fbpx
 

বাংলাদেশ ও বিশ্ব রাজনিতীতে জিয়াউর রহমানের মূল্যায়ন!

Pub: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯ ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯ ২:০৯ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবস্হান অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে হচ্ছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান প্রসঙ্গ ও পরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্স এর কমান্ডার হিসেবে দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার প্রসঙ্গ। অন্য দিকে হচ্ছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠনকালে দূরদর্শী ভূমিকার প্রসঙ্গ, ১৯৭৫ সালের শেষ লগ্ন থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত সেনাবাহিনী পরিচালনা ও ১৯৮১ সালের মে পর্যন্ত দেশ পরিচালনার প্রসঙ্গ। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শেষ লগ্ন পর্যন্ত সময়কালে একাধিক কারণে বিপর্যস্ত জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন জীবন দানের দায়িত্ব পড়েছিল তার ওপর। সেই সুবাদে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর সরকারপদ্ধতি স্হি’তিশীলতা পাওয়ার যাত্রা শুরু করে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে। ওই দিন শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকারপদ্ধতি গ্রহণ করে।

মুজিবুর রহমান হন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। ও শেখ মুজিব ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের আগ্রহেই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে কায়েম করা হয় একদলীয় বাকশালী শাসন ব্যাবস্হা। মাএ চারটি সংবাদ পত্র রেখে বাকী গুলা বন্দ করে সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা কে হরন করা হয়।তখন একটি মাত্র দলের নাম ছিল বাকশাল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর সামরিক শাসন জারি হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবের ঘনিষ্ট সহচর ও মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ। অনেক দিন পর সামরিক শাসন যখন প্রত্যাহার করা হবে হবে ভাব, তখন জাতির সামনে একটি প্রশ্ন আসে এই মর্মে যে, বাংলাদেশ কি একদলীয় শাসনে ফেরত যাবে, নাকি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফেরত যাবে? বাংলাদেশের সব শ্রেণীর জনসাধারণের মনোভাব এবং সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মনোভাব ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের অনুকূলে। বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্যই ছিল বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করা। সেই সময়ের বাংলাদেশের কর্ণধার জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভক্ত ছিলেন বিধায় তিনি সময় নিয়ে, পরিবেশ সৃষ্টি করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। যদি তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না করতেন, তাহলে ওই সময়ের বাংলাদেশ আবার অন্ধকারে অরাজকতায় নিপতিত হতো। জিয়াউর রহমান দেশের ঐ ক্রান্তিলগ্নে দেশকে আলোর ও শান্তির পথ দেখান। একদলীয় শাসনের প্রবক্তা এবং অনুসারীরা তাঁকে অপছন্দ করার অন্যতম কারণ এটাই।

নিজ গুণে, মেধায় ও পরিশ্রমেই জেনারেল জিয়াউর রহমান একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মহীরুহ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের জন্য সর্বতোভাবে নিবেদিত হওয়া তথা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য, বাংলাদেশের মর্যাদা উন্নয়নের জন্য ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহযোগিতা অর্জনের জন্য তিনি নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন।

বাংলাদেশের এক ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একাত্তরের মার্চের ১ তারিখে পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান মার্চের ৩ তারিখে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্হ’গিত ঘোষণা করলে এ দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র-জনতা বুঝতে পারেন, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে নারাজ; তাই বাঙালিদের মুক্তির জন্য দেশের স্বাধীনতা ছাড়া আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। এ সময় ছাত্র নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতার দিকে জাতিকে ধাবিত করার জন্য প্রকাশ্যে মাঠে নেমে পড়েন। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন এটি যেমন সত্য, তেমনই সত্য যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বাধীনতার স্পৃহা দমিয়ে দিতে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই, আওয়ামী লীগের সাথে আলোচনা অসমাপ্ত রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই ঢাকা ত্যাগ করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ২৫ তারিখ রাতেই পাকিস্তান সরকারের হুকুমে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা মোতাবেক হামলা চালানো হয় চট্টগ্রামসহ দেশের একাধিক সেনানিবাসে বাঙালি সৈনিকের ওপর, পিলখানায় বাঙালি ইপিআরের ওপর, রাজারবাগে বাঙালি পুলিশের ওপর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আবাসিক হলের ওপর এবং সারা দেশে অগণিত জনবসতির ওপর। এ দিকে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতিকে যুদ্ধের প্রস্তু’তির কথা বললেও ২৫ মার্চের কালো রাতে জাতি তার কাছ থেকে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা পাননি কিংবা তিনি সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেয়ার সুযোগ চেষ্টা করেননি। এরূপ একটি প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসে কর্মরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও সৈনিকেরা একটি ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

সব বাঙালি অফিসার ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়ন গুলোর মধ্যে সর্বাধিক অগ্রণী ও ত্বরিত ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান এবং তার সাথে ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরের ষোল শহরে অবসি’ত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসার ও সৈনিকেরা। একই সময়ে ঐতিহাসিক দুঃসাহসী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) চট্টগ্রামের হেডকোয়ার্টারে কর্মরত বাঙালি অফিসার ক্যাপটেন রফিকুল ইসলাম এবং ক্যাপটেন হারুন আহমেদ চৌধুরী। ২৫ মার্চ মাঝ রাত ১২টার কয়েক মিনিট পর তথা ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের প্রথম প্রহরেই, ষোল শহরে নিজের ব্যাটালিয়নের অফিসার ও সৈন্যদের একত্র করে একটি খালি তেলের ড্রামের ওপর দাঁড়িয়েই নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন মেজর জিয়া। অফিসার ও সৈনিকদের সামনেই মৌখিকভাবে পাকিস্তানের বিরদ্ধে সামরিক বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত কারণেই ঐ ভাষণ ও ঘোষণাগুলোর কথা উপস্হি’ত সামরিক ব্যাক্তি বর্গ ব্যতীত বাঙালি জাতির অন্য কেউ জানতে পারেনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধকে সুসংহত করার জন্যই, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আমন্ত্রণে অথবা সম্মতিতেই ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। প্রথমে তিনি নিজ নামে করলেও পরে বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা করেন। দেশবাসী ও বিশ্ববাসী মেজর জিয়াউর রহমান নামক অকুতোভয় একজন সৈনিকের কণ্ঠ থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে পেলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। জিয়াউর রহমানের কণ্ঠনিঃসৃত স্বাধীনতার ঘোষণা ঐ আমলের সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত সব বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সব বাঙালি অফিসার ও সৈনিকের জন্য ছিল প্রেরণাময় ও উদ্দীপনাময় প্রায় অলঙ্ঘনীয় বার্তা। ২৭ মার্চ তারিখে বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়ার ঘোষণার মাধ্যমে পাক বাহিনীর মোকাবেলায় বাঙালি সৈন্যরাও যে যুদ্ধে নেমেছে এটি জেনে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। এভাবেই ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।

জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে অতি স্বল্প পরিসরে বলা খুবই কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালের প্রথম সাড়ে তিন মাস জিয়াউর রহমান কুমিল্লা সেনানিবাসে অবস্হি’ত ৪৪ পদাদিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘জেড ফোর্স’ পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডে রূপান্তর হয়েছিল। এপ্রিল ১৯৭২ থেকে ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান ছিলেন। অতঃপর ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের শেষ দিনগুলো এবং ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকের দিনগুলো ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার আঙ্গিকে অস্হি’তিশীল সময়।মেজর জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবেই উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ ভোর রাত ৩টার দিকে তিনি নিজ গৃহে বন্দী হন এবং ৪০ ঘণ্টা পর বিপ্লবী বা বিদ্রোহী সামরিক নেতাদের চাপে সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে সম্মত হন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহটি ছিল বিভীষিকাময়, উদ্বেগময় ও অনিশ্চয়তায় ভরা।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা এবং ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, উভয় ঘটনা বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশাজীবী মহলকে ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গগুলোকে বিভিন্নভাবে প্রভাবান্বিত করে। একটি মহল দারুণ দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। সেই মহলটি হচ্ছে ওই আমলের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। জাসদের অন্যতম অঙ্গসংগঠনের নাম ছিল গণবাহিনী। জাসদের সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একটি গোপন ও অবৈধ সংগঠনের নাম ছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্হা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার সদস্য ছিলেন ঐ আমলের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক জুনিয়র কমিশন অফিসার ও সৈনিক। বিপ্লবী সৈনিক সংস্হা এবং জাসদ মনে করত যে, সশস্ত্র পন্তায় ক্ষমতা গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এরূপ একটি সশস্ত্র-রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য ঐ আমলের জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্হা যৌথভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে আসছিল। তারা যৌথভাবে কবে বা কোন তারিখে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটাবেন সেটি সুনিশ্চিত হওয়ার আগেই ঘটে যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা। ১৫ আগস্টের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বা ঘটনার বস্ময়কর (সারপ্রাইজ-ইফেক্ট) কাটতে না কাটতেই ঘটে যায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের ঘটনা। ৩ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দারণভাবে উদ্বিগ্ন জাসদ এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্হা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয় অতি দ্রুত সশস্ত্র বিপ্লব ঘটানোর জন্য। এ বিপ্লব ছিল ৭ নভেম্বরের বিপ্লব। এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল ৬ নভেম্বর রাত ১২:০১ মিনিটে তথা আন্তর্জাতিক নিয়ম মোতাবেক ৭ নভেম্বর তারিখ শুরু হওয়ার মুহূর্তে। ওই বিপ্লবের তাৎক্ষণিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, যত বেশি সম্ভব সেনাকর্মকর্তাকে হত্যা অথবা বন্দী করা এবং দায়িত্বচ্যুত করা। অতঃপর অফিসারবিহীন সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত করা এবং ওই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী সেনাবাহিনী ও জাসদের নেতৃত্বে একটি কর্মকর্তাবিহীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কৌশলগত কারণেই জাসদ বা জাসদের গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্হা তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান (যিনি নিজ গৃহে বন্দী ছিলেন) জিয়াউর রহমানকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তাই ৭ নভেম্বর সৈনিক বিপ্লবের বা বিদ্রোহের প্রথম ঘণ্টাতেই তারা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে।

উল্লেখ্য, বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার সদস্যসংখ্যা ছিল কম। ঢাকা সেনানিবাসে হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক এই সৈনিক সংস্হার গোপন পরিকল্পনা জানত না। সাধারণ সৈনিকদের কাছে তাদের অতি প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা সেনাপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। সাধারণ সৈনিকেরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার আহ্বানে ওই রাতে রাস্তায় নামে কিন’ যখনই তাদের গোপন পরিকল্পনা গোচরীভূত হয় তখনই তারা সাবধান হয়ে যায় এবং ওই সম্পর্কছেদ করে। সাধারণ সৈনিকেরা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে আগলে রাখে এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার তথা জাসদের হাত থেকে তাকে রক্ষা করে। সাধারণ সৈনিকদের এ প্রচেষ্টায় ঢাকা মহানগরের জনসাধারণ যোগদান করেন। তাই ৭ নভেম্বরের বিপ্লবকে বলা হয় সিপাহি -জনতার বিপ্লব। জেনারেল জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর সূর্যোদয়ের আগেই সেনাবাহিনীর ওপর তার নেতৃত্ব ও কমান্ড আবার সমর্পন করেন। ওই দিন তথা ৭ নভেম্বর সকালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিকেরা ও ঢাকা মহানগরীর জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি বিতর্কিত আত্মঘাতী রাজনৈতিক-সশস্ত্র হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেঁচে যায়। বাংলাদেশ রক্ষা পায়; অপর ভাষায় বলতে গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা পায়। সেই রাতে ও দিনে অনেক কর্মকর্তা বিপ্লবী সৈনিকদের হাতে প্রাণ হারান।

উল্লেখ্য, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর, অভ্যুত্থানের নায়কদের মুখ থেকে বের হওয়া কিছু কথা এবং নায়কদের ঘনিষ্ঠদের কিছু কর্মকাণ্ডে ঢাকা মহানগরে তথা বাংলাদেশে একটি অনুভূতি প্রচার হয়ে যায় এই মর্মে যে, ‘৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানটি ভারতপন্হী অভ্যুত্থান। ভারতপন্হী এ অভ্যুত্থানের মহানায়কেরা বাংলাদেশকে ভারতের অনুগত বানানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অকুতোভয় সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দী করেছে।’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে এবং ঢাকা মহানগরীর সাধারণ জনগণের মনে একটি আকাঙ্ক্ষার প্রদীপ উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে এই মর্মে যে, বাংলাদেশকে ভারতের হাত থেকে বাঁচাতে হলে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে হবে। পাঠক এ পর্যায়ে লক্ষ করবেন যে, সাধারণ সৈনিকেরা একটি উদ্দেশ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছেন এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার অনুসারীরা আরেকটি উদ্দেশ্যে তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছেন। বিপ্লবী সৈনিকদের উদ্দেশ্যে ছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক তথা জনপ্রিয় আবেদনময় চরিত্র ও নাম ব্যবহার করে জাসদের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা।

৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থান, ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে এসে ব্যর্থ হয়ে যায়। ওই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার- এই তিনজনই বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঢাকা ত্যাগ করতে উদ্যোগ নেন। বাধাগ্রস্ত হয়ে তারা দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নেন। দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট উত্তরবঙ্গে রংপুর সেনানিবাসে ওই ব্রিগেডের অধীন ছিল, যে ব্রিগেডটির ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা। নিজের নেতৃত্বে সম্পাদিত অভ্যুত্থানের সাহায্যার্থে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে রংপুর থেকে ঢাকা আনেন। ওই দশম বেঙ্গল অস্হায়ীভাবে ঢাকা মহানগরের শেরেবাংলা নগরে অবস্হান নিয়েছিল এবং ঐ অবস্হানেই বিতর্কিত পরিস্হিতিতে সেই তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে অনেক কিছুই লেখা যাচ্ছে না স্হানাভাবে; তবে যেকোনো সবিশেষ আগ্রহী রাজনৈতিক মনা ব্যক্তির জন্য এ প্রসঙ্গটি বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

আয়তনে ছোট ও দরিদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বে এ রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ভাবমর্যাদা অর্জনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনন্য-অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এ সাফল্যের পেছনে গভীরভাবে কাজ করেছে তার বৈদেশিক নীতির অনুপম আদর্শ ও সঠিক বৈশিষ্ট্যগুলো। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তার নেতৃত্বসুলভ পদ্ধতি ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি নিজেই বৈদেশিক বিষয়াদি বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি তদারকি করতেন। আলোচনা, পরামর্শ, মতবিনিময়, অধ্যয়ন, বৈঠক ও খোঁজখবর রাখা বা ফলোআপ করা ছিল তার কর্মপদ্ধতির বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্যই তার বৈদেশিক নীতি আদর্শকে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ও ফলপ্রসূ করে তুলেছিল। তার পররাষ্ট্রনীতির কারণে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্থবহ হয়েছিল, জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি আর ভিক্ষুকের জাতি এই অপবাদ ঘোচাতে পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী কাজ করা শুরু করেন। তার নেতৃত্বের গুণাবলিতেই অনেক দেশের সাথে বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি নানা রকম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও পেশাগত কাজে দক্ষ ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে দেশের পররাষ্ট্র নীতিকে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার যে যুগান্তকারী নজির স্হাপন করে গেছেন তারই ফলে দেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল হয়েছে, দেশের স্বার্থও রক্ষা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পররাষ্ট্রনীতিকে যদি গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেটি চলবে আমলাতন্ত্রের আপন গতিতে, আপন ধারায় ও আপন পথে। সেখানে গন্তব্য কোথায়? পৌঁছবে কখন? এসব বিষয় অজানা থাকে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখেছিলেন। পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে তার মধ্যে একটা ধ্যান-ধারণা বা চিন্তা ছিল, একটা নীতি ছিল, একটি গন্তব্য ও লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজে লাগিয়েছেন এবং সফলতা অর্জন করেছেন। পররাষ্ট্রনীতিতে দেশনেতা জিয়াউর রহমানের সরকারের সফলতায় পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রনায়কও হতবাক হয়েছিলেন। অপ্রিয় হলেও সত্য, আজ বাংলাদেশ সরকারের যেসব নীতি এবং মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে, পররাষ্ট্রনীতি তার মধ্যে অন্যতম। বন্ধুপ্রতিম অনেক দেশের সাথেই আমাদের এখন শীতল সম্পর্ক বিরাজমান। একটি দেশের জন্য এ অবস্হা অশুভ লক্ষণ।

দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রপতি জিয়া সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রসারিত ও কার্যকর করার জন্য সার্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়ন ছিল। ১৯৮০ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি জিয়া একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শান্তি জোট গঠনের প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করে দিল্লিতে যান। বাংলাদেশের নেতা রাষ্ট্রপতি জিয়ার এই বাস্তবধর্মী প্রস্তাবে আকৃষ্ট হন ভারতরত্ন ইন্দিরা গান্ধী। প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয় সার্ক গঠনের। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া তত দিন বেঁচে ছিলেন না, কিন্তু এই দেশনেতা স্বীকৃতি পেয়ে যান সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় গৌরব ও অর্জনের বিষয়।

এ দেশের শিশুদের সম্ভাবনাময় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠা করেন শিশু একাডেমী। পুলিশ ও আনসার বিভাগে মহিলাদের কর্মসংস্হানের জন্য মহিলা পুলিশ ও মহিলা আনসার বাহিনী সংগঠন করেন। গ্রামীণ জনগণকে শাসনকাজে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যে তৈরি করেন গ্রাম সরকার। যুবশক্তিকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেন। কৃষিকাজেও অভূতপূর্ব সাফল্য আনেন তিনি। এক কথায় মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালের ৩০ মে শাহাদতের আগ পর্যন্ত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল এ দেশের মাটি ও মানুষের জন্য নিবেদিত প্রান । বাংলাদেশের রাজনীতি অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন ও বিকাশ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন, সামাজিক অবক্ষয় থেকে জাতির মুক্তি, স্বাধীনতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সাথে অকৃত্রিম সম্পর্কোন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার চিরদিন অবদানের কথা এ জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবে এবং তার মতো একজন নেতার শূন্যতা অনুভব করতে থাকবে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক শীর্ষ খবর ডটকম


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ