fbpx
 

জেনারেল এম এ জি ওসমানী স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আপসহীন যোদ্ধা

Pub: রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশের মানুষের কাছে জেনারেল এম এ জি ওসমানী এক প্রিয় নাম, একটি ইতিহাস। মুক্তিসংগ্রামের জীবন-মরণের উত্তাল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ওসমানী ছিলেন বাংলার জনগণের কাছে কিংবদন্তি মহানায়কের মতো। রণ কুশলী কর্নেলর খ্যাতি ছিল তখন সারা জাতির কাছে আশার আলোকবর্তিকা। স্বাধীনতার গর্বিত অনুভূতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিশে ওসমানী পেয়েছেন মরণজয়ী অম্লান আসন।
কঠোর নীতিবোধ, সততা ও পরমতসহিষ্ণুতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজীবন গণতন্ত্রী জেনারেল ওসমানী ছিলেন প্রচলিত ধারায় একজন ব্যতিক্রমী আদর্শ মানুষ।
বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ওসমানী ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার মহকুমা শহর সুনামগঞ্জে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেন। তাঁর বাবা ছিলেন সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও। তাঁদের পৈতৃক নিবাস তৎকালীন বালাগঞ্জ থানার (বর্তমান ওসমানীনগর উপজেলার) দয়ামীরে। ওসমানীর বাবা খান বাহাদুর মুফিজুর রহমান ও মা জুবেদা খাতুন। তাঁর পিতামহ ও মাতামহ দুজনই ছিলেন সুশিক্ষিত, আলোকিত ও দানশীল ব্যক্তিত্ব। সে সময় তাঁদের পরিবার ছিল মানবিক মূলবোধ ও ঐহিত্যের নিরিখে সমৃদ্ধ। এই পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ পরবর্তীতে ওসমানীর বেড়ে ওঠা ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
জেনারেল ওসমানীর আরব দেশীয় পূর্বপুরুষ ছিলেন শাহ নিজাম উদ্দিন ওসমানী। ১৩ শ শতাব্দীতে গৌড় গোবিন্দের রাজত্বকালে এ দেশে ইসলামের সুমহান বাণী নিয়ে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে হজরত শাহজালালের (র.) সঙ্গী হয়ে সিলেটে যেসব অলি-আউলিয়ার আগমন ঘটে, যাঁরা পরবর্তীকালে ৩৬০ আউলিয়া অভিধায় পরিচিতি লাভ করেন—তাঁদের মধ্যে ছিলেন শাহ নিজাম উদ্দিন ওসমানী (র.)। তিনি ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন বলে লোকজন তাঁকে ‘ইয়েমেনি’ বলেও ডাকত।
ওসমানীর পিতামহ মরহুম আবদুস সোবহান চৌধুরী (১৮৫০-১৯৩০) ছিলেন ফারসি ভাষায় পারদর্শী, দার্শনিক ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। ১৯০৮ সালে তিনি নিজ এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। দয়ামীরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল এখনো এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে যেমনি যুগান্তকারী অবদান রাখছে, তেমনি শতাধিক বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনদরদি ও শিক্ষানুরাগী মরহুম আবদুস সোবহান চৌধুরীর এই অনন্য অবদানের কথা ঘোষিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
অভাবীদের জন্য ওসমানীর পিতামহ আবদুস সোবহান চৌধুরীর হাত ছিল সদা প্রসারিত। তাঁর আতিথ্য ছিল অতুলনীয়। বিশেষ করে, সে সময় দয়ামীর হয়ে সিলেট তথা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসাফিরদের জন্য তাঁর সেবা কার্যক্রমের প্রশংসা ছিল মানুষের মুখে মুখে। সিলেট শহর থেকে ১২ মাইল দূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মুসাফিরদের সেবায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি মুসাফিরখানা। যেখানে ছিল মুসাফিরদের জন্য বিনা খরচে থাকা, খাওয়া ও পানীয় জলের সুবন্দোবস্ত।
মরহুম আবদুস সোবহানের প্রথম কাজিন খান বাহাদুর আসাদ্দর আলী খান (বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান) ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পাটনায় সিভিল সার্জন ও স্বনামধন্য চিকিৎসক। এদিকে, তাঁর ছোট কাজিন স্যার গজনাফর আলী খান ১৮৯৭ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) উত্তীর্ণ স্বনামধন্য কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে প্রথম মুসলিম আইসিএস অফিসার। স্যার গজনাফর আলী খান ছিলেন চিরকুমার। ওসমানীর কাছে তিনি ছিলেন বরাবরই অনুকরণীয় আদর্শ।
ওসমানীর দাদি অর্থাৎ মরহুম আবদুস সোবহান চৌধুরীর সহধর্মিণী বেগম কামরুন্নেছা চৌধুরী (১৮৫৫-১৯৩০) ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও মমতাময়ী নারী। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল পুরো পরিবার, এমনকি পাড়া-পড়শির কাছে অনুপ্রেরণার বিরাট উৎস। ওসমানীর বয়স যখন মাত্র ১২ বছর, তখন ১৯৩০ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাঁর মমতাময়ী দাদি বেগম কামরুন্নেছা ইহলোক ত্যাগ করেন। স্বামী আবদুস সোবহান মাত্র সাত দিন পর ২৬ ডিসেম্বর ইহলোক ত্যাগ করেন।
ওসমানীর মাতামহ সিলেটের বিশ্বনাথ থানার দশঘর ইউনিয়নের রায়কেলির জমিদার মরহুম মুহম্মদ আকিল চৌধুরী ছিলেন শিক্ষিত, মানবপ্রেমী ও পরোপকারী ব্যক্তি। তাঁর মানবপ্রীতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এলাকার মানুষের জীবনমান ও শিক্ষার উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ওসমানীর বাবা খান বাহাদুর মুফিজুর রহমান ছিলেন উনিশ শতকের উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। ১৮৯৮ সালে অবিভক্ত ভারতের পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তিনি আসাম সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। একজন চৌকস ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে মফিজুর রহমান তদানীন্তন আসাম-বেঙ্গল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে নানা পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অবিভক্ত ভারতের আসাম-বেঙ্গল প্রদেশের অন্তর্গত মুন্সিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও), আসামের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) এবং আসামের ল্যান্ড রেকর্ডসের প্রথম মুসলিম ডাইরেক্টর হিসেবে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

খান বাহাদুর মুফিজুর রহমান যেখানেই গেছেন, সেখানেই তিনি গণসাক্ষরতার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এ লক্ষ্যেই তিনি নিজ এলাকা দয়ামীরে তাঁর পরলোকগত একমাত্র কন্যা সদরুন্নেসা খাতুনের নামে প্রতিষ্ঠা করেন সদরুন্নেসা মিডল ইংলিশ মাদ্রাসা যা পরবর্তীতে সদরুন্নেসা হাই স্কুল হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শতবর্ষ প্রাচীন এ ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করেছে।
সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার জনদরদি খান বাহাদুর মুফিজুর রহমান তদানীন্তন আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মানবকল্যাণ তথা সমাজ সেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘কাইসার-ই-হিন্দ’ পদক লাভ করেন। তিনি তদানীন্তন বৃহত্তর সিলেট জেলা বোর্ডের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জীবনভর তিনি স্কাউটসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণে ৮৬ বছর বয়সেও স্কাউটস ইউনিফর্ম পরে সিলেটে স্কাউটস প্যারেডে তাঁকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
ওসমানীর মা বেগম জুবেদা খাতুন ছিলেন ঐতিহ্য সচেতন ও বিদ্যোৎসাহী গুণবতী নারী। তিনি ছিলেন ওসমানীর পিতামহ আবদুস সোবহান চৌধুরীর বোনের মেয়ে। মামা আবদুস সোবহান চৌধুরীর ছাত্রী হিসেবে তিনি দয়ামীরেই পড়াশোনা করেছেন। শিক্ষাজীবন তিনি কাটিয়েছেন মামার বাড়ি দয়ামীরে। তিনি ছিলেন যেমনি সুশৃঙ্খল ও নীতির প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর, তেমনি ছিলেন গভীর মমতাময়ী। একজন সফল ও আদর্শ মা হিসেবে তিনি তাঁর ছোট ছেলে আতাউল গণি ওসমানীকে সত্যিকারের একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক প্রয়াসী ছিলেন। যে কারণে ওসমানী নীতি, আদর্শ, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ব্যাপারে জীবনে কখনো আপস করেননি।
ভিক্টোরিয়া আমলে যেসব মহিলা গ্রামীণ পরিবেশে নিজ গৃহে শিক্ষা-দীক্ষার চর্চা করে সব মহল ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হতেন এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মানবিক গুণাবলি অন্যের চলার পথে অনুপ্রেরণা জোগাতেন-ওসমানীর মাতা মরহুমা জুবেদা খাতুন ছিলেন তাদেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক। গুণবতী মায়ের প্রভাবে শৈশব থেকেই ওসমানীর জীবন ছিল রুটিনবাঁধা। ওসমানী ছিলেন দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। ভাই-বোনের মধ্যে ছিল গভীর মমত্ববোধ, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা। বড় ভাই মুহম্মদ নুরুল গণি ছিলেন তাঁর চেয়ে ১১ বছরের বড়। একমাত্র বোন সদরুন্নেসা খাতুনের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল ৮ বছর। পারিবারিক ঐতিহ্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বাবা-মায়ের অপরিসীম মমত্ববোধ ও সুপরিচর্যায় ওসমানীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
ওসমানীর বড় ভাই মুহম্মদ নুরুল গণি ১৯০৭ সালে জন্ম নেন। অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের রাজধানী গুয়াহাটিতে আইনে মর্যাদাপূর্ণ ল’ ডিগ্রি লাভ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। আসাম প্রাদেশিক সরকার ও পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে একজন দক্ষ অফিসার হিসেবে বিভিন্ন স্থানে নানা পদমর্যাদায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১সালে এক্সাইজ ও ট্যাক্সেশন কমিশনার হিসেবে অবসরে যান। ওসমানীর একমাত্র বোন সদরুন্নেসা খাতুনের জন্ম ১৯১০ সালে। ওসমানীর বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখন সদরুন্নেসা বিয়ের কয়েকদিন পরেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে মারা যান। প্রিয় বোনকে হারানোর ব্যথা ওসমানী জীবনভর হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
অবিভক্ত ভারতবর্ষের আসাম-বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সুদক্ষ-চৌকস কর্মকর্তা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান বৃহত্তর সিলেটের তদানীন্তন সুনামগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) হিসেবে নিয়োগ পান ১৯১৮ সালে। সিভিল প্রশাসনে মহকুমা পর্যায়ে এটি ছিল সর্বোচ্চ পদ। ১৮৬০ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে সিলেট জেলাকে চারটি মহকুমায় ভাগ করা হয়। এগুলো ছিল সিলেট সদর, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও দক্ষিণ সিলেট তথা মৌলভীবাজার। মফিজুর রহমান সুনামগঞ্জে মহকুমার প্রশাসক হিসেবে যোগদানের কিছুদিন পর তাঁদের কোল আলোকিত করে ১৯১৮ জন্ম হয় আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম মহিরুহ মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর। তৃতীয় সন্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে জুবেদা খাতুন ও মুফিজুর রহমান দারুণ খুশি ও পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন। ভাই-বোনদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হওয়ায় শিশু ওসমানী ছিলেন সবার আদরের। মমতাময়ী মা নবজাতক শিশুটির নাম রাখেন ‘মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী’ এবং ডাক নাম দেন ‘আতা’।
তিন বছর পর সুনামগঞ্জ থেকে খান বাহাদুর মুফিজুর রহমান ১৯২১ সালে পদোন্নতি পেয়ে আসামের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান। শৈশবে আসাম অধ্যায়ে ওসমানীর উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করে। গৃহ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ১৯২৩ সালে ওসমানীর শিক্ষা জীবন শুরু। এগারো বছর বয়সে ১৯২৯ সালে আসামের কটন্স স্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৩২ সালে আসাম থেকে সিলেট সরকারি পাইলট হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন বালক ওসমানী। এ সময় সিলেট সরকারি পাইলট হাই স্কুল ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন।
১৯৩৪ সালে তিনি অসাধারণ নম্বর পেয়ে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হন এবং অসাধারণ ফলাফলের জন্য ‘প্রিটোরিয়া পুরস্কার’ লাভ করেন। পরে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ওসমানী আইএ এবং ১৯৩৮ সালে বিএ পাস করে ভূগোল শাস্ত্রে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করেন। মাস্টার্সে অধ্যয়নকালে তিনি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা অংশ নেন। মাস্টার্স শেষ পর্বে অধ্যয়নকালে পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে তিনি তাতে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে ১৯৩৯ সালের জুলাইয়ে ওসমানী ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। সামরিক বাহিনীতে সে সময় প্রাধান্য ছিল ইংরেজদের। তখন প্রতি বছর ৩০০ কর্মকর্তার মধ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার মাধ্যমে ভারতবর্ষ থেকে মাত্র ৩০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হত। বাকিরা নিয়োগ পেত যুক্তরাজ্য থেকে। ১৯৪০ সালের ৫ অক্টোবর তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি দেরাদুন থেকে সামরিক শিক্ষা শেষ করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি ব্যাটালিয়নের (যান্ত্রিক পরিবহন) অধিনায়ক হয়ে তিনি সামরিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করেন।
সেনাবাহিনীতে এমএজি ওসমানী ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকেই লে. কর্নেল পদে মনোনীত হন এবং ব্রিটিশ ভারতে সিমলায় জেনারেল হেড কোয়ার্টার্সে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল শাখায় সেকেন্ডড গ্রেড স্টাফ অফিসার নিযুক্ত হন। ভারত বিভাগ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সিমলায় কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল শাখায় পাকিস্তানের জন্য অংশ নির্ধারণ করার দায়িত্ব পড়ে ওসমানীর ওপর। তিনি সিমলায় ‘পাকিস্তান সেল’ গঠনের কাজ সম্পন্ন করেন। পরে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত সুপ্রিম কমান্ডার ফিল্ড মার্শাল অকিনলেকের অধীনে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল শাখায় তিনি পাকিস্তানের পক্ষ হতে দেশ বিভাগ কার্য সম্পাদন করেন। ১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে আসেন এবং ওই দিনই বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে লে. কর্নেল হন।
১৯৪৮ সালে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভের পর ’৪৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি সেনাবাহিনীর তদানীন্তন চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল রেজিনে হার্টনের জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড-১ নিযুক্ত হন। তদানীন্তন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ওসমানীই আইএসবিতে যাওয়ার আগে শিক্ষা সংক্রান্ত যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য তিনটি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা প্রবর্তন করেন। ১৯৫১ সালে ওসমানীকে প্রথমবারের মতো তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি করা হয়। প্রথমে তিনি মাত্র ৩ বছর বয়সী ফার্স্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন। পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরো সেন্টারের পরিচালনা ভার নেন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সেন্টারের স্থায়ী নিবাসে রেজিমেন্ট স্থানান্তরিত করেন। চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
১৯৫১ থেকে ’৫৫ সালের মধ্যে ওসমানী খুলনা, যশোর, ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্টেশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৫৫ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট (যাকে বর্তমানে ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেল বলা হয়) হিসেবে পূর্ব বাংলার সরকারের অধীনে তাঁকে বহাল করা হয়। ইপিআরে ওসমানীই প্রথম অবাঙালি নিয়োগ বন্ধ করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে মিলিটারি অপারেশনের ডেপুটি ডাইরেক্টর পদে এবং ১৯৫৭ সালে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৬১ সালে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র মনোনীত হন এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিবেচনা ও তৎসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালের ১৬ মে ওসমানী অবসরকালীন ছুটিতে নেন এবং ১৯৬৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।
ওসমানী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের প্রবক্তা। পাকিস্তান আমলে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে গড়ে তোলেন এবং এই রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্তাদের চেষ্টা বারবার প্রতিরোধ করেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাত্র দুটি ব্যাটালিয়নকে তিনি ছয়টিতে উন্নীত করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের সংখ্যা শতকরা ২ ভাগে উন্নীত করতে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৭০ সালের জুলাইয়ে ওসমানী রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ওই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ৪টি থানা (বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ) সমন্বয়ে গঠিত আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কর্নেল ওসমানী মুক্তিযুদ্ধে একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী ও একটি গেরিলা বাহিনী (গণবাহিনী) গড়ে তোলেন। চরম বিপর্যয়ের মোকাবিলায় অসীম সাহস, ধৈর্য ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি একটি সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেন। জাতির প্রতি তাঁর চরম ত্যাগ এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে ’৭২ সালে জেনারেল পদে উন্নীত করেন। ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসরে যান এবং বাংলাদেশের গণপরিষদের সদস্য হিসেবে পরিষদে যান।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ও আজীবন গণতন্ত্রী ওসমানী ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য একটি সুষ্ঠু ও সুদক্ষ নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জেনারেল ওসমানী সিলেটের বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে ৯৪ ভাগ ভোট পেয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। মন্ত্রী হিসেবে তাঁকে আগের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কয়েক মাসের জন্য ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগ সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল করার প্রাক্কালে ওসমানী প্রতিবাদ জানিয়ে আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এবং মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হতে অনুরোধ করলে জেনারেল ওসমানী মন্ত্রীত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। সে সময় খন্দকার মোশতাক সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এবং দেশের সংকটময় মুহূর্তে তাঁর সহায়তা চাইলে তিনি আনুগত্যের শপথ না নিয়ে অবৈতনিক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উদ্ভূত-অনাকঙ্খিত পরিস্থিতি এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষা ও দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচাতে, সেই সঙ্গে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তের ত্রাণকর্তা হিসেবে জেনারেল ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আজীবন সংসদীয় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও কল্যাণের অনুসারী জেনারেল ওসমানী ১৯৭৬ সালে ‘জাতীয় জনতা পাটি’ গঠন করেন। ’৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে এবং ’৮১ সালে জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জাতি সেই দুই নির্বাচনে তাঁর সেই পরাজয়কে মনে রাখেনি, মনে রেখেছে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক আপসহীন যোদ্ধার কথা। এরপর থেকে ১৯৮২ সালে লে. জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করার পর তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে আর জড়াননি।
জেনারেল ওসমানী জীবনের শেষ দিনগুলোতে নানা রোগে আক্রান্ত হন। ’৮৩ সালের ডিসেম্বরে চিকিৎসার জন্য যান লন্ডনে। আর এই যাত্রাই হলো তাঁর শেষ যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বিশিষ্ট সমরনায়ক, প্রাজ্ঞ, সৎ আপসহীন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাশীল জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তের ত্রাণকর্তা জেনারেল এম এ জি ওসমানী ৬৬ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের একটি হাসপাতালে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে চিরদিন মনে রাখবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীকে। মৃত্যু তাঁর নশ্বর অস্তিত্বকে বিলীন করলেও জাতির ইতিহাসে অনির্বাণ হয়ে থাকবে তাঁর সততা, নীতি নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা, সময়ানুবর্তিতা, অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের প্রতি উৎসর্গীকৃত তাঁর মহৎ জীবন ও অনুকরণীয় জীবনাদর্শ।
বঙ্গবীর ওসমানী জানতেন, তাঁর মৃত্যুর পর একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে সমাহিত করা হবে রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু তাঁর একান্ত ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তিনি সমাহিত হবেন মায়ের কবরের পাশেই। তাঁর এ অন্তিম আগ্রহের কথা তিনি স্বজনদের কাছে ব্যক্ত করেন মৃত্যুর আগেই। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হজরত শাহজালাল (র.) কবরস্থানে তাঁর মায়ের কবরের পাশে ১৯৮৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সমাহিত করা হয়।
লেখক: সাংবাদিক, লেখক-গবেষক এবং দৈনিক সিলেট সংলাপ-এর সম্পাদক-প্রকাশক।

Hits: 85


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ