নির্বাচনী প্রহসন ও পুনর্নির্বাচন

Pub: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯ ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯ ১:০৩ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড. আবদুল লতিফ মাসুম:
নির্বাচন’ কাকে বলে? এটাও এখন অভিধান দেখে ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশে নির্বাচনের যে হাল হকিকত, তা দেখে নির্বাচন সম্পর্কে বোঝার কোনো উপায় নেই। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অব পলিটিক্সে ‘নির্বাচন’ বলতে বুঝানো হয়েছে, ‘এমন সব বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন, প্রথা-পদ্ধতি যার মাধ্যমে নাগরিক সাধারণ তাদের শাসক নির্ধারণ করে থাকেন।’ নির্বাচন মানেই জনগণের মতামত প্রকাশের ব্যবস্থা। একসময় রাজা ছিলেন মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। রাজ্য শাসন সম্পর্কে জনগণের মতামতের কোনো তোয়াক্কা রাজা-বাদশাহরা করতেন না। তবে সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে জনগণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।

স্বীকৃত এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘গণতন্ত্র’। জনগণের তন্ত্র বা ব্যবস্থা প্রয়োগ ও প্রকাশের মাধ্যম হলো নির্বাচন। একটি রাষ্ট্রে লাখো লাখো বা কোটি নাগরিকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিনিধি নির্ধারিত হয়ে আসেন নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু যখন নির্বাচন ব্যবস্থাটি হয়ে পড়ে শাসকদের যথেচ্ছাচার, তখন এর কার্যকারিতা আর অবশিষ্ট থাকে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নির্বাচন ব্যবস্থাটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে আসছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান বাতিল করে দিয়ে নির্বাচনকে তাদের খেলার পুতুলে পরিণত করেছে। ২০১৪ সালে যখন তারা একরকম নির্বাচন ছাড়াই জাতীয় সংসদ গঠন করেন, তখন তাকে ‘তামাশার নির্বাচন’ বলে অভিহিত করা হলো। জনগণের জন্য আরো যে কত ‘তামাশা’ অপেক্ষা করছে তা তখন অনুমান করা কঠিন ছিল। এবার গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন দেখে জনগণ বলাবলি করছে, এই তামাশার কাছে আগের তামাশা ফেল মেরেছে।

এই নির্বাচনে তামাশার চেয়েও আরো ভালো শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর তা হচ্ছে ‘প্রহসন’। ড. কামাল হোসেন থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীরা প্রায় সবাই ‘প্রহসন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন এ ক্ষেত্রে। শব্দটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ ডজনখানেক পত্র-পত্রিকা এই নির্বাচনকে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ বলেছে। ‘প্রহসন’ শব্দটি তামাশার মতো অত সহজ বা হালকা নয়। এর একটি ব্যাকরণিক অর্থ ও তাৎপর্য আছে। বাংলা অভিধানে প্রহসন বলতে- ঠাট্টা, রঙ্গ, পরিহাস, রসিকতা, শ্লেষ, বিদ্রƒপ, কটাক্ষ ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। এর একটি নাটকীয় অর্থ রয়েছে। প্রহসন হচ্ছে ‘হাস্যরসপ্রধান স্বল্পদৈর্ঘ্য নাট্যধর্মী রচনা।’ সাম্প্রতিক নির্বাচনের আকার, প্রকার ও প্রকৌশল দেখে সহজেই বোঝা যায় যে, প্রহসন বলতে যা বলা হয় তার সবটুকু বিগত নির্বাচনে রয়েছে। এটা কোনো নির্বাচন বা জনগণের শাসক বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ছিল না। এটা ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার একটি বিবেকহীন মহড়া। সংবাদপত্রে শিরোনাম ছিল ‘একচেটিয়া ভোটে নৌকার জয়’। প্রায় সব সংবাদপত্রে একই রকম ভাষা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সারা দেশের ভোটচিত্র জানাতে গিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত’ মাঠ, অসংখ্য অনিয়ম এবং অজস্র অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনী দুর্নীতির ফিরিস্তি দীর্ঘ না করে এটুকু বলা যায়, জনগণ এ নির্বাচনকে মেনে নেয়নি।

দেশে ও বিদেশে কোনোভাবেই এমন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। উপরে ‘ফিটফাট’ দেখে যারা রিপোর্ট দিয়েছিলেন তারাও নিজেদের কথা শুধরিয়ে বলেছেন, ভেতরের ‘সদরঘাট’ তারা দেখেননি। জাতিসঙ্ঘ নির্বাচনী অভিযোগগুলোকে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই নির্বাচনী ফলাফলকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলেছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশের বিরোধী সব রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ৩০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রকাশিত ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রবীণ নেতা ড. কামাল হোসেন পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান। ফলাফল প্রকাশের প্রথম ক্ষণের এই জোরালো দাবি সমর্থিত হয়েছে মতাদর্শ নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী সব মহল থেকে। ভোটডাকাতির অভিযোগ এনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশের রাজনীতিতে অগ্রসরমান বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রধান মুফতি মোহাম্মদ রেজাউল করিম- পীর সাহেব চরমোনাই। তিনি বলেন, ৩০ ডিসেম্বর প্রহসনের নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি।

তাই এ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি।’ তিনি অনতিবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানালেন। ফলাফল বাতিলের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট মুখে কালো কাপড় বেঁধে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে। এতে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশবাসীকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভুয়া ভোটে যাদের নির্বাচিত করা হয়েছে, তাদের সবাইকে জনগণ ভুয়া প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করছে। জনগণের কাছে ‘জনগণের প্রতিনিধি’ বলে দাবিদারদের কোনো বৈধতা নেই। সভায় কোটি কোটি ভোটারের ভোটাধিকার হরণ করে সঙ্ঘটিত নজিরবিহীন ভোটডাকাতির নির্বাচন বাতিল এবং নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করা হয়। নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংগঠন টিআইবি এই নির্বাচনের ফলাফলকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে মন্তব্য করে এ ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানায়। পরে ৫০টি আসনে পরিচালিত সরেজমিন তদন্তের প্রতিবেদনে তারা ৪৭টি আসনে অনিয়মের তথ্য প্রমাণাদি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেন। অপর দিকে, সরকারি দল দাবি করে যে, সহিংসতা উপেক্ষা করে জনগণ ভোট দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচনকে ‘শেখ হাসিনার পক্ষে গণজোয়ার’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির ভরাডুবি ঘটেছে নিজের দোষেই।’ এভাবে আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা বিএনপির নানা দোষত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, একরকম অপরাধ বোধ থেকেই তারা ওই রকম মন্তব্য করে থাকবেন। পুনর্নির্বাচনের দাবিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওবায়দুল কাদের ওই দাবিকে ‘মামাবাড়ির আবদার’ বলে মন্তব্য করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, নতুন করে নির্বাচন দেয়ার ‘কোনো সুযোগ নেই’।

ভোটগ্রহণের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এসব মন্তব্যের বাইরে ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ খবরে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সম্ভাব্য গণ-আন্দোলন ও বিদেশী চাপ এড়ানোর জন্য সংসদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবতেও পারে। তবে তা আন্দোলনের তীব্রতা আর কূটনৈতিক চাপের ধরনের ওপর নির্ভর করছে। পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক মহল পুনর্নির্বাচনের পরামর্শ দিয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা যায়। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল দৃশ্যত ২০২১ সালের আগে কিছু করতে নারাজ বলে জানা গেছে। তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করেই কেবল বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারে বলে একই সূত্রে বলা হয়েছে।

এদিকে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোটে নির্বাচন প্রশ্নে এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিপরীত মতাদর্শের সংশ্লিষ্ট তিনটি জোট ও দল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। অনেকটা স্বকীয় তথা তৃতীয় ধারার রাজনীতির প্রবক্তা চরমোনাই পীর সাহেব আন্দোলনের মাধ্যমে পুনর্নির্বাচন দাবির অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগের ঘোষণাও দিয়েছেন। এভাবে যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ‘ইসলামী আন্দোলন’ পৃথক পৃথকভাবে একই লক্ষ্যে গণ-আন্দোলনের সূচনা করতে পারে তাহলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। নির্বাচন-পরবর্তী বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে বিরোধী দলগুলো ক্রমেই সংগঠিত হচ্ছে। উল্লিখিত তিনটি পক্ষই গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা গেলে আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠবে। দেশের জনগণ আন্দোলনের জন্য মনঃস্তাত্ত্বিকভাবে তৈরি হয়ে আছে। সরকারের নিপীড়নকৌশলের কারণে হয়তো তারা মুখ খুলতে চাইছে না। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনের সময় পরস্পর বিপরীত আদর্শের দল ও জোটগুলো যুগপৎ আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। অব্যাহত আন্দোলনে তারা সফল হয়েছিল। এবারো তা সম্ভব হবে না কেন? শর্ত একটিই- জাতীয় ঐক্য। কোনো দল বা ব্যক্তিবিশেষকে ক্ষমতায় নেয়ার জন্য যদি এই আন্দোলন হয়, তা সফল নাও হতে পারে। জনগণের সতত সমর্থন তখনই লাভ করা যাবে, যখন গণতন্ত্র এবং সুশাসন সংগ্রামের লক্ষ্য হবে।

নির্বাচনী কারচুপির পর দেশে দেশে আন্দোলনের উদাহরণ নতুন নয়। এই সময়ে ভেনিজুয়েলা একটি উদাহরণ। সেখানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো বারবার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করে ক্ষমতায় রয়েছেন। গত নির্বাচনে কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এরপর সময় সুযোগ বুঝে জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। সেখানে জনগণ ভাগ্যবান এই জন্য যে, তারা তাদের আন্দোলনের সাথী হিসেবে পার্লামেন্টের স্পিকারকে পেয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী সাথে নিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছেন মাদুরো। আর জনগণের বিরাট অংশকে নিয়ে স্পিকার হুয়ান গুইয়াদো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। অতীত থেকে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৭৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং পিপলস পার্টি প্রধান, ধূর্ত রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো যে কাজ করেছিলেন ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে, তা হয়েছে এ দেশে। পাকিস্তানে তখন বিরোধী দলগুলো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন- ‘এমআরডি’ গঠন করেছিল। তাই ভুট্টোর সে নির্বাচন টিকেনি। বাংলাদেশে সাংবিধানিক প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপি সরকার এরকম একটি নির্বাচন করেছিল ১৯৯৬ সালে। তারা আন্দোলনের মুখে নয়, বরং স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও পদত্যাগ করে পুনর্নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘শিগগিরই আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ সে সময় তিনি সে নির্বাচন করেননি বা করতে পারেননি। খোলা মন নিয়ে, বিবেকের তাড়না থেকে তিনি আরেকটি নির্বাচনের কথা তাই ভাবতে পারেন। জনগণের কাছে বারবার ফিরে যাওয়ায় কোনো অগৌরব নেই। ‘সব ক’টা জানালা খুলে দিলে খোলা বাতাস বইবে।’ মানুষের জমে থাকা ক্ষোভের অবসান হবে। অন্যথায়, বহতা নদীতে বাঁধ দিলে তা একসময় প্লাবনের কারণ ঘটাতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1121 বার