fbpx
 

কিংবদন্তির মহাভোটচোর বলছি!

Pub: শুক্রবার, জুন ২৮, ২০১৯ ২:২০ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, জুন ২৮, ২০১৯ ২:২০ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গোলাম মাওলা রনি :
একুশ শত একুশ সালের যে দিনটিতে বসে আজকের নিবন্ধ লিখছি, সে দিন আশি বছর বয়সে পদার্পণ করেছি। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা এবং সবচেয়ে দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে চল্লিশটি বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করার পর গতকাল আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেছি। প্রায় পঞ্চাশ হাজার ছাত্রছাত্রী এবং সমসংখ্যক প্রাক্তন শিক্ষার্থী মূলত এই মুহূর্তে রাষ্ট্র চালাচ্ছে। তাদের আবেগঘন উপস্থিতি, অশ্রুসজল আঁখি এবং আকুতিভরা সম্ভাষণবাক্যে সিক্ত হয়ে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ মনে নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়ে আত্মজীবনী লিখতে বসেছি।

আত্মজীবনীতে আমি কী লিখব- কোথা থেকে শুরু করব, কিভাবে শুরু করব, ইত্যাদি চিন্তা করতে গিয়ে এখন আমাকে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। অথচ যৌবনের দিনগুলোতে যখন আমি ছিলাম আমাদের প্রয়াত সম্রাটের প্রধান পরামর্শদাতা, তখন সব কিছুতেই আমার গতি ছিল আরবের মরুঝড়ের মতো। আমার কর্মকাণ্ড, কূটকৌশল এবং সফলতা দেখে লোকজন বলাবলি করত, বোকাদের যুগের মানুষজন যদি আমাকে একনজর দেখতে পেত তাহলে সাথে সাথে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেত। একটি কথা বলে নেয়া ভালো, আমাদের আমলের লোকজন পূর্ববতী শতাব্দীর অর্থাৎ এক শত বছর আগেকার লোকজনকে ‘বোকা’ এবং সেই যুগকে ‘বোকাদের যুগ’ বলে থাকে। কারণ তখনকার লোকেরা একটি নিরর্থক নির্বাচন দেয়ার জন্য যাচ্ছেতাই চিৎকার চেঁচামেচি এবং সময়ে-অসময়ে মারামারি পর্যন্ত করত। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এবং মানসপিতা অথবা মানসীমাতারা যখন দেশে-বিদেশে ভোটচুরি অথবা জালজালিয়াতির ভোটাভুটি শুরু করলেন, তখন বোকা মানুষেরা লড়াই-সংগ্রাম, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ করতে করতে একসময় দেশে-দেশে গণযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল।

বোকা লোকদের গণযুদ্ধ একসময় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয় এবং দুই হাজার একচল্লিশ সালে যে ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো তা প্রায় সাত বছর ধরে চলতে থাকে। আত্মঘাতী সেই যুদ্ধে সারা দুনিয়ার শহর-বন্দর, রাস্তাঘাট, সভ্যতা, কৃষ্টি-কালচার, অর্থব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছু তছনছ হয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশ ভেঙে টুকরা টুকরো এবং বোকাদের তৈরি বিশ্ব সংস্থাগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। যুদ্ধে বোকারা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গছে এবং ভোটচোরেরা জয়ী হয়ে সারা দুনিয়ায় এক নবতর ও বিস্ময়কর রাজ্যব্যবস্থা কায়েম করেছে। যুগান্তকারী সেই রাজ্যব্যবস্থায় আজীবন নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপমানিত এবং নির্যাতিত চোর, ডাকাত, টাউট-বাটপারেরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করে। বর্তমান সমাজে আদিকালের বোকাদের কোনো স্থান নেই। তারা সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে বনজঙ্গলে ঠাঁই নিয়েছে এবং প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মতো ঘাসপাতা, কাঁচামাংস ও ফলমূল খেয়ে বাঘ-সিংহের সাথে লড়াই করে বনমানুষে রূপান্তর হয়েছে।

আমাদের সমাজ অত্যন্ত চমৎকারভাবে চলছে। এখানে থানা নেই, পুলিশ নেই, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী। পুরো সমাজে কোনো সন্ত্রাস নেই। মানুষ যে যার মতো করে প্রতারণা-জালজালিয়াতি, জাদু-টোনা-বান, জিন চালান, মিথ্যাচার, যৌনাচার, নেশা, ভোগ-বিলাস-আনন্দ-ফুর্তি ইত্যদির মাধ্যমে নিজেরা ব্যস্ত থাকছে এবং অন্যকে ব্যস্ত রাখছে। দেশের পুরো অর্থব্যবস্থা মূলত জুয়ানির্ভর হয়ে পড়েছে। বোকাদের আমলের প্রেম-পিরিতি, নীতি-নৈতিকতা, পরিবার প্রথা ইত্যাদি না থাকার কারণে এ যুগে কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা, ঝক্কি-ঝামেলা নেই। মানুষজনের মধ্যে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া নেই। কেউ যদি কারো টাকা-পয়সা চুরি করে তবে ক্ষতিগ্রস্ত লোক রাগ করে না। তারা গোপনে চোরের খোঁজ করে এবং পরে সুযোগ বুঝে চোরের বাড়িতে চুরি করে আসে। কেউ যদি কারো স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে সেই লোক তথ্যপ্রমাণসহকারে প্রতিপক্ষের স্ত্রীর কাছে অভিযোগ করামাত্র মহিলাটি ক্ষতিগ্রস্ত পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়ে পড়ে।

আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় চোরকে লোকজন জামাই আদর করে উঁচুপদে বসায়। যে চোরের চুরিবিদ্যা যত নিখুঁত, সেই চোরের সামাজিক মর্যাদা তত বেশি। সমাজের প্রতিটি শ্রেণী-পেশাতেই চোরবন্দনা এবং চোরের প্রাধান্য আমাদের দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রের বিশাল সরকারি কর্মযজ্ঞ, প্রাইভেট সেক্টরের শত-সহস্র প্রকৃতির ব্যবসা বাণিজ্য, লেনদেন, কাজকর্ম ইত্যাদি সব কিছুতেই চৌর্যবৃত্তির পেশাদারিত্ব থাকা বাস্তবে বাধ্যতামূলক। এই চৌর্যবৃত্তিতে হাজারো শর্ট কোর্স, লং কোর্স, অনার্স, মাস্টার্স এবং এমফিল, পিএইচডি করার জন্য দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবশ্যিকভাবে আলাদা ফ্যাকাল্টি গড়ে তোলা হয়েছে, যার কৃতিত্ব সবাই একবাক্যে আমাকেই দিয়ে থাকে। কারণ ষাটের দশকে মহামান্য সম্রাটের বদান্যতায় যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলাম, সেই প্রতিষ্ঠানের কৃতী ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণেই আজকের দিনে আমাদের দেশ ও জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে।

আমিই প্রথম আমার প্রাণপ্রিয় সম্রাটকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম এবং তিনি একবাক্যে আমার এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বিগত দিনে ভোটচুরি, ভোটের ফলাফল জালিয়াতি এবং প্রতারিত ভোটারদেরকে শান্ত রাখার ক্ষেত্রে যে সফলতা দেখিয়েছি তার দ্বিতীয় নজির পৃথিবীতে নেই। আমার কারণেই ভূগামভো নামক একজন সাধারণ মুরগি চোর সারা দেশের চোর সমিতির সভাপতির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়। তারপর সে সাধারণ ভোটে প্রথমে রাজা নির্বাচিত হয়ে পরপর তিনবার রাজার দায়িত্ব পালন শেষে চতুর্থবারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ‘সম্রাট’ উপাধি লাভ করে। সমসাময়িক দুনিয়ায় হাজার হাজার রাজা বাদশাহ থাকলেও সম্রাট রয়েছেন মাত্র কয়েকজন, যাদের মধ্যে আমার প্রয়াত মালিকের নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়ে থাকে।

আমার মালিক সারাটি জীবন আমার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। প্রাচীন দুনিয়ার চানক্য যেমন একজন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য সৃষ্টি করেছিলেন তদ্রƒপ বর্তমান শতাব্দীতে আমার ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে ভূগামভোর মতো একজন মহান সম্রাটের সৃষ্টি হয়েছে। ২০৭০ সালের কোনো এক বসন্তে রাজপ্রাসাদের বাগানে সম্রাটকে খুব খোশমেজাজে পেয়ে গেলাম। তাকে আমি আইইউভিআরএম অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ভোট রিগিং অ্যান্ড ম্যানিপুলেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য প্ররোচিত করলাম। তিনি আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর খুশিতে নাচতে আরম্ভ করলেন এবং অর্থমন্ত্রীকে ডেকে রাজকোষ উজাড় করে হলেও আমার প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নির্দেশ জারি করে দিলেন।

আইইউভিআরএম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমাকে যে কী পরিমাণ শ্রম দিতে হয়েছে, তা কল্পনা করলে এখনো ভয়ে শরীরের পশমগুলো খাড়া হয়ে যায়। কারণ এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় এখনো দুনিয়ার কোথাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি, বিভাগ-অনুবিভাগ চালু করা, শিক্ষকনিয়োগ, ক্যাম্পাস তৈরি, গবেষণাগার, লাইব্রেরি ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস চালানো এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইন্টার্নি করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার চ্যালেঞ্জের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বোকাদের আমলের বড়সড় ভোটচোরদের হাড্ডি সংগ্রহের কঠিন কাজ। আমাদের দেশের কয়েকজন বিজ্ঞানী জানিয়েছিলেন যে, বোকাদের যুগে যারা প্রথম ভোট চুরি আরম্ভ করেছিল তারাই হলো বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের মাস্টারমাইন্ড। সুতরাং তাদের ডিএনএ টেস্ট করে সেই আমলের ভোটচুরির কার্যকারণ আর উদ্দেশ্য বের করতে হবে এবং সেগুলো দিয়ে গবেষণাপত্র বানাতে হবে। এর ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে।

আমার জন্য বোকাদের যুগের ভোটচোরদের হাড্ডি সংগ্রহ করা প্রথম দিকে কোনো ব্যাপারই মনে হলো না। কিন্তু বাস্তবে হাড্ডি সংগ্রহ করতে গিয়ে এমন মহা মুসিবতে পড়লাম, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি হাড্ডির খোঁজে প্রথমেই ভোটচোরদের গণকবরগুলোতে গেলাম। কিন্তু সেখানে কোনো হাড্ডিতো দূরের কথা- হাড়ের গুঁড়োও পেলাম না। কারণ বোকাদের জমানার শেষ সময়ে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণে বিক্ষুব্ধ বোকারা দলে দলে ভোটচোরদের ধরে এনে জীবন্ত কবর দিত। ফলে সারা দেশের আনাচে-কানাচে ভোটচোরদের অসংখ্য গণকবর গড়ে উঠেছিল। হাড্ডি তালাশ করতে গিয়ে জানতে পারলাম যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ে বোকারা যখন নিশ্চিত হলো, তাদের পরাজয় অনিবার্য তখন তারা গণকবরগুলোকে তছনছ করে হাড্ডিগুড্ডি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে বনবাসে চলে গেল।

এ অবস্থায় আমাকে অনেকে পরামর্শ দিলেন, সেই জমানার বিখ্যাত আধ্যাত্মিক বা তান্ত্রিক বলে পরিচিত এক মহিলা যাকে সবাই সম্মান করে ‘ডাইনী বুড়ি’ বলে ডাকত, তার কাছে যাওয়ার জন্য। সম্মানিতা ডাইনীর দরবারে বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহকারে হাজির হলাম। উনি আমার আগমনের উদ্দেশ্য তার জাদুর ক্ষমতাবলে জানতে পারলেন। তিনি আমাকে জানালেন, প্লানচেটের মাধ্যমে নরক থেকে একজন ভোটচোরকে তুলে আনতে হবে। নরকে ভোটচোরদের দিবানিশি অগ্নিকুণ্ডে ফেলে পোড়ানো হয়। তাদের শরীরের মাংস আগুনের উত্তাপে গলে গলে পড়ে এবং পরক্ষণে আবার গজিয়ে যায়। দুনিয়ার চেয়ে নরকের আগুনের উত্তাপ কয়েক কোটি গুণ বেশি এবং বিশেষ পারমাণবিক চুল্লিতে ফেলে তাদের পোড়ানো হয় বিধায় সেই দেহ দুনিয়াতে এনে সেখান থেকে একটি হাড্ডি আলাদা করার ক্ষেত্রে রেডিয়েশন ছড়িয়ে পড়বে। এই কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্য মঙ্গলগ্রহ থেকে এলিয়েনদের আনতে হবে।

ডাইনী আমাকে আরো জানালেন যে, বোকাদের আমলের সেই কুখ্যাত ভোটচোরের মৃতদেহ দেখার জন্য বিশেষ ধরনের পোশাক ও সানগ্লাস পরতে হবে, যা ইউরেনাস গ্রহ থেকে আমদানি করতে হবে। তারপর সেই পোশাক পরে এবং চশমা চোখে দিয়ে হাড্ডি স্পর্শ করামাত্র আমি নাকি চল্লিশ দিনের মতো মৃত অবস্থায় পড়ে থাকব। এরপর আমার দেহে প্রাণ আসামাত্র আমাকে এবং ভোটচোরের হাড্ডিকে এক মাসের জন্য মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেয়া হবে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য। সুতরাং এই বিরাট কর্মযজ্ঞের জন্য ডাইনী মা দশ হাজার কোটি টাকা দাবি করে বসলেন। আমি শুনে ভীষণ ভড়কে গেলাম কিন্তু হতোদ্যম হলাম না। পুরো ঘটনা সম্রাটকে জানালাম। তিনি আমাকে অভয় দিলেন এবং ডাইনীর দাবিমতো টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। পরের কাহিনীগুলো এতটাই শ্বাসরুদ্ধকর ছিল যে, সব কথা এখানে প্রকাশ করতে পারছি না।

বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর প্রথম দিকে আমরা ভোটচুরি, ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং, ভোট ম্যানিপুলেশনসহ দশটি ফ্যাকাল্টি চালু করলাম। পরে আনুষঙ্গিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে একটি ফ্যাকাল্টি এবং ভোটচোরদের বেড়ে ওঠা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি মেডিক্যাল বিভাগ চালু করা হলো। ভোটকেন্দ্রিক বিরাট ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য যে দক্ষ জনশক্তি লাগে, সে কথা বিবেচনা করে বিজনেস ফ্যাকাল্টি চালু করলাম। টেস্টটিউব প্রযুক্তি, ক্লোন প্রযুক্তি এবং ফার্মিং প্রযুক্তির আদলে আমরা ভোটচোরদের নিরাপদ প্রজনন, বংশবৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং বিরূপ পরিবেশে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে পৃথক একটি বিভাগ চালু করলাম, যেখানে কেবল তাদের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে গবেষণা করা হতো।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুই বছরের মাথায় এর সুনাম সুখ্যাতি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। পৃথিবীর সব নাম করা চোর তাদের সন্তানদের ভর্তি করানোর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমাদের নির্ধারিত আসনের চেয়ে অন্তত এক হাজার গুণ ছাত্রছাত্রী প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে। যারা আমাদের প্রতিষ্ঠানে চান্স পায়, তারা মনে করে যেন আসমানের চাঁদ হাতে পেয়েছে। অন্য দিকে, যারা চান্স পায় না তাদের আহাজারি, কান্নাকাটি ও অশ্রুজলে প্রতি বছর আমাদের ক্যাম্পাসে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এবং পিএইচডিধারীরাই এই মুহূর্তে বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে দেবালয় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে।

আজকের দুনিয়ার শতকরা পঁচানব্বইটি দেশে ভোটচোরেরাই দেশ চালাচ্ছে। কাজেই কোনো দেশের চোরেরা যদি অন্য চোরদের ওপর বাটপারি করতে চায়, তাদের অবশ্যই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা পণ্ডিতদের পরামর্শ, সাহায্য-সহযোগিতার দরকার পড়ে। কখনো কখনো কোনো কোনো দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের সাহায্য কামনা করে থাকে তাদের সামগ্রিক প্রশাসনযন্ত্র সাজিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা অতি উচ্চ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাদের কাজগুলো করে দিই। এভাবে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকি। গত বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বাজেটের প্রায় একুশ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে। বর্তমান শতাব্দীতে এসে বিগত শতাব্দীর সব কিছু ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়া হয়েছে। আমরা শুধু আদিম সভ্যতা, মধ্যযুগের যুদ্ধনীতি এবং মহাসমুদ্রে ডাকাতির ইতিহাস জাতিকে জানানোর জন্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করি। আমাদের এসব কর্মের জন্য আমরা দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার চোবেল পেয়েছি। এখানে বলা দরকার, বোকাদের আমলে যা ছিল নোবেল, তা চোরেরা দখল করে নাম পাল্টিয়ে চোবেল করেছে। একইভাবে বোকাদের আমলের পুলিৎজার হয়েছে চুলিৎজার এবং ম্যাগসাই হয়েছে চোগসাই। আগে ভালো সিনেমার জন্য যে অস্কার দেয়া হতো, তার নামও চোরেরা চস্কার বানিয়ে ফেলেছে।

জীবনের পরিণত বয়সে পৌঁছে ভাবি- পৃথিবীটা কতই পরিবর্তনশীল এবং বিচিত্র রঙ-বেরঙ, চালচিত্র এবং রংতামাশায় ভরপুর। অতীতকালে যা ছিল ঘৃণা ও অভিশাপের উপলক্ষ, তাই আজ মান-মর্যাদা এবং আশীর্বাদের বিষয়। অতীতকালে যারা নীতিকথা শোনাতেন, কল্যাণময় রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন এবং মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আশ্রয়স্থল ছিলেন, তারা এখন বর্তমানের কুশীলবদের দ্বারা অভিসম্পাতপ্রাপ্ত এবং অতীতের সেই বোকা লোকদের বংশধর যারা বোকাসোকা আদর্শ ধারণ করার চেষ্টা করেছে, তারা গহিন অরণ্যে গিয়ে কোনো গাছের চূড়ায় অথবা গুহার মধ্যে বাসা বানিয়ে বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাজেই ইতিহাসের এই ধারা যদি চলমান থাকে, বর্তমান শতাব্দীর চোর সাম্রাজ্যও হয়তো বনমানুষদের দ্বারা একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে।

পাদটীকা : ফ্যান্টাসিমূলক এই নিবন্ধটি সুবিখ্যাত ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েলের অমর উপন্যাস ‘১৯৮৪’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লিখিত।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ