মধ্য রাতের ভোট : সিইসির পরোক্ষ স্বীকারোক্তি অবিলম্বে কমিশনের পদত্যাগ করা উচিত

Pub: মঙ্গলবার, মার্চ ১২, ২০১৯ ৩:২১ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, মার্চ ১২, ২০১৯ ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোবায়েদুর রহমান :
৩০ ডিসেম্বরের ভোটের পর থেকেই এই কলামে আমি বেশ কয়েকবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বলেছি যে, ইলেকশন বলতে যা বোঝায় এবারে তার কিছুই হয়নি। ইলেকশনের নামে যে একটি তামাশা হবে, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম ২৫ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে। এর আগে ইনকিলাবের এই কলামে আমি একাধিকবার বলেছি যে, ২৫ ডিসেম্বর ইলেকশনে অংশ নেওয়ার জন্য অতি প্রত্যুষে আমি সপরিবারে ঢাকা থেকে রওয়ানা হই। নাস্তা করার জন্য এলেঙ্গা রিসোর্টে আমরা যাত্রা বিরতি করি। সেখানে আমি এবং আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দুই জনে দুটো ফোন কল পাই। ঐ ফোনেই আমরা জানতে পারি যে, ভোটে কিভাবে জালিয়াতি, প্রতারণা এবং বলপ্রয়োগ করা হবে। টেলিফোনে আমাদেরকে একথাও বলা হয় যে, এলেঙ্গা তো ঢাকা এবং বগুড়ার মাঝ পথ। কষ্ট করে আর বগুড়া যাবেন কেন? গিয়ে কোনো লাভ হবে না। এর চেয়ে বরং ঢাকা ফিরে যান।
আমার যতদূর মনে পড়ে, আমার আগের কলামগুলোর দুই একটিতে আমি এসব কথা লিখেছিলাম। তারপরেও আমরা বগুড়ায় যাই। সেখানকার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা আমি লিখেছি। প্রায় মাস খানেক আগে আমি লিখেছি যে, আসল ভোট ৩০ তারিখে না হয়ে যে, ২৯ তারিখ রাতে হবে সেটি আমরা ২৭ তারিখেই জানতে পেরেছিলাম। সপরিবারে আমরা যেখানে অবস্থান করছিলাম সেখানে বগুড়ার ধানের শীষ ধারী ৪ জন প্রার্থী মিলিত হন। তারাও খবরটি আগেই পেয়েছিলেন। তারা তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তটি অনুমোদনের জন্য বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ করেন। তারা বলেন যে, উইথড্র করা চলবে না। ৩০ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। সুতরাং প্রার্থীরা হাই কমান্ডের নির্দেশ মেনে যার যার জায়গায় পড়ে থাকেন। তারা নির্বাচনী গণসংযোগের জন্যও ২৭ তারিখ থেকে বের হতে পারেননি। কারণ বের হলেই তাদের গাড়িতে হামলা হবে এবং তাদের মিছিল এবং সমাবেশেও হামলা হবে।
তারপর যা ঘটবার তাই ঘটলো। ২৯ তারিখ রাতেই ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যালট পেপারে নৌকার সীল মারা হলো। পরদিন সকাল ১১টার মধ্যে অধিকাংশ কেন্দ্র থেকে বলা হয় যে, ব্যালট পেপার ফুরিয়ে গেছে। শুধু আমি নই, এসব খবর প্রায় সবাই জানতেন। আমি লক্ষ্য করি যে, সন্ধ্যার পর থেকে যখন টেলিভিশনে ভোটের ফলাফল ঘোষিত হচ্ছিলো তখন সেই খবর শোনার জন্য কাউকেই আগ্রহী দেখলাম না। অনেকে টেলিভিশন বন্ধ করে রেখেছিলেন। তাদের কথা হলো, ফলাফল কি হবে সেটি তো আমরা দুই দিন আগেই জানি। ইলেকশন তো আসলে আগের রাত্রে অর্থাৎ ২৯ তারিখ রাতেই হয়ে গেছে। ফলাফলও তো সেই মতোই সাজানো হয়েছে। এখন শুধু মাত্র সেই ফলাফল টেলিভিশনে ঘোষণা করার অপেক্ষা। যে সিইসি নির্বাচনের পর বলেছিলেন যে, এমন সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে যেটি চিত্রে রেকর্ড করে রাখবার মতো। অথচ সেই একই সিইসি গত ৮ মার্চ বলেছেন, সমাজে একটা অনিয়ম প্রবেশ করে, সেটাকে প্রতিহত করার জন্য আরেকটা আইন তৈরি করা হয়। তাই আগের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার সুযোগ বন্ধে ইভিএম চালু করা হবে। রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, সেটা বলার সুযোগ নির্বাচন কমিশনের নেই বলেও জানান সিইসি। তিনি বলেন, কারা সেজন্য দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সেই শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে এগুলো হচ্ছে তা বলারও কোনো সুযোগ নেই। সবাই মিলে বিষয়টি দেখতে হবে। তাহলেই অবস্থার উন্নতি হবে।
সিইসি ৮ মার্চ শুক্রবার পরোক্ষভাবে যে ভোট ডাকাতি অর্থাৎ রাতের ভোটের কথা বলেছেন সেটি দেশের কোটি কোটি লোক ২৯ তারিখেই দেখেছে। তারা দেখেছে নির্বাচনের নামে কি হয়েছে। কিন্তু এই সব কথা তখন প্রকাশ্যে বলা বা লেখা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যদিও বা এসব কথা বলা হয়েছে তখন শাসক দলের তরফ থেকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়েছে , প্রমাণ দেখান। তো, ভোট কারচুপির প্রমাণ কি দেখানো যায়? ভোট জালিয়াতি চোখে দেখা যায়, অনুভব করা যায়, কিন্তু ডকুমেন্ট রাখার কোনো সুযোগ থাকে না। আপনি যদি প্রমাণ দিতে না পারেন (এবং যেটি বাস্তবে সম্ভব নয়) তাহলেই আপনার বিরুদ্ধে মামলা। কে যাবে এত ঝামেলায়? সুতরাং শক্তভাবে এসব বিষয়ে কাগজপত্রে অনেকেই কিছু লেখেননি। ইলেকশনের পর বেশ কয়েকদিন ধরে সবগুলো চ্যানেলের সবগুলো টকশোতে জুড়ে বসেছিলেন আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং টকাররা। তখন থেকেই তারা বলা শুরু করেছেন যে, যারা আগের রাতে ভোটের অভিযোগ তুলছে, তাদেরকে এসম্পর্কে অবশ্যই প্রমাণ দিতে হবে।
বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এবং পুনঃ নির্বাচন দাবি করে। তারা অবশ্য ১ জানুয়ারি মিটিং করে এবং প্রেস কনফারেন্স করে সরাসরি অভিযোগ করে যে, ইলেকশন ৩০ ডিসেম্বর হয়নি, ইলেকশন হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর রাতে। অবশ্য বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও পুনঃ নির্বাচনের দাবিতে তারা রাজপথে নামার কোনো রকম কর্মসূচি দেয়নি। কোনো প্রতিবাদ সভা করেনি। কোনো মিছিল করেনি।
বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচনের পরপরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেন যে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচন নিয়ে আইন শৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির এক সভায় সিইসি বলেছিলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন এমন সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে হয়েছে এর চিত্র রেকর্ড রাখার মতো।
দুই
অবশ্য একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কারো কাছেই সিইসির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয়নি। টিআইবি গত ১৫ জানুয়ারি ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫০টি আসন বেছে নিয়ে এই গবেষণা করে সংস্থাটি। এর মধ্যে ৪৭ আসনে নির্বাচনের দিন কোনো না কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে। ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা পেয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গতকালের বক্তব্যের মাধ্যমে সিইসি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন যে আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার ঘটনা ঘটেছে।
জাতীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি করে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা ৭৪টি মামলা করেন। এরপর গত ২২ ফেব্রুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে গণশুনানি করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এতে ফ্রন্টের মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব প্রার্থীই অভিযোগ করেন, আগের দিন রাতেই তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটের বাক্স ভরে রাখা হয়।
আটটি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোট গত ১১ জানুয়ারি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে গণশুনানি করে। এতে জোটের ১৩১ জন প্রার্থী নির্বাচনে অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। অধিকাংশই প্রার্থী জানান, ভোটের দিন সরকারি দলের লোকজন ভোটকেন্দ্র জবরদখল করে রেখেছিল। কাউকে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। বিরোধী দলের কোনো পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভোট গ্রহণের আগের রাতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়েছিল।
তিন
স্বাভাবিকভাবেই সিইসির ঐ বক্তব্যের পর এক মাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া সব মহলে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়নি সেটি সিইসির বক্তব্যেই প্রকাশ পেয়েছে। সিইসি আরও বলেছেন আগামীতে ভোটে ইভিএম শুরু করে দেব। তাহলে আর রাতে বাক্স ভর্তির কোনো সুযোগ থাকবে না। এই কথার সূত্র ধরে কামাল হোসেন বলেছেন যে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয় নাই। তার মতে ৩০ ডিসেম্বরের কলঙ্কিত সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে।
বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, সিইসি তার বক্তব্যের মাধ্যমে পরোক্ষ ভাবে মিড নাইট ইলেকশনের কথা অর্থাৎ দিনের পরিবর্তে মধ্যরাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা (ব্যালট বাক্স ভরার কথা) স্বীকার করেছেন। এর পর তাঁর আর ক্ষমতায় থাকার কোনো ভিত্তি নাই এবং যাদের নির্দেশে তারা এই কাজটি করেছেন সেই নির্দেশদাতাদেরও ক্ষমতা থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়া উচিত।
প্রত্যক্ষভাবে হোক আর পরোক্ষ ভাবে হোক, সিইসি যখন স্বীকার করেছেন যে, রাতেও ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছে তখন আর সেই নির্বাচনের নৈতিক ও আইনগত কোনো ভিত্তি থাকে না। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পার্লামেন্টেরও কোনো নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি থাকে না। সেই পার্লামেন্টের ভিত্তিতে গঠিত সরকারেরও কোনো নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি থাকে না। এই দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে বর্তমান প্রশাসনের আইনগত ভিত্তি শুধু নড়বড়ে হয়নি, সেটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তারপরেও যদি সরকার চলে, সংসদ চলে, তাহলে সেটির ভিত্তি হবে বল প্রয়োগ।
এই পরিস্থিতিতে সরকার কি করবে সেটি পরের কথা। কিন্তু সর্বাগ্রে সিইসি সহ গোটা নির্বাচন কমিশনের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। এই নির্বাচন কমিশন পদত্যাগ করলে একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত। আর যেহেতু আগের রাত্রে ভোটের বাক্স ভরা হয়েছে, সেই কারণে নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগ করতে হবে, তাই সেই নির্বাচনও তখন অবৈধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন বাতিল করে পুন নির্বাচন দিতে হবে। সিইসির পরোক্ষ স্বীকারোক্তির সুদূর প্রসারী তাৎপর্য এটাই।
journalist15@gmail.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1175 বার