fbpx
 

সেদিন একজন মেজরের বাঁশির ফুঁ’তেই সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল

Pub: রবিবার, মার্চ ৮, ২০২০ ৫:১৮ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবেই স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন ২৬ মার্চ,১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ডে বর্ণিত জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটি এভাবে উল্লেখ আছে।

“Dear fellow freedom fighters, I, Major Ziaur Rahman, Provisional Persident and Commander-in-Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal for joining our liberation struggle, Bangladesh is independent. We have waged war for liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from occupation of Pakistan Army. Inshallah, victory is ours.

সেই দুঃসময়ে বাঙালি জাতি ছিল দিশেহারা, দিকনির্দেশনাহীন। ঠিক এ সময়ে মেজর জিয়ার প্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠের ঘোষণা ছিল তুর্যধ্বনির মতো। প্রথম ঘোষণায় তিনি নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। তার এ ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ভারতের ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দলিলেও এটি রয়েছে।

প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক সচিব মঈদুল হাসান তরফদার লিখেন, ‘২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তার প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ’রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।’ (মূলধারা : ৭১, পৃষ্ঠা ৫)। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মেজর জিয়া শেখ মুজিবের নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বললেও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আগেকার ঘোষণা সংশোধন করেননি।

মেজর রফিক-উল-ইসলাম বীর উত্তম, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) তার লেখা A Tale of millions গ্রন্থের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ২৭ মার্চের বিকালে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা করেন। পরে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কেন তিনি মত পরিবর্তন করেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মেজর রফিক-উল ইসলাম। একজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে রাষ্টপ্রধানরূপে ঘোষণা দিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র (polical character of the movement ) ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য এই গণ-অভ্যুত্থান সামরিক অভ্যুত্থান রূপে চিত্রিত হতে পারে, এই ভাবনায় মেজর জিয় পুনরায় ঘোষনা দেন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। এই ঘোষণা শোনা যায় ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত্ম। (Rafio-ul-Islam, A Tale of millions, Dhaka. BBI, ১৯৮১)। ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম সফিউলস্নাহ বীরউত্তম, তাঁর Bangladesh at war (Dhaka Academy Publishers, 1989) গ্রন্থে , ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন : মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা করেন।

মেজর কে এম সফিউল্লাহ আরো লিখেন, জিয়াউর রহমান তার ঘোষণায় আরো বলেন, ‘আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরব না, বরং বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তানরূপে (স্বাধীনতার জন্য) প্রাণ দেব। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং গোটা পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর, বরিশাল, খুলনায় অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। মেজর সফিউল্লাহর মতে, এই ঘোষণা দেশে এবং বিদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করে। যারা ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধে রত ছিলেন এই ঘোষণা তাদের নৈতিক বল ও সাহসকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। অন্যরাও এই যুদ্ধে শামিল হন।

মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া লিখেছেন, জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু পরে আরেকটি ঘোষণা দেন যে, এটা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে। এছাড়াও ড. আজিজুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম এবং অন্য আরো অনেকেই তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, জিয়া প্রথম দিনের ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

কর্নেল অলি আহমদ, বীর বিক্রম, অক্সফোর্ড বুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থে রাষ্ট্র বিপ্লব : সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৮) বলেছেন, মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (মুখবন্ধ)। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার সময় তিনি মেজর জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন।

জিয়া একাত্তরের ২৬ মার্চ রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গররত অবস্থায় একটি জাপানি জাহাজ থেকে অস্ট্রেলিয়া রেডিওতে জিয়ার ঘোষণার বার্তাটি পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া রেডিও জিয়ার ঘোষণাটি প্রথম প্রচার করে। এরপর বিবিসিতে প্রচারিত হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে।

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থে দেয়া সাক্ষাত্কারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বলেন, মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে এসে প্রথম যে ঘোষণাটি দিলেন, সে ঘোষণায় তিনি নিজেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

স্বাধীন বাংলা বেতারের একজন শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ। সেই সন্ধ্যার ঘটনা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমান যে খসড়াটি তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি নিজেকে প্রভিশনাল হেড অব বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। খসড়াটি নিয়ে তার সঙ্গী ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে আলোচনার সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। মেজর জিয়াউর রহমান আমার মতামতও চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আপনার মতো আর কেউ আছে কি-না, মানে সিনিয়র অফিসার তা জানার উপায় নেই। বিদেশের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার জন্য আপনি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সামরিক বাহিনীর প্রধান অবশ্যই বলতে পারেন। ঘোষণাটি প্রচারের সময় ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে’ শব্দগুলো উল্লেখ করা হয়নি। বেলাল মোহাম্মদ আরো লিখেছেন, একটি এক্সারসাইজ খাতার পাতায় জিয়াউর রহমান এই ভাষণটি লিখেছিলেন।

পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৭০-এর নির্বাচন ইতিহাসের এই সবক’টি বাঁকে শেখ মুজিবের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের ভূমিকা এবং কী ছিল মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এটি আলোচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের ভূমিকা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। শেখ মুজিব ওই সময় স্বাধীনতার ‘৭১-এর মার্চ মাসে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুুত ছিলেন কি-না এটা গবেষণার বিষয়। শেখ মুজিব চেয়েছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেতা হিসেবে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়ার পর ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন শেখ মুজিব। এটাই ইতিহাস।

এসব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবেই প্রথমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ইতিহাস মানতে অসুবিধা কোথায়? ইতিহাসে শর্টকাট বলতে কিছু নেই। তারেক রহমান শুধু ইতিহাসের সত্য ঘটনাগুলোই মনে করে দিয়েছেন। ইতিহাস ঘটমান, চলমান, বহমান। কারো আপত্তি থাকলে এটি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। কিন্তু হুমকি-ধমকি বড়ই বেমানান।

সেই বাঁশির ফুঁ’টাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেইসময়ে দেশবাসী কোনও মেজরের বাঁশির ফুঁ’র জন্যই অপেক্ষা করছিল। সেই বাঁশির ফুঁ’তেই বাংলার মানুষ সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

আর বাংলাদেশী বাঙালী জাতির সঠিক ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি ফেরানোর জন্য তারেক রহমানের এই আহ্বান অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক বলেই মনে করি।

লেখকঃ প্রধান সম্পাদক শীর্ষ খবর ডটকম

Hits: 841


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ