বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ উত্তরণে প্রয়োজন গণতন্ত্রের চর্চা

Pub: Saturday, October 3, 2020 8:55 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফারাহ মাসুম॥
বাংলাদেশকে রাজনীতিহীন করে ক্ষমতাকে স্থায়ী করার আয়োজনের ফলে এক সর্বগ্রাসী পরিণতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন অবক্ষয়, অনাহুত বিষয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির চাপ এবং জাতীয় সিদ্ধান্তে অরাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক প্রভাব।
দেশে শিক্ষাঙ্গন থেকে রাজপথ পর্যন্ত একসময় মানুষের ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রকাশের রাজনৈতিক স্পেস ছিল। আদর্শকেন্দ্রিক রাজনীতির গঠনমূলক চর্চা ছিল শিক্ষাঙ্গনগুলোয়। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাত্রদের দাবি-দাওয়া জানানোর একটি ব্যবস্থাও ছিল। এসবের পরিবর্তে শিক্ষাঙ্গনগুলোয় এখন এমন এক কর্তৃত্ববাদ ও মাস্তানতন্ত্র চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, যে পরিবেশে গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতির কোনো অবকাশ আর অবশিষ্ট নেই। সরকারবিরোধী কোনো সংগঠন সভা-সমাবেশ করলে তাদের ওপর সন্ত্রাসী ও পেটোয়া বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তাদের লালন করার জন্য সুযোগ দেয়া হয় টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং অনৈতিকতা চর্চার। এই পরিবেশ শিক্ষাঙ্গনগুলোয় এক ধরনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করেছে। শিক্ষার পরিবেশকে আরো অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে দলকানা শিক্ষক নিয়োগে। দলীয় পরিচয় শিক্ষক নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড হবার ফলে শিক্ষার মান কমতে কমতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়েছে।
রাজনীতিহীনতা শুধু শিক্ষাঙ্গনকে অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এমন নয়, দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও গঠনমূলক ইউনিয়ন চর্চার স্থান করে নিয়েছে জবরদস্তিতন্ত্র। সরকার সমর্থক ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা সবকিছু পণবন্দি করে রাখার ফলে একদিকে উৎপাদনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম এক প্রকার হারিয়ে গেছে। এর পরিণতিতে দেশে সরকারি খাতের কলকারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি পাটকলগুলো সরকার ঘোষণা দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ এখনো বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
রাজনীতির ক্ষেত্রে বিরোধী দলের গণতন্ত্র চর্চার যে কোনো অবকাশকে একপ্রকার বিদায় করে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার একটি ঐতিহ্য একসময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণ মোটাদাগে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট নিয়ে নির্বাচন করতে পারতো। এখন আর সে অবস্থা নেই। আগের রাতেই নির্বাচন হয়ে যায়। এতে ভোটের অবস্থা দাঁড়ায় বিজয়ী প্রার্থী পায় ৩ লাখ আর পরাজিত প্রার্থী ৩ হাজার। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত। একই সাথে রাজপথে সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ পুলিশের অনুমতি দেয়ার নামে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সরকারের পছন্দের রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য দলকে কোনো কর্মসূচি সেভাবে পালন করতে দেয়া হয় না। অনেক রাজনৈতিক দল তাদের কার্যালয় পর্যন্ত খুলতে পারে না। এই অবস্থায় এক অবরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক অন্তঃপ্রাণ মানুষ। টানা তৃতীয়বারের মতো তিনি ক্ষমতায় আছেন। কিন্তু রাজনীতির চেয়ে তিনি এখন প্রশাসনেই বেশি মনোযোগী। করোনা সঙ্কট, বন্যা মোকাবিলাসহ ইত্যাদি নানা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি রাজনীতির চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন প্রশাসনের ওপর। আর এ কারণেই বিরোধী রাজনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিহীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকারি দলও এখন একপ্রকার অপাঙক্তেয় হতে বসেছে। দলের প্রবীণ নেতারাও এখন গুরুত্ব পাচ্ছেন না সেভাবে।
একসময় দেশের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা অন্য যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় রাজনৈতিক দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলো জনগণের সেবায় নেমে পড়তো। দেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো তাদের সহযোগিতা নিয়ে দুর্গতদের কাছে পৌঁছে যেতো। এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্যোগের সময়ও জনগণের পাশে দাঁড়াতে বাধা দেয়ার ফলে আর সে ধরনের কোনো তৎপরতা নেই। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এমনকি শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ত্রাণ বিতরণের মতো টুকটাক রাজনৈতিক যে কর্মসূচি করছেন, যেগুলো আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক সংগঠনের বিচারে অত্যন্ত স্বল্প। তাও দেশ জুড়ে এই কার্যক্রম হচ্ছে না। এতে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোও একরকম স্থবির হয়ে আছে। টুকটাক কিছু ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই সহযোগী সংগঠনগুলোর। অনেক সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও ঘোষণা করা হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র মনে করা হয় ঢাকাকে। ঢাকা মহানগরে আওয়ামী লীগের দুটি শাখার সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। এরকমভাবেই আওয়ামী লীগ ক্রমশ রাজনীতিহীন হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি যেমন দলীয় কার্যক্রমের চেয়ে দেশের সঙ্কট মোকাবিলায় ব্যস্ত, তেমনি দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যস্ত কিছু ভিডিওবার্তা দেওয়া নিয়ে। এই ভিডিওবার্তা ছাড়া তার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান নয়।
সরকারপন্থী এক পোর্টালে রাজনৈতিক তৎপরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের কিছু এতিম রাজনৈতিক নেতাÑ যারা গত নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি, মন্ত্রিত্বও পাননি, তারা আগলে রাখছেন আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়। তাদের কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি এবং সীমিত আকারে সামাজিক দূরত্ব মেনে কর্মসূচি আর অপ্রকাশ্যে হা-হুতাশ হাহাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির একমাত্র উপজীব্য। আওয়ামী লীগ নেতারাই এখন স্বীকার করেন, সারা দেশ রাজনৈতিক সংগঠনহীন হয়ে পড়ছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহের চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের আগ্রহই অনেক বেশি। এর মধ্যে রয়েছে অনুপ্রবেশকারীদের উৎপাত।’
আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা অব্যাহত নিষ্পেষণে থাকা বিরোধী দল বিএনপির। আওয়ামী লীগের তাও কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। বৃক্ষরোপণের মতো টুকটাক কিছু নির্জীব কর্মসূচির মধ্যে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। কিছু কিছু কর্মী দলকে জীবিত রাখার জন্য নানারকম চেষ্টা-কসরত করছেন, কিন্তু বিএনপির সামনে সেটা করারও সুযোগ নেই। সংগঠন হিসেবে বিএনপিকে একপ্রকার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয়। লন্ডনে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া জেল থেকে বেরিয়ে নানা শর্তের বেড়াজালে ঘরবন্দি হয়ে আছেন। ঈদ এবং পালা-পর্বণ ছাড়া তিনি নেতাকর্মীদের দেখা-সাক্ষাৎ দেন না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ঘরোয়া কার্যক্রমের বাইরে কিছু করার অবকাশ কম। দলীয় কোনো কর্মসূচি করলেই মামলার হিড়িক পড়ে যায়। একেকজন নেতার নামে শত শত মামলা।
প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের যখন এরকম বেহাল দশা, তখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থাও অনুমান করা যায়। জামায়াতে ইসলামীকে প্রকাশ্য কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয় না। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি আছে কি নেই, সে ধরনের অবস্থা দলীয় কার্যক্রমে। জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের দলকে গতিশীল করার জন্য তেমন কিছু করতে পারছেনÑ এমনটি দেখা যায় না।
এরকম একটা বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি রাজনীতিহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিবিদদের চেয়ে এখন বেশি সরব দেখা যাচ্ছে গার্মেন্ট মালিকসহ ব্যবসায়ী-আমলাদের। রাজনৈতিক সরকারে আমলা এবং ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও তারা নিচ্ছেন। একই সাথে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অজ্ঞাত কোনো স্থান থেকে নেয়া হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন।
মোদ্দাকথা হলো, দেশে কোনো রাজনীতি নেই। রাজনীতির অর্থ হলো, রাজনৈতিক আদর্শ বা রাজনৈতিক চিন্তা সরকারের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হবে। এখন সরকারের কার্যক্রমে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতির অর্থ হলো, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে বিকল্প কর্মসূচি দেবে। তেমন কিছু এখন দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতির অর্থ হলো, জনগণের মাঝ থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব ভবিষ্যতের জন্য কর্মপন্থা দেবে এবং জনআকাক্সক্ষাগুলো সংসদসহ বিভিন্ন জায়গায় তুলে ধরবে, তেমন কিছু নেই। ফলে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে যে বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্র চলছিল, সেই ষড়যন্ত্রের নীরব বাস্তবায়ন বাংলাদেশে হয়েছে কিনা, সেটি নিয়েই এখন আলোচনা হচ্ছে। কারণ যখন একটি দেশ রাজনীতিশূন্য হয়ে পড়ে, তখন জনগণ হয়ে পড়ে অধিকারহীন। আমলা কিংবা ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেন। সেরকম একটি রাজনীতিহীন রাষ্ট্রেই পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ।
সাধারণভাবে কোনো দেশকে রাজনীতিহীন করে ফেলা হলে অথবা দেশের সরকার জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতায় থাকলে অথবা তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে বৈধতার সংকট দেখা দিলে বাইরের শক্তিগুলোর প্রভাব বেড়ে যায়। এখন সেটিই দেখা যাচ্ছে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামনে সরকারের অসহায়ত্ব প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চাপ আসছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অবৈধ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বাধ্য করার চেষ্টা হচ্ছে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি এবং সীমান্ত উত্তেজনাকে এই চাপের হাতিয়ার করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবেও রাজনৈতিক শক্তির ওপর অরাজনৈতিক শক্তির প্রভাব জেঁকে বসছে। এখন বলতে গেলে সর্বব্যাপী চাপের মুখে এক নজিরবিহীন অবস্থার সম্মুখীন বাংলাদেশ। স্বাভাবিক গণতন্ত্রের চর্চা ছাড়া এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করা কঠিন বলেই মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 131 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ