fbpx
 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র

Pub: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯ ২:৪৫ অপরাহ্ণ   |   Upd: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯ ২:৪৫ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এমাজউদ্দীন আহমদ
অধ্যাপক মুনরোর (William Bennett Munro) কথায়, ‘সুসভ্য মানুষ ধর্মীয় অনুপ্রেরণা লাভ করেছে প্রাচ্যদেশ থেকে, অক্ষর পেয়েছে ইজিপ্ট থেকে, অ্যালজেব্রা পেয়েছে মুরদের কাছ থেকে, ভাস্কর্য লাভ করেছে গ্রিকদের কাছ থেকে, আইন পেয়েছে রোমানদের কাছ থেকে। রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য সে প্রধানত ঋণী ইংলিশ মডেলের কাছে।’ ব্রিটিশ সংবিধান হলো সব সংবিধানের জননী। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সব পার্লামেন্টের জন্মদাত্রী। এর ভিত্তিতেই কালে কালে সংগঠিত হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র বা পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থা। বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি ব্রিটিশ মডেলের। গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ ব্যবস্থার অনুকরণেই। ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনাকে ধারণ করেই। তারপরও কেন সংসদীয় ব্যবস্থা এ দেশে প্রাণবন্ত হচ্ছে না? কেন এ দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে? এসব প্রশ্ন জনগণের মনে প্রতিনিয়ত আলোড়ন তোলে; আন্দোলিত করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মনকে। এসব প্রশ্নের উত্তর সবার কাছে সহজলভ্য হওয়া দরকার। সবার জানা দরকার।

আজকের বাংলাদেশে ব্রিটিশ মডেলে নির্বাচিত সংসদ থাকার কথা। রয়েছে ব্রিটিশ পদ্ধতির মন্ত্রিপরিষদ। রানী নেই বসে শীর্ষস্থানে, কিন্তু রয়েছেন রাষ্ট্রপতি, শাসনতান্ত্রিক প্রধান হিসেবে। রয়েছে রাজনৈতিক দল। ব্রিটিশ মডেলের বহুদলীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রয়েছে শাসন কাজ পরিচালনার দায়িত্বে। সংখ্যালঘু দল বিরোধিতায়। ছায়া কেবিনেট গঠিত হয়নি বটে, কিন্তু বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গ কেবিনেট সদস্যদের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছেন। গণতন্ত্রের কাঠামো রয়েছে, নেই শুধু এর সুষ্ঠু কার্যকারিতা।

গণতন্ত্রের সুষ্ঠু কার্যকারিতা নেই কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। নেই এর কোনো সর্বজনগ্রাহ্য জবাব। ইতিহাস এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নয়। শুধু এটুকু বলা যায়, ইতিহাস নয়, বরং এ ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা দিতে পারে সমাজবিজ্ঞান বা মনোবিজ্ঞান বা পলিটিক্যাল ইকোনমি। বাংলাদেশে সংসদ রয়েছে, নেই শুধু সংসদীয় সংস্কৃতি। মন্ত্রিপরিষদ আছে, নেই মন্ত্রিপরিষদীয় দায়িত্বশীলতার একবিন্দু। যতটুকু রাজনৈতিক দল আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে দলীয় জিঘাংসা, দলীয় প্রতিহিংসা। সরকার রয়েছে। রয়েছে বিরোধী দলও। কিন্তু একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়; রয়েছে বৈরিতার ডালা সাজিয়ে, শত্রুতার হিংস্র দন্তনখরসমেত। রাষ্ট্রপতি শুধু অলঙ্কার। ব্রিটেনে অনেকে এখনও বিশ্বাস করে, যতক্ষণ রানী বাকিংহাম প্রাসাদে রয়েছেন; জনগণ ততক্ষণ ঘুমায় নিশ্চিন্তে। বঙ্গভবনের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এখনও তা প্রযোজ্য হয়নি।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বৃহৎ জনসমষ্টির শাসন-প্রশাসনের কলাকৌশলে মাত্র দুটি জাতি বিশিষ্ট অবদান রেখেছে। প্রাচীন বিশ্বে রোমান জাতি; আধুনিককালে ব্রিটিশরা। রোমানদের সুবিস্তৃত শাসনব্যবস্থার রীতিনীতি ও বিধিবিধান প্রাচীন বিশ্বের প্রায় সর্বত্র গভীর স্বাক্ষর রেখেছিল। সভ্য দুনিয়ায় রোমান সরকার ব্যবস্থা তাই গণ্য হয়েছিল নিত্য, শাশ্বত, স্থায়ী ব্যবস্থারূপে। আধুনিক বিশ্বে ব্রিটিশ মডেল অনেকটা বিশ্বজনীন। দুইয়ের মধ্যে মিল শুধু এইখানে। কার্যকারিতার ক্ষেত্রে তফাত কিন্তু আকাশ-পাতাল। অনেকটা আলো-অন্ধকারের মতো।

রোমান ব্যবস্থা গণইচ্ছার মুকুট পরে জয়যাত্রার সূচনা করে। শেষ করে অবশ্য পরম পরাক্রমশালী বিজয়ীর দুর্বিনীত একাধিপত্যের পদতলে। অন্যদিকে ব্রিটিশ ব্যবস্থা শুরু হয় ক্ষমতাদর্পী, স্বেচ্ছাচারী রাজার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে। এর সমাপ্তি ঘটে সার্বভৌম গণইচ্ছার পদতলে আত্মনিবেদন করে। আধুনিককালের চিন্তাচেতনা ধারণ করে, প্রতি বাঁকে জনগণের রায়ের সঙ্গে নিজেকে সঙ্গতিপূর্ণ করে ব্রিটিশ ব্যবস্থা কালোত্তীর্ণ হয়েছে। গণতন্ত্রের চেতনা গ্রিক প্রতিভার অনবদ্য সৃষ্টি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র কিন্তু ব্রিটিশদেরই শ্রেষ্ঠতম অবদান। ‘জনগণের বাণী ভগবানেরই বাণী’- এ নীতির বাস্তবায়ন তাদের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

শাসনব্যবস্থা সম্পর্কিত এ দুই ঐতিহাসিক ধারার প্রতিফলন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সমাজে দেখা গেছে। এমনকি একই সমাজে বিভিন্ন সময়েও এর বাস্তবায়ন দেখা যায়। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকেই যাত্রা শুরু করেছিল গণতন্ত্রকে মাথায় নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের অনলকুণ্থেকে স্বাধীনতা এবং রক্তরঞ্জিত পতাকা তুলে এনে; আত্মত্যাগ ও আত্মদানের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে। গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগের শত মশাল জ্বালিয়ে। অনেকটা রোমানদের মতো গণতন্ত্রের চেতনাকে শানিত করে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু অথবা অপমৃত্যু ঘটে। তাও মাত্র তিন বছরের মধ্যে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ সংবিধান দ্বিতীয় সংশোধন আইনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল শিথিল হয়। মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান আসে। বিনা বিচারে আটকের ব্যবস্থা হয়। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে গণতন্ত্রের সমাধি রচিত হয় বাংলাদেশে। একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। সংবাদপত্রের মুখ-চোখ-কান বন্ধ হয়। বিরোধিতার সব বাতায়ন রুদ্ধ হয়। রোমান শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে লেগেছিল কয়েকশ’ বছর। বাংলাদেশে তা এলো মাত্র সাড়ে তিন কি চার বছরে, প্রবল প্রতাপ বিজয়ীর পদতলে।

অন্যদিকে তাকালেও দেখা যাবে, ব্রিটিশ পদ্ধতি পরিণত অবস্থায় উপনীত হয় চার-পাঁচশ’ বছরে। ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা থেকে যার যাত্রা শুরু, ১৬৮৮-এর গৌরবময় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তার স্থিতিশীল অবস্থা। পরবর্তী পর্যায়ে তা ব্রিটেনেই সীমিত থাকেনি। বিশ্বময় হয়েছে প্রচারিত, প্রবর্তিত এবং নন্দিত। বাংলাদেশে এ চক্রের আবর্তনে সময় লাগে মাত্র ক’বছর। প্রথমে একদলীয় ব্যবস্থার অবসান এবং বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন। গণতন্ত্রের চলার প্রক্রিয়া যে নির্বাচন, তার প্রতিষ্ঠা। মৌলিক অধিকারের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন। দু’দশকের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন, ১৯৯১ সালে। সংসদকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পুনঃস্থাপন। সরকারি ও বিরোধী দলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় কল্যাণ সাধনের পথ প্রশস্তকরণ। এ সবকিছুই মাত্র দু’দশকের মধ্যে। ব্রিটিশ ব্যবস্থার মতো রাজাধিরাজের পদতল থেকে গণইচ্ছার সিংহাসনে।

শাসনব্যবস্থার এ নাটকে বারবার পটপরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত নয়। নয় প্রয়োজনীয়। তার পরও তা হয় কেন? কেন হয়, তার বিস্তৃত জবাব রয়েছে। কীভাবে এর গতিপথ রোধ করা যায়, তারও পথনির্দেশ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জন স্টুয়ার্ট মিলের কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি কোনো জাতির অনুরাগ থাকতে পারে। গণতন্ত্রকে সফল করার জন্য কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। কোনো সমাজে গণতন্ত্র বিধ্বস্ত হয় যদি ওই জাতি ঔদাসীন্য বা অসতর্ক বা কাপুরুষোচিত আচরণ বা গণতান্ত্রিক চেতনার অভাবে অধিকার সংরক্ষণের অযোগ্য হয়ে ওঠে। আক্রান্ত হলে সংগ্রামে লিপ্ত না হলে, শাসনব্যবস্থার বাইরের চাকচিক্যে বিভ্রান্ত হলে কিংবা সাময়িকভাবে উৎসাহ হারিয়ে ফেললে, ভীত-সন্ত্রস্ত হলে অথবা কোনো ব্যক্তির প্রতি তিনি যত বড় এবং মহান নেতাই হোক না কেন, অনুরাগের আতিশয্যে মুগ্ধ হয়ে সব অধিকার তার পায়ে সঁপে দিলে, ওই জাতি স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণের অযোগ্য হয়ে ওঠে।’

স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় বাংলাদেশের সচেতন জনগণের জন্য আজকে জন স্টুয়ার্ট মিলের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ৩০ লাখ জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা অর্থপূর্ণ হতে পারে শুধু গণতান্ত্রিক কাঠামোয়। প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় গণতন্ত্রে। প্রত্যেকে নিজ নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পায় এ ব্যবস্থায়। প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অবাধ সুযোগ লাভ করে গণতন্ত্রে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংরক্ষণে জনগণের যে ভূমিকা, নেতৃত্বের ভূমিকা তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নেতানেত্রীদের এ কথা স্মরণে রাখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ১৮০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই রিপাবলিকান-ফেডারেলিস্ট। আমাদের মধ্যে এখনও যদি কেউ থেকে থাকেন যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ভেঙে দিতে চান বা রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক রূপকে পাল্টে দিতে চান, তাহলেও তিনি পূর্ণ নিরাপত্তার অধিকারী হবেন। কেননা, ভ্রান্ত অভিমতকে শোধরাতে হবে শুধু যুক্তি দিয়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ বিচার-বুদ্ধির জন্য আমি ভুল করতে পারি। যখন সঠিক পথে থাকব, তখনও সার্বিক চিত্র চোখের সামনে না পেয়ে আমাকে ভ্রান্ত বলে সমালোচনা করতে পারেন কেউ কেউ। আমার ভুল শুধরে দেওয়ার আহ্বান জানাই।’

ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ফেডারেলিস্ট ওই দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বিজয়ী হয়ে তিনি বলতে পেরেছিলেন, আমরা সবাই রিপাবলিকান, আমরা সবাই ফেডারেলিস্ট। পারবেন কি আমাদের নেতানেত্রীরা বলতে- ‘সবাই আমরা আওয়ামীপন্থি, সবাই আমরা বিএনপিপন্থি, সবাই আমরা বাংলাদেশি’। মহৎপ্রাণ নেতৃত্বের অগ্নিস্পর্শে বিভেদের সব কালিমা মুছে যায়। মুছে যায় বলেই জেফারসনের মতো নেতা সবাইকে আহ্বান করতে পারেন এক প্রাণ এক মন নিয়ে সম্মিলিত হতে। ফলে গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিশাল সৌধ। আর আমরা? আমাদের নেতানেত্রীরা দয়া করে স্মরণ করুন গণতন্ত্রের প্রবক্তা ওইসব দিকপালের কিছু অমৃত বাণী। গণতন্ত্রের ঝুপড়ি বানানোর ক্ষমতাও কি নেই আমাদের? সরল মনে কল্যাণকর জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পারেন না তেমনি উদাত্ত আহ্বানে সবার মনকে স্পর্শ করতে? এটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সঙ্গে সঙ্গে আগামী দিনগুলোকে অর্থপূর্ণ করতে হলে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে রাষ্ট্রকৃত্যকদের সম্পর্কে। তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত হতে হবে জনগণের কাছে। সরকারকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। একদলীয় ব্যবস্থার প্রতি মোহগ্রস্ত হলে গণতন্ত্রের শিকড়টা নড়বড়ে হয়ে যাবে।

লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ