ডাকসু নির্বাচনের বিশ্লেষণ

Pub: বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৪, ২০১৯ ১০:২৭ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৪, ২০১৯ ১০:২৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ :

মাত্র ১২ দিন আগে (২ মার্চ ২০১৯) দৈনিক দেশ রূপান্তরে লিখেছিলাম, পদাধিকার বলে যিনি ডাকসুর সভাপতি পদে নির্বাচিত (সিলেক্টেড) হয়ে আছেন, সেই ভাইস চ্যান্সেলর ভূমিকাও এতটাই পার্টিসান হয়ে পড়েছে যে, তাকে ইসির কার্বন কপি ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো। ভিসি পদে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইস্যুতে ভিসি মহোদয়ের বক্তব্য দেখে এটা অনেকটাই স্পষ্ট, তার ব্যক্তিত্ব ইসি মহোদয়ের থেকে কোনো অংশে কম নয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা ইসি যে ভাষায় যে সুরে কথা বলেন, ‘ভিসি মহোদয়ও সে ভাষায় সে সুরেই কথা বলছেন। সরকারি দলের প্রতিপক্ষকে তারা দুজনেই তাদের প্রতিপক্ষ জ্ঞান করেন বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ আছে। ফলে ইসি দেশে যেমন একটা ফ্যান্টাস্টিক নির্বাচন উপহার দিয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অমরত্ব লাভের খায়েশ প্রকাশ করেছেন, ভিসিও তা করবেন না, সেটা বিশ্বাস করা মুশকিল।’
সে আশঙ্কা যে অমূলক হয়নি, এখন তা সবার কাছেই পরিষ্কার। জাতীয় নির্বাচনের মতোই ভোটের আগের রাতে ছাত্রলীগ প্যানেলের পক্ষে ব্যালটে সিলমারা, ভোটদানে বাধা দেওয়া, প্রার্থীর ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব কটি প্যানেল। এসব অনিয়মের জন্য নির্বাচনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানও বিব্রত হওয়ার কথা উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এই নির্বাচনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন সাবেক ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকও। আর সাবেক ডাকসু ভিপি সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ডাকসু নির্বাচনে এমন জালিয়াতি পাকিস্তান আমলের স্বৈরশাসকও করার সাহস পায়নি।
এমনকি অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক কামরুল হাসান, অধ্যাপক ফাহমিদুল হকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এত বছর পরে অনুষ্ঠিত এই ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক সবার এবং এই ব্যর্থতা শিক্ষক সম্প্রদায়ের নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’
প্রায় ২৯ বছর পরে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন অনেককে খানিকটা হলেও নস্টালজিক করে তুলেছে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যেমন ফিরে গেছেন পাকিস্তান আমলের স্বৈরশাসকের অধীনে হওয়া ডাকসু নির্বাচনে, তেমনি কেউ কেউ ফিরে গেছেন ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে। অনেকেই তুলে ধরেন রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা ‘জাসদের উত্থান-পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’র (প্রথমা প্রকাশন, অক্টোবর, ২০১৪, পৃ. ১০৫-১০৬) এই উদ্ধৃতিটি, ‘… ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সেটা ছিল একটা কলঙ্কজনক দিন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠন জিতে যাবে, এটা মেনে নেওয়ার মতো উদারতা আওয়ামী লীগ সরকারের ছিল না। জাসদ থেকে অভিযোগ করা হয়, সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরীর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে সরকারে যোগ দেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।’

বর্তমান ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে সরকার সিইসির আসনে বসাবেন, মন্ত্রী বানাবেন নাকি ব্যবহৃত টিস্যুর মতো ছুড়ে ফেলবেন, সেটি সরকারের ব্যাপার। কিন্তু তার প্রতি শিক্ষার্থীসহ দেশের মানুষের যে ঘৃণা তৈরি হলো, সেটিও নিশ্চয়ই প্রকাশ পাবে যুগে যুগে। আজ যেমন আবার সামনে এসেছে ৭৩-এর ভিসি অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরীর কথা।
৭৩ সালে সে নির্বাচনে হেরে গিয়ে ছাত্রলীগের বাক্স ছিনতাইয়ের পর আর ঘোষিত হয়নি ফলাফল। থমকে যায় ডাকসু নির্বাচন। পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আবার ফিরিয়ে দেন ছাত্রদের হাতে তাদের গর্বের ডাকসু নির্বাচনের অধিকার। সে সময় ৭৯, ৮০ ও ৮২ সালে পরপর তিনটি নির্বাচন হয়, যার কোনোটিতেই ছাত্রদল ডাকসুতে ভিপি বা জিএস পদ পায়নি। তাই বলে কেউ ভোটের বাক্স ছিনতাই বা ফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেননি।
নির্বাচন শুরুর আগে ব্যালট বাক্স দেখানোই বাধ্যতামূলক নিয়ম। এতে সব পক্ষ সন্দেহমুক্ত হয়। কিন্তু কিছু হলের প্রভোস্ট ব্যালট বাক্স দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। তাতেই সন্দেহ দানা বাঁধে ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি প্রার্থীদের মনে। ব্যালট বাক্স দেখানোর দাবিকে কেন্দ্র করে ভোটগ্রহণ বিঘিœত হয় রোকেয়া হল ও সুফিয়া কামাল হলে। রোকেয়া হল, সুফিয়া কামাল হলে এই সন্দেহের মূলে রয়েছে কুয়েত-মৈত্রী হল। এ হলে আগের রাতেই ব্যালটে ভোট দিয়ে রাখা হয়েছিল ছাত্রলীগের হল প্যানেলের প্রার্থীদের পক্ষে।
এ সরকার ও তাদের সহযোগীরা যে রাতের ভোটের ওস্তাদ, সেটা তো এরই মধ্যে জেনে গেছে সবাই। সে সন্দেহ থেকেই ডাকসু নির্বাচনে হলগুলোতে আগের রাতে ব্যালট পেপার ও বাক্স না পাঠানোর দাবি করেছিল ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সব সংগঠন ও প্রার্থী। কিন্তু তাদের সে দাবি কানে তোলেনি দলকানা প্রশাসন। ফলে রাতের ভোটের সংস্কৃতিতে জড়িয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত!
শিক্ষককে এখনো সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। মা-বাবার পরই শ্রদ্ধার আসনে রাখেন শিক্ষকদের। সেই শিক্ষকরা যখন একটা দলের পক্ষে রাতের ভোটের অংশীদার হয়ে যান, দিনের ভোটের জালিয়াতির সহযোগী হয়ে যান, তখন তাদের অবস্থানটা আর
কোথায় থাকে? কতটা নিচে নামলেন তারা? শুধু কি নিজেরাই নামলেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের মুখেই কি তারা এঁটে দিলেন না কালির প্রলেপ?
এবার ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৪৩ হাজার ২৫৬ জন। তার মধ্যে ভোট পড়েছে ২৫ হাজারের কিছু বেশি। ডাকসুর ২৫ পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ। শুধু ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। এতে ভিপি পদে নুরুল হক নুর পেয়েছেন ১১ হাজার ৬২ ভোট। ছাত্রলীগের রেজওয়ানুল হক শোভন পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট। জিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী পেয়েছেন ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট। রাশেদ খান পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৩ ভোট। এজিএস পদে ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসেন পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট। ফারুক হোসেন পেয়েছেন ৫ হাজার ৮৯৬ ভোট। ছাত্রলীগ থেকে ‘বিজয়ী’ বাকিরাও প্রায় সবাই ভোট পেয়েছেন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজারের মধ্যে। আর ১৮ হলের ৩৬ ভিপি-জিএসের মধ্যে ১০টিতে হেরেছে ছাত্রলীগ, যার প্রায় সবগুলোই ছাত্রীহল।
লক্ষণীয় যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুর ১১ হাজারের বেশি ভোট পেলেও একই সংগঠনের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদের ঘরে পড়েছে মাত্র ছয় হাজার! আর ফারুক পেয়েছেন ছয় হাজারের কম! নুরুল হক নুরকে যে ভিপি ‘বানানো’ হচ্ছে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা থেকেই। রাত যত গভীর হয়, সে গুঞ্জনও ততই গাঢ় হয়।
অনেকেই বলাবলি করছেন, জালিয়াতির মাধ্যমে, প্রভাব খাটিয়ে সব পদ নিলেও ভিপি পদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়েছে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা নস্যাৎ করতেই এ ছাড় দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের পরে যাতে আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে, নিজেদের মধ্যে যাতে বিভেদ তৈরি হয়, সে কৌশল মাথায় রেখে বাকি সব নিয়ে নিলেও ভিপি পদ ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জোর গুঞ্জন আছে।
অন্যদিক ছাত্রলীগের দৃষ্টিতেও কি এই নির্বাচন সঠিক হয়েছে? হয়নি। তারা এই ফলাফলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। এই ফলাফলকে ভুয়া বলে সেøাগান দিয়েছে। এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। ছাত্রলীগের দৃষ্টিতে নুরকে ভিপি বানানো হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে। আর ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব ছাত্র সংগঠনের দাবি, ছাত্রলীগ প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে ফলাফল ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের পক্ষে। তাহলে উপসংহারটা কী দাঁড়াল? উভয় পক্ষের দাবি মতেই প্রশাসন একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন চলাকালে যে নুরকে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে ছাত্রলীগের মেয়েরা, ডাকসু ভিপি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণার পর যে নুরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ছাত্রলীগ, সেই নুরকেই আবার খুঁজে এনে মধুর ক্যান্টিনে নিয়ে বুক মিলিয়েছেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ।
নুরুল হক নুরকে ছাত্রলীগ সভাপতির এই যে বুকে টেনে নেওয়া, তা কতটা আন্তরিকতা আর কতটা কৌশল তার, তা নুরই প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘ক্ষমতাসীনরা যখন সুবিধাজনক মনে করে, যখন আমাদের লাগে, তখন বুকে টেনে নেয়। আবার যখন মনে করে আমরা শত্রু, তখন মার দেয়। তার উদাহরণ আমরা গতকালও দেখেছি। বেগম রোকেয়া হলে ছাত্রলীগ নেত্রীরা আমাদের মেরেছে। গত ৩০ জুনও তারা আমাকে মেরেছিল। আজকেও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি টিএসসিতে এসেছি, কিন্তু আমাকে তারা ধাওয়া দিয়েছে। তাদের মুখে মধু, অন্তরে বিষ। তাদের বিশ্বাস করাটা খুব টাফ।’ সুতরাং নুরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যখন ছাত্রলীগের ‘তাকে লাগে’ তখন তিনি ছাত্রলীগের কাজে ব্যবহৃত হবেন নাকি যে সাধারণ ছাত্ররা তাকে আজকের নুরুল হক নুর বানিয়েছেন, তাদের চাওয়াকে মূল্য দেবেন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1090 বার