোজাসোজি কিছু কথা বলি। এই নির্বাচনটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখন কোথাও কিছু স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিক থাকবে আমি তেমনটা মনেও করি না। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় তো অন্য সবকিছু থেকে আলাদা। সেই আলাদা ভাবনা থেকে আপনাদের কাছে এই কথাগুলো বলা। ‘অধিকার হরণ করা খুব সহজ, কিন্তু অধিকার রক্ষা করাই বোধহয় সব থেকে কঠিন’। এখন সে কঠিন কাজের মধ্যেই আপনারা আছেন। শুধু সরকারকে দেখবেন তা তো হয় না। সরকারের বাইরেও তো অনেকে আছেন। সবার সঙ্গে বসুন। আলোচনা করুন। বুঝবার চেষ্টা করুন এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগানো হয়। এই সেই বিশ্ববিদ্যালয় যেখান থেকে এদেশের ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল। নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দেয়ার কোনও প্রয়োজন নেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুটাও এখানেই কিন্তু তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গণতন্ত্রের স্বপক্ষে এখান থেকেই কিন্তু লড়াইটা শুরু হয়েছিল।

মনে নেই এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কথা অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লড়াইয়ের কথা! এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ভুলে গেলে তো চলবে না। সেই জন্য সময় থাকতে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। ঠিক না?

লেখক: ভাইস-চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1049 বার