জাগদল থেকে বিএনপি,জিয়া থেকে খালেদা জিয়া

Pub: বৃহস্পতিবার, জুন ৬, ২০১৯ ৯:২৩ অপরাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জুন ৬, ২০১৯ ৯:২৩ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জাগদল থেকে বিএনপি, জিয়া থেকে খালেদা জিয়া

১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর ছায়াসুনিবিড় নিভৃত জনপদ বাগবাড়ীর এক বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই রাজনৈতিক কিংবদন্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে তার নামে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সেক্টর জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দিয়ে রণাঙ্গনে দুঃসাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

জিয়াউর রহমান শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে যোগ দেন সে সময়ের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বাঙালি জাতির সংকট মুহূর্তে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার কণ্ঠে ভেসে আসে স্বাধীনতার ঘোষণা। একাত্তরের রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমান ছিলেন অসম সাহসী।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ‘সিপাহী জনতার বিপ্লবের’ মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর দুঃসহ স্বৈরাচারী দুঃশাসনে চরম হতাশায় দেশ যখন নিপতিত, জাতির এগিয়ে যাওয়া যখন বাধাগ্রস্ত ঠিক তখনই জিয়াউর রহমান জনগণের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় গিয়ে মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। নিশ্চিত করেন মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা’।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানে শহীদ হন জিয়াউর রহমান। সেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে কিছু সংখ্যক উচ্চবিলাসী বিপথগামী সেনা সদস্যদের ব্যর্থ সেনা বিদ্রোহের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে হত্যাকরা হয়।

সেই আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা, কৃষকদের ভাগ্যেন্নয়নে সারাদেশে খাল খননের জন্য গ্রামবাংলায় জিয়ার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বয়স্ক কৃষকদের মুখে সেই জিয়ার প্রশংসা আজো শুনতে পাওয়া যায়।

আজ জিয়া নেই, তার স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি আছে, তার গড়ে যাওয়া দল আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি আজ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল, যাদের সারাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর গড়ে ৫০ থেকে ৬০ ভাগেরও বেশি কর্মী-সমর্থক রয়েছে। এই হিসেবে দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮-৯ কোটি মানুষ কম-বেশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অথবা দলটিকে সমর্থন ও সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। এটা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য কম ব্যাপার নয়।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বাংলাদেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দল প্রতিষ্ঠা করেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্দেশ্য ১৯ দফা কর্মসূচি শুরু করেন। দেশের প্রয়োজনে জিয়া যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি রাষ্ট্রপতির পদের জন্য নির্বাচন করবেন তখন তার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। জাগদলকে বিএনপির সাথে একীভূত করা হয়।

রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সব ধরনের লোক এসেছিলেন। বিএনপির সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে যে নতুন ছিলেন তাই নয়, ছিল নবীন প্রবীনের সমন্নয়।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। সেই থেকে যাত্রা এই দলটির।

নিচে দলের প্রথম আহ্বায়ক কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেয়া হলো :

আহ্বায়ক : জিয়াউর রহমান।
সদস্য : ১. বিচারপতি আবদুস সাত্তার
২. মশিউর রহমান যাদু মিয়া
৩. মোহাম্মদ উল্লাহ
৪. শাহ আজিজুর রহমান
৫. ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হালিম চৌধুরী
৬. রসরাজ মন্ডল
৭. আবদুল মোনেম খান
৮. জামাল উদ্দিন আহমেদ
৯. ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
১০. মির্জা গোলাম হাফিজ
১১. ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক
১২. সাইফুর রহমান
১৩. ওবায়দুর রহমান
১৪. মওদুদ আহমেদ
১৫. শামসুল হুদা চৌধুরী
১৬. এ জেড এম এনায়েতউল্লাহ খান
১৭. এসএ বারী এটি
১৮. ড. আমিনা রহমান
১৯. আবদুর রহমান
২০. ডা. এম এ মতিন
২১. আবদুল আলিম
২২. ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত
২৩. আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
২৪. নুর মোহাম্মদ খান
২৫. আবদুল করিম
২৬. শামসুল বারী
২৭. মুজিবুর রহমান
২৮. ডা. ফরিদুল হুদা
২৯. শেখ আলী আশরাফ
৩০. আবদুর রহমান বিশ্বাস
৩১. ব্যারিস্টার আবদুল হক
৩২. ইমরান আলী সরকার
৩৩. দেওয়ান সিরাজুল হক
৩৪. এমদাদুর রহমান
৩৫. এডভোকেট আফসার উদ্দিন
৩৬. কবীর চৌধুরী
৩৭. ড. এম আর খান
৩৮. ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী
৩৯. তুষার কান্তি বারবি
৪০. সুনীল গুপ্ত
৪১. রেজাউল বারী ডিনা
৪২. আনিসুর রহমান
৪৩. আবুল কাশেম
৪৪. মনসুর আলী সরকার
৪৫. আবদুল হামিদ চৌধুরী
৪৬. মনসুর আলী
৪৭. শামসুল হক
৪৮. খন্দকার আবদুল হামিদ
৪৯. জুলমত আলী খান
৫০. এডভোকেট নাজমুল হুদা
৫১. মাহবুব আহমেদ
৫২. আবু সাঈদ খান
৫৩. মোহাম্মদ ইসমাইল
৫৪. সিরাজুল হক মন্টু
৫৫. শাহ বদরুল হক
৫৬. আবদুর রউফ
৫৭. মোরাদুজ্জামান
৫৮. জহিরুদ্দিন খান
৫৯. সুলতান আহমেদ চৌধুরী
৬০. শামসুল হুদা
৬১. সালেহ আহমেদ চৌধুরী
৬২. আফসার আহমেদ সিদ্দিকী
৬৩. তরিকুল ইসলাম
৬৪. আনোয়ারুল হক চৌধুরী
৬৫. মাইনুদ্দিন আহমেদ
৬৬. এমএ সাত্তার
৬৭. হাজী জালাল
৬৮. আহমদ আলী মন্ডল
৬৯. শাহেদ আলী
৭০. আবদুল ওয়াদুদ
৭১. শাহ আবদুল হালিম
৭২. ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরুদ্দিন সরকার
৭৩. আতাউদ্দিন খান
৭৪. আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী
৭৫. আহমদ আলী। [২]


এরপর দলটি মোট চারবার ক্ষমতায় আসে। আজ দলের ব্যাপ্তি অনেক দূর। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে ৮০-৯০ বছরের বৃদ্ধও নিজেকে এই দলের কর্মী কিংবা সমর্থক বলে দাবি করতে দেখা যায়। এটা কম কথা নয়। তবে এই দলের বিশালতা সত্ত্বেও ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দলটি বর্তমান সময়ের মতো এতোটা সঙ্কটে এর আগে কখনো পড়েছিল বলে আমার জানা নেই। অন্যদিকে সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে বর্তমান সময়ের মতো তাদের এত সমর্থনও কোনোকালে ছিল বলে মনে হয় না। এমন কি জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশাতেও নয়।

ফলে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যদি আজ জীবিত থাকতেন তবে নিশ্চয়ই তিনি তার দলটির বিশাল ব্যাপ্তি ও অগণিত কর্মী-সমর্থক দেখে সত্যিই অনেক খুশি হতেন, আনন্দিত হতেন। রাজনীতিকে উপভোগ করতেন অন্যভাবে। অন্যদিকে বর্তমান সঙ্কটের জন্য ব্যথিত না হয়ে এর পেছনের কারণ জানার চেষ্টা করতেন। এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পথ খুঁজতেন। দেশপ্রেমিক বিচক্ষণ জিয়া হয়তো বা একটা সুন্দর মসৃণ পথ পেয়েও যেতেন দেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনতে।

কেননা, জিয়া সেই ব্যক্তি, যখন ১৯৭১ সালে জাতীয় ইতিহাসের চরম দুর্যোগময় কাল। যখন সবাই ২৫ মার্চ মধ্যরাত ইতিহাসের পৈশাচিক গণহত্যার ভয়াবহতায় হয়ে পড়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আক্রান্ত অসহায় দেশবাসী হতবিহবল এবং অনেকে আত্মসমর্পণ কিংবা দালালির মাধ্যমে বেছে নিয়েছিলেন আত্মরক্ষার পথ। সেই সময় কালুরঘাটের বেতার কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার সেই কন্ঠস্বর ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’।

দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বির্তক যাই করা হোক না কেন, সবকিছু উপেক্ষা করে সেদিন যে জীবন বাজি রেখে জাতির পক্ষে জিয়াউর রহমান মহান স্বাধীনতার যুগান্তকারী দুঃসাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন এটা অস্বীকার করার মতো কারো সুযোগ নেই। কেবল ঘোষণার মধ্যেই নিজের কর্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্বাধীনতাকামী সৈনিক জনতাকে সংগঠিত করে বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের লড়াইকে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে উন্নীত করেছিলেন।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অবশেষে ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসলে সবাই তাকে বরণ করে নেন। যতদূর জানি, জিয়ার অকৃত্রিম দেশপ্রেম আর মহান মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসিকতার জন্যই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করেছিলেন। এ থেকেই বুঝা যায়, বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে সম্পর্ক কতটা সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল।

কিন্তু আজ দেশের রাজনৈতিক দৈন্যতায় পরস্পরবিরোধী দু’পক্ষের লোকজনের কাছ থেকে যখন বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে নানা কথা, নানা নতুন তথ্য শুনি তখন মনোকষ্ট পাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।

অবশ্য পরে সশস্ত্র বাহিনীর বিপথগামী একটি অংশের ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ এর মধ্য-আগস্টে রক্তক্ষয়ী এক সশস্ত্র সেনা অভ্যুত্থানে ঘটে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার পটবদল। খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশজুড়ে সামরিক শাসন বলবৎ ও শাসনতন্ত্র স্থগিত করে রেখে তার নিজস্ব মর্জি মাফিক শাসন চালাতে থাকেন। সবমিলেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছিল জাতি।

যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, রাজনীতিহীন ওই সময়ে জাতীর ঐক্য ও আশা-আকঙ্ক্ষার প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীতে সৃষ্টি করা হচ্ছিল নানা দল-উপদল, ভেঙে পড়ছিল শৃংখলা ও সংহতি। এরই মধ্যে কতিপয় উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার ৩ নভেম্বর ঘটিয়ে দেয় আরেকটি স্বল্পমেয়াদী ক্যু। তদানীন্তন সেনাপ্রধান জিয়া তাদের হাতে বন্দী হন। তবে সেটা বেশিদূর এগুতে পারেনি।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই সারাদেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়, ওইদিন ভোরে সেনা সদস্যরা ভোরে রাস্তায় নামলে তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানাতে সারাদেশের সাধারণ মানুষও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। যেটাকে আমরা জাতীয় বিপ্লব বা সংহতি দিবস বলে থাকি। বির্তক থাকলেও ওই সময়ে জিয়ার ক্ষমতায় আসার বিষয়টি ছিল অনেকটাই দেশবাসীর বহুল কাঙ্ক্ষিত বিষয়। মুরুব্বিদের ভাষ্যমতে, ওই জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ না করলে হয়তো দেশে বিশৃঙখলা ও রক্তপাত আরো দীর্ঘ হতে পারতো। শুধু তাই নয়, জিয়া সেই ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশে যে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে দেশকে রক্ষাই করেননি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও উত্তরণ করেছিলেন।

জিয়া দেশ শাসন করেন ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশের জন্য অনেক কিছুই করেন, তবে সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী বিষয় ছিল- বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরা। কেননা দেশ স্বাধীনের স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই জনগণের রাজনৈতিক অধিকার শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েছিল। এরপর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।

জিয়ার মৃত্যুর পর নদীর ঘাটের জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ৩৬ বছর বয়সে বিধবা বেগম খালেদা জিয়া অবুঝ দুই ছেলেকে নিয়ে পথচলা শুরু করেন। এরপর নিয়তিই ডাকেই রাজনীতিতে আসা। দলে স্বামীর শূন্যতা পূরণে সেই দশকের গোড়ার দিকে রাজনীতির মাঠে আসেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বেই ’৯০-এর পটপরিবর্তন ঘটে। তার আপসহীন অসাধারণ নেতৃ্ত্বের আকৃষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। এরপর আরো দুইবার ক্ষমতায় বসেন বেগম জিয়া।

সেই সময়টাই বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তিনবার ক্ষমতায় আরোহণের সময়টি যদি বেগম জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনটি তার জীবনের সবচেয়ে ‘অন্ধকার সময়’।

কেননা, সেই আপসহীন নেত্রী বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে চিন্তার মাধ্যমে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেখাতে পারেননি বলেই মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বোদ্ধারা। এমনকি ১৯৯১ থেকে ৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার চালানোর সময় নিজের অভিজ্ঞতাকে পর্যালোচনা করে নতুনভাবে এগুতে পারেননি। যার ফলে আজ দেশের এই দৈন্যতা বলে অনেকে মনে করেন।

কেননা, তিনবার ক্ষমতা থাকাকালীন অনেক অপার সুযোগ ছিল- দেশ, দল ও জনগণের স্বার্থে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দলকে জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়ার, দেশকে নতুনভাবে সাজাবার, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর শক্তি ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। যাতে অগণতান্ত্রিক শক্তি পুনরায় ক্ষমতায় না আসতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগটা সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

১৯৮১ থেকে ২০১৮ এই ৩৭ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাদের। এরশাদের শাসনামলে ’৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় বেগম জিয়াকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অতঃপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। দুই ছেলেকেও পাঠানো হয় কারাগারে। ছেলেদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

এরপর শেখ হাসিনার আমল শুরু হয়, বেগম জিয়ার নেতৃত্বে চলছে ৯ বছর ধরে হাসিনাবিরোধী আন্দোলন। আন্দালনের মধ্যেই ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে থাকাবস্থায় মারা যান। আর বড় ছেলে তারেক রহমান সেই ২০০৮ সাল থেকেই সপরিবারে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০০৯ সালের মে মাসে ৪০ বছরের স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়ি ছাড়া হয়ে উঠেছেন ভাড়া বাসায়।

এখানেই শেষ নয়, বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে অর্ধশতাধিক মামলা ঝুঁলছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও বেশ কিছুসংখ্যক মামলা চলছে। দুটি মামলা একেবারেই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। স্বল্পদিনের মধ্যেই মামলা দুটির রায় হতে পারে। এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে উদ্বেগ-উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবমিলেই জিয়ার পরিবারের এখন চরম দুর্দিন। বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে সামনের দিনগুলো আরো বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এই পরিবারটি।

তবে দুর্দিনেও ভেঙে পড়েননি বেগম জিয়া। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আবারো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তার অর্জন একেবারেই কম নয়। এরই মধ্যে তিনি দেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তনের আবহাওয়া তৈরি করতে সক্ষমত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালে রাজনীতিতে তার ইতিবাচক ভূমিকা এবং ভিশন ২০৩০ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

সেই সঙ্গে জাতির ভাগ্যাকাশে নতুন স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। নানা বাধার মধ্যেও চারদিকে সম্ভাবনার হাতছানি। ‘রাত যত গভীর হয় ভোরের সূর্যোদয়ের ক্ষণ তত বেশি নিকটতম হয়’ তেমনি বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে বেগম জিয়া জাতির সামনে যে উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছেন তাতে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। জিয়ার আদর্শই হতে পারে পথ হারানো বিএনপির আলোর দিশারি।

দেশ জাতির জন্য বিশেষ অবদানের জন্য মহান আল্লাহ পাক তাকে যেন সর্বোচ্চ পুরস্কার দান করেন। সেই সঙ্গে তার দেখানো পথই হোক বিএনপির রাজনীতির মৌলিক আদর্শিক ভিত্তি।

লিখক: প্রধান সম্পাদক শীর্ষ খবর ডটকম


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ