fbpx
 

গণতন্রের “মা” খালেদা জিয়াকে নির্যাতনই সবকিছুর শেষ নয়

Pub: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ ১০:১০ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ ১০:১০ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কবি নজরুলের ভাষায়- যুগের ধর্ম এই, পীড়ন করিলে সে-পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই! শোনো মর্ত্যরে জীব, অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
এক দুঃখিনী নাম খালেদা জিয়া। অত্যচার-নির্যাতন সহ্য করাই যেনো তার নিয়তি। এরশাদ জান্তার ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। নির্যাতন চালিয়েছে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের সরকার। মঈন-ফখরুদ্দিনের জরুরি সরকারের আমলে মূল টার্গেটই ছিলেন খালেদা জিয়া। তাকে ছয় মাস গৃহবন্দী ও এক বছর নির্জন কারাগারে বন্দী থাকতে হয়। কারাগারে তিনি রোগ যন্ত্রনায় ছটফট করেছেন। দুই ছেলের নির্যাতনের খবরে বিচলিত হয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর সময় তার পাশেও থাকতে পারেননি। সেনা সমর্থিত এই সরকার তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোরও অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

আর বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার চাইছে খালেদা জিয়া শেষ হয়ে যাক। তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং শারিরীক ও মানসিক নিপীড়ন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তিনি ও তার দল বিএনপিকে রাজনীতি থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করার ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে।গণতন্ত্রের “মা” দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যে হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তারই আজ্ঞাবহ আদালতের মিথ্যা ফরমায়েশি রায়ে ৭৩ বছরের একজন বৃদ্ধ মহিলা বিনা অপরাধে জেলে কাটছেন।বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান। গুম-খুন, লুটপাট, আত্মসাৎ ও দখলের মহাসমারোহে গণতন্ত্রকে বন্দী করা হয়েছে। বন্দী করা হয়েছে গণতন্ত্রস্বীকৃত বিরোধী দলের অধিকার, কথা বলা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে। সারাদেশ আজ বন্দীশালায় পরিণত হয়েছে। দুঃশাসনের বিষাক্ত বলয়ে বন্দী দেশবাসী।

দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর এক নিভৃত গৃহবধু থেকে জনগনের অনুরোধে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক যাত্রা। এরপর তিনি এ দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপার্সন হন। এ সময়ে তিনি তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলে এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের পতন ঘটান। নিজের দল বিএনপিকে নির্বাচনে বিজয়ী করে দু’বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। দেশে প্রতিষ্ঠা করেন সংসদীয় গনতন্ত্র। দেশের উন্নয়নে অবিষ্মরণীয় ভূমিকা তার। যমুনা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে তার হাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বহুদলীয় গনতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সমাজ বিকাশ বিশেষত শিক্ষা তথা নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার তার সাফল্য অনন্য। একইভাবে গনমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী খালেদা জিয়া ছিলেন অগ্রগন্য। সার্কসহ আন্তর্জাতিক ফোরামেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
কিন্তু সেই তাকেই আজ অত্যাচার-নির্যাতনে নিষ্পেষিত করা হচ্ছে। গনতন্ত্রের মহাননেত্রী খালেদা জিয়া আজ অসহায়। প্রায় ৭৪ বছর বয়সে তাকে যখন দুশ্চিন্তাহীন এক নতুন জীবন কাটানোর কথা, তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে জরাজীর্ন পরিত্যক্ত কারাগারে তিনি নির্যাতনে দিশেহারা। পরিবার-পরিজন থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতটুকু শান্তিও জোটেনি তার কপালে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো অমানবিকভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। বড় ছেলে, ছেলের বউ, নাতনিরাও কাছে নেই। তার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত চালানো হচ্ছে কুৎসা ও অপপ্রচার। এটাই কি তার প্রাপ্য?

জেনারেল এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক আপোসহীন গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন খালেদা জিয়া। সেই সংগ্রামে তাকে সইতে হয়েছে নির্মম অত্যাচার। সাত বার তাকে গৃহবন্দী করা হয়। রাজপথে তিনি স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর লাঠিচার্জের শিকার হন। কাঁদানে গ্যাসের সেল তার শরীরে আঘাত করে। গ্যাসের ঝাঁঝালো ধূয়া ছুঁড়ে মারা হয় তার চোখে মুখে। এ সময় তার প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়া হয়।
স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের সবচেয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন- ‘এক মূহূর্তের জন্যেও তাকে শান্তিতে থাকতে দেব না।’ কথা অনুযায়ী কাজও করেন তিনি। তার ডাকা ১৭৩ দিনের হরতাল অবরোধ, অসহযোগ এবং জ্বালাও-পোড়াও-এ খালেদা জিয়া শেষের দিকে ঠিকই শান্তিতে আর দেশ চালাতে পারেননি। তার সরকারকে পদে পদে বিপর্যস্ত করা হয়েছে। দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নেয়া হয়েছে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে দেশকে, সরকারকে অস্থিতিশীলও করা হয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিরোধী দল বিএনপি’র ওপর প্রচন্ড দমন-পীড়ন চালান। হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা দেয়ার পাশাপাশি বিএনপি’র ৬০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গুলি ও টিয়ার সেল মেরে পল্টনে খালেদা জিয়াকে গুরুতর আহত ও তাঁর জনসভা ভেঙে দেয়া হয়। রাজনৈতিক আক্রোশে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দু’টি মামলাও দেয়া হয়।
খালেদা জিয়াকে ১/১১’র জরুরী সরকারের ভয়াবহ নির্যাতন
আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জেনারেল মঈন-মাসুদ গংদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের অশুভ প্রক্রিয়ায় ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেন, এ সরকার তাঁর আন্দোলনের ফসল। এই জরুরি সরকারের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। কুচক্রীরা প্রথমে তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার জন্য বিদেশে সপরিবারে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা চালায়। এটা ব্যর্থ হলে তাকে বিনা অপরাধে ৬ মাস ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। পরে গ্রেফতার করে এক বছর নির্জন কারাগারে বন্দী রাখা হয়। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা দেয়া হয় এবং চালানো হয় সীমাহীন কুৎসা ও অপপ্রচার। শুধু খালেদা জিয়াই নয়, তার দু’ছেলে তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমানকেও গ্রেফতার করা হয়। তারেক রহমানের উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। তার মেরুদণ্ডের হাঁড় ভেঙে দেয়া হয়। বন্দী থাকার কারণে মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যুর সময়ও পাশে থাকতে পারেননি তিনি। তাকে গুরুতর অসুস্থ দু’সন্তানকে দেখতেও দেয়া হয়নি। এক বছর পর প্যারোলে মুক্তি পেলেও পরিবার থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন। এখন পর্যন্ত তিনি ছেলে, ছেলে বউ ও নাতনিদের নিয়ে একত্রে থাকতে পারছেন না। নিঃসঙ্গ এবং বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপনই করতে হচ্ছে খালেদা জিয়াকে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য এক নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু করেন। এর অংশ হিসেবেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন খালেদা জিয়া। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনি নির্বাচন চান। কিন্তু নানা চলছাতুরির আশ্রয় নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার গত বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানে এগিয়ে যান। নির্বাচনের আগে ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া জনগণকে জাতীয় পতাকা হাতে ঢাকায় মার্চ করার কর্মসূচি আহবান করেন। সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ কর্মসূচি ভন্ডুল করে দেয়। খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে বালির ট্রাক বসিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। ওইদিন বাসভবন থেকে তিনি বেরিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেন। তাকে আসতে দেয়া হয়নি। ফলে গেটে দাঁড়িয়েই তিনি বক্তৃতা দেন। তাকে বাসভবনে অবরুদ্ধ রেখেই ৫ জানুয়ারি অস্ত্র ও গুলির মুখে একতরফাভাবে প্রহসনের নির্বাচনী তামাশা করা হয়।২৯ ডিসেম্বর মিড নাইট নির্বাচনের যে নজীর সৃষ্টি করে অবৈধ ভাবে বিনা ভোটের সরকার জনগনের কাঁদে চেপে বসে বিরোধী দলের উপর স্ট্রিম রোলার চালাচ্ছে।

রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা আছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। এক দল আরেক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী। এক নেতা আরেক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বী। দলে দলে নেতায় নেতায় প্রতিযোগিতা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কেউ কারো শত্রু হয় না। কিন্তু আজকের রাজনীতি যেনো শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দল বিএনপিকে প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে না। ভাবছে শত্রু। তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তারই রাজনৈতিক সহযোদ্ধা খালেদা জিয়াকে ভাবছে শত্রু।

খালেদা জিয়ার ওপর যে নির্মম সীমাহীন নির্যাতন হচ্ছে তার উদাহরণ বিরল। তবুও তাকে আরো নির্যাতন করতে হবে। তাকে আর কত নির্যাতন? আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনাকে বুঝতে হবে কেউ কাউকে শেষ করে দিতে পারে না। আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপিকে নির্মূল করতে পারবে না, তেমনি বিএনপিও আওয়ামী লীগকে নির্মূল করতে পারবে না। তেমনি খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এ কথা বলা যায়, গণতন্রের “মা” খালেদা জিয়াকে নির্যাতনই সবকিছুর শেষ নয়।

লেখক : প্রধান সম্পাদক শীর্ষ খবর ডটকম


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ