fbpx
 

এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব ছিলেন এম সাইফুর রহমান

Pub: বুধবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৯ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষনজন্মা বিরল প্রতিভার নাম এম. সাইফুর রহমান। আজকের আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের মহান স্থপতি মরহুম জননেতা সাইফুর রহমান। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রহমান, এম সাইফুর (১৯৩২-২০০৯) । সাইফুর রহমান ১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল বাছিত এবং মা তালেবুননেসা। তিনি ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি লন্ডনে পড়াশুনা করেন (১৯৫৩-১৯৫৮) এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। সাইফুর রহমান ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদ যিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সর্বোচ্চ ১২ বার বার্ষিক অর্থ বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন নেতা ছিলেন যিনি সর্বোচ্চ সময়কালীন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। তিনি ১৯৮০-৮১, ১৯৯১-১৯৯৫ এবং ২০০২-২০০৬ সালে দীর্ঘ মন্ত্রীজীবনে ডিসেম্বর, ১৯৭৬ থেকে অক্টোবর, ২০০৬ পর্যন্ত তিনটি সরকারের আমলে ১২টি জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। মন্ত্রিত্বের প্রথম তিন বছরে তিনি ব্যবসায় এবং বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন, এবং পরবর্তী ১২ বছর তিনি অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯৪ সালে, তিনি স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্নর নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে, রহমানকে একুশে পদক, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। সাইফুর রহমান ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তৎক্ষণাৎ মারা যান।

পেশা জীবন
সাইফুর রহমান ১৯৬২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতমানের ‘রহমান রহমান হক’ নামীয় একটি নিরীক্ষা ফার্ম। এছাড়া তিনি কেমিক্যাল, তেল-গ্যাস উত্তোলন, ট্রান্সপোর্ট, ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর প্রিন্সিপাল এবং বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
তিনি সবচেয়ে বেশি সময়কাল ধরে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং মোট ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করেন।

রাজনৈতিক জীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাইফুর রহমান ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং এক মাস কারাবরণ করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ছিলেন।

সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। এ দলটিই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) রূপান্তরিত হয়। তিনি ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মৌলভীবাজার সদর এলাকা থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশে মুক্ত বাজার সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রবর্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৯৭০- এর দশকের শেষের দিক থেকে এ প্রক্রিয়া চালু হয়। তিনি ১৯৯৬ সালে এবং পুনরায় ২০০১ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করের পরিসর বৃদ্ধি করে মূসক (মূল্য সংযোজন কর) প্রথা প্রবর্তন করেন। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিকে তিনি ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। এছাড়াও ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভাসমান মুদ্রাবিনিময় হার নীতিমালা প্রণয়ন, বাণিজ্য উদারিকরণ, বেসরকারীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর সূচনা করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ সাল মেয়াদে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (ইইসি), এশিয়া ও প্যাসেফিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ), কমনওয়েলথ এবং জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বাংলাদেশের অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৯৫ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া ঐ বছর বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনেও তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এ বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। ১৯৯৪ সালে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

ব্যক্তিগত জীবন
সাইফুর রহমান , দুরী সামাদ রহমানকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের তিন পুত্র এবং এক কন্যা রয়েছে। ২০০৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দুরী রহমান মারা যান। তার পুত্র এম নাসির রহমান বাবাকে অনুসরণ করে রাজনীতিতে এসেছেন; ২০০৩ সালের নির্বাচনে তিনি বাবার ছেড়ে দেয়া মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদীয় এলাকায় নির্বাচিত হন।

শিক্ষাজীবন
সাইফুর রহমান রহমান ১৯৪৯ সালে দি এইডেড হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫১ সালে এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।পরের বছর তিনি চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট-এ পড়ার জন্য লন্ডনে চলে যান; তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলস এর চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ইনস্টিটিউট থেকে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। তিনি অর্থবিষয়ক, ফাইন্যান্স এবং উন্নয়নমূলক অর্থনীতির একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেয়ায় ২৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন; কিন্তু তৎকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ‘মুচলেকা দিলে মুক্তি দেওয়া হবে’ শর্তে রাজী হননি বলে কারাভোগ করেন এবং ভাষা আন্দোলনে তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন।অর্ডার নেশন্যাল, সেনেগালের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা।ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৫ সালে সাইফুর রহমানকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

মৃত্যু
৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তৎক্ষণাৎ মারা যান।
বিএনপির প্রতিষ্টাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) এর সহযোদ্ধা আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার
এম সাইফুর রহমানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রহিল বিশেষ শ্রদ্ধা ।

লেখক :প্রধান সম্পাদক শির খবর ডটকম ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ