fbpx
 

করোনা প্রসঙ্গ ও না বলা কিছু কথা

Pub: বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৯, ২০২০ ১১:০৯ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা নিয়ে এত এত কথা মিডিয়াতে আর সোশ্যাল মিডিয়াতে যে কয়েকবার কিছু বলতে গিয়েও বলতে ইচ্ছে হয় না৷ কয়েকটা পয়েন্ট মনে আসল, বলি।

১. এইটা ঠিক নভেল করোনা ভাইরাস (nCoV or SARS-CoV-2) সংক্রমণে মৃত্যুহার অন্য অনেক ভাইরাসের তুলনায় কম। এমনকি অন্যান্য করোনা ভাইরাস এপিডেমিক যেমন MERS- এ মৃত্যুহার যেখানে ছিল শতকরা ৩৪ ভাগ, SARS এ ১১ ভাগ, বর্তমান প্যানডেমিক-এ তা এর চাইতে অনেক কম। কেবলমাত্র যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা যারা অন্যান্য রোগে ভুগছে তাদেরই মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে। ইতালিতে মৃত্যুহার (৫%) গোটা দুনিয়ার (৩.৪%) চেয়ে বেশি কেননা সেখানে বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা বেশি (৬৫-উর্দ্ধ মানুষের সংখ্যা সেখানে মোট জনসংখ্যার ২৩%)। মৃত্যুহার অপেক্ষাকৃত কম হলেও এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। সারা বিশ্বে যেভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন প্যানডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারী দেখা যায়নি। এ কারণে ঝুঁকির মাত্রা, আক্রান্ত দেশ ও রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক অন্যান্য এপিডেমিকের তুলনায় অনেক বেশি। সেকারণেই আক্রান্ত সংখ্যা ও মৃত্যুহার কমানোর উপায় হলো ননথেরাপিউটিক প্রতিরোধ অর্থাৎ মহামারী ব্যবস্থাপনা ( আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং, কন্টাক্ট ট্রেসিং)। এর জন্য বিজ্ঞানীরা একা কিছু করতে পারবেন না, দরকার সমন্বিত উদ্যোগ।

২. বাংলাদেশে এখনো করোনা ভাইরাস সীমিত পর্যায়ে আছে, যদিও ইতিমধ্যে ১জন মারা গেছে। এখনো জানা যায় নি এই ভাইরাস বিদেশ ফেরত ব্যক্তি বা তার সংস্পর্শে আসা নিকটজন ছাড়া আর কারো মধ্যে ছড়িয়েছে কি না। বাংলাদেশে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু এটা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা কঠিন। উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতার দেশগুলোতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম বলে অনেকে বলছেন। সাধারণত ফ্লু ধরনের ভাইরাল রোগগুলো কম তাপমাত্রায় বেশি ছড়ায়। করোনাসৃষ্ট সার্সও তাই ট্রপিক্যাল দেশগুলোতে বেশি ছড়ায় নাই (The effects of temperature and relative humidity on the viability of the SARS coronavirus, Chan KPeiris JLam S et al., Advances in Virology, 2011)। কিন্তু এই নোভেল করোনাভাইরাস ( nCoV) এর সংক্রমণ-এর উপর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাব নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। এখনো WHO বলছে, নোভেল করোনা ভাইরাস-এর উপর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাব আছে কি না তা নিশ্চিত নয়।

তবে, সম্প্রতি ssrn এ আপলোড করা (৯ মার্চ লিখিত, সর্বশেষ রিভিশন ১৭ মার্চ) গবেষণা প্রবন্ধে (প্রিপ্রিন্ট ভার্সন) চীনের বেইজিং-এর বেইহাং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কম হয়। তারা বলছেন, উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম বা বর্ষা মৌসুমে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার হার কমে যেতে পারে। 
(https://papers.ssrn.com/sol3/papers.cfm?abstract_id=3551767)।
এক্ষেত্রে ভুল বোঝার সুযোগ নাই। ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় করতে বা মেরে ফেলতে অনেক বেশি তাপমাত্রার (৭০ ডিগ্রি) প্রয়োজন হয়। এখানে বলা হয়েছে আবহাওয়া উষ্ণতর হলে কিংবা আর্দ্রতা বেশি হলে ভাইরাস কম ছড়িয়ে পড়তে পারে এমনটাই বলা হয়েছে।

৩. তাই বলে গ্রীষ্মকাল আসছে বলে আমরা পুরো নিরাপদ এমন ভাবার কোন সুযোগ নেই। বিভিন্ন এপিডেমিওলজিকাল স্টাডি বলছে, ভাইরাস সংক্রমণ কেবল আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে না, এটা জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মেডিকেল কেয়ারের গুণগত মানসহ আরো অনেক ফ্যাক্টরের উপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, প্রস্তুতির অভাব, স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, দুর্বল হাইজিন প্র‍্যাকটিস ইত্যাদি এই নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণকে ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

৪. নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে চীনের অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের কাজে লাগতে পারে। WHO-এর প্রতিনিধিদল গতমাসে চীনে গিয়ে এই মহামারী ঠেকাতে চীনের ব্যাপক উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং করোনা ঠেকাতে অন্য দেশের করণীয় সম্পর্কে ৪০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট লিখেছেন। আগ্রহীরা দেখতে পারেন- (https://www.who.int/…/report-of-the-who-china-joint-mission…).

রিপোর্টটিতে মহামারী ঠেকাতে চীনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। দশ দিনে হাসপাতাল নির্মাণ, ব্যাপক করোনাভাইরাস পরীক্ষা, নজিরবিহীন আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি প্রয়োগ, হাজার হাজার প্রশিক্ষত কর্মী আক্রান্ত এলাকায় প্রেরণ, মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চীন যেভাবে পদক্ষেপ নিতে পেরেছে, অন্যান্য দেশ সেভাবে নিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তো আরো নাজুক অবস্থানে।

৫. বাংলাদেশের আরেক বিপদ হলো করোনা টেস্ট করার সরঞ্জামাদি ও এক্সপার্ট জনবলের অপ্রতুলতা। বিশ্বব্যাপী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আরটি পিসিআর-এর মাধ্যমে ভাইরাল আরএনএ এম্পলিফিকেশন করে এই ভাইরাস সনাক্ত করা হচ্ছে। এর সমস্যা হলো এই প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ বেশি লাগে। এছাড়া কেবলমাত্র ভাইরাসের উপস্থিতি থাকা অবস্থাতেই এই পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীকে চিহ্নিত করা সম্ভব। অন্যদিকে সেরোলজিকাল টেস্টের মাধ্যমে কম খরচে কম সময়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তকে চিহ্নিত করা যায়, এমনকি যারা সুস্থ হয়ে গেছেন, তারাও কখনো আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা (অর্থাৎ তার শরীরে ভাইরাস প্রতিরোধী এন্টিবডি আছে কিনা) তাও জানা সম্ভব। এতে কেউ সুস্থ হলেও তার কন্টাক্ট ট্রেসিং এর মাধ্যমেও তার আশেপাশের মানুষের সংক্রমণ কমানোর সম্ভাবনা কমানো সম্ভব। গত ফেব্রুয়ারির শেষে সিঙ্গাপুর এই সেরোলজিকাল কিট আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। (https://www.sciencemag.org/…/singapore-claims-first-use-ant…) একটু আগেই নিউজে দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্রের Biomerica কোম্পানী করোনার এই ধরনের র‍্যাপিড টেস্টিং কিট শিপিং করা শুরু করেছে। (https://apnews.com/Globe%2…/d3558e1662e9a1451d6d0b49cba70dd9)

৬. গত ১৭ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকায় জানা গেল, বাংলাদেশে আরটি পিসিআর-এর মাধ্যমে করোনা ডিটেকশনের মাত্র ১৭৩২টি কিট আছে। আজ চীন আরো ৫০০ কিট দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল।

এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. বিজন কুমার শীলের (যিনি এর আগে সার্স ডিটেকশন কিট তৈরি করেছিলেন) নেতৃত্বে বাংলাদেশে সেরোলজিকাল কিট তৈরি করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই কিট তৈরির গবেষণাদলের অন্যতম একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.নিহাদ আদনান(Nihad Adnan), যিনি ঢাবিতে একাডেমিকালি আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে উনার সাথে আমি আমার মাস্টার্সের থিসিসে কাজ করতে পেরেছি, এবং আমার আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধের গবেষণাকাজটি উনার ডিজাইনেই করা।প্রচন্ড ইনোভেটিভ এবং সরল মনের নিবেদিতপ্রাণ এই গবেষকের কাছে জানলাম, সরকারের অনুমতি ও সহযোগিতা পেলে মাসখানেকের মধ্যেই তারা এই কিট তৈরি করতে পারবেন এবং খুব কম খরচে এই টেস্ট করা সম্ভব। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভালো একটি খবর। সরকারের প্রতি আহ্বান, এই কিটটি তৈরিতে তারা যেন দ্রুত এই গবেষণাদলটিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেন৷ (একটু আগে জানলাম সরকার গণস্বাস্থ্যকে কিট উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে)

৭. বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে কি কি ত্রুটি ছিল বা আছে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা পরেও করা যাবে, আপাতত দরকার এই নভেল করোনাভাইরাস ঠেকাতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। করোনা কাউকে ছাড়বে না, সুতরাং সকলকেই যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন হতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্টদেরও বুঝতে হবে তাদের উদ্যোগের গাফিলতি বা ত্রুটি তাদের বা তাদের নিকটজনের জীবনকেও হুমকিতে ফেলে দেবে।

এ সময়ে অনেক গুজব ছড়াবে। আমাদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের সাধারণ করণীয় সম্পর্কিত তথ্যের জন্য খুব বেশি গুগল করার দরকার আছে বলে মনে হয় না, নতুন চালু হওয়া একটি সরকারি ওয়েব (http://corona.gov.bd/), আইইডিসিআর (https://www.iedcr.gov.bd/) বা ডব্লিউএইচও-(https://www.who.int/) এর ওয়েবসাইটেই দরকারি তথ্য পাওয়া যায়।

৮. বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মোকাবিলায় তথাকথিত পরাশক্তিদের করুণ অবস্থা আমরা দেখছি। সম্ভাব্য যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে জনগণের পয়সায় ‘প্রতিরক্ষা’র নামে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও, মহামারি মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অণুজীববিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগেও ভাইরাসসৃষ্ট মহামারিতে এত এত মানুষের মৃত্যু, জনদুর্ভোগ, অর্থনীতিতে এত বিশাল প্রভাব প্রমাণ করে মহামারীসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় এই দুনিয়া এখনো প্রস্তুত নয়, বাংলাদেশের মত দেশগুলোতো আরো পেছনে পড়ে আছে। এই প্যানডেমিক গোটা দুনিয়ার মানুষের জন্য, আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট শিক্ষা হয়ে থাকবে।

[লেখক: অভিনু কিবরিয়া ইসলাম। লেখা লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহিত]

Hits: 122


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ