১২ বছরে অর্ধলক্ষাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার

Pub: Sunday, October 18, 2020 12:29 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘ধর্ষণ’ এক ধরনের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। ধর্ষণের অভিযোগ, বিচার ও শাস্তিপ্রদান বিভিন্ন শাসনব্যবস্থায় বিভিন্ন রকম।

বাংলাদেশে দিন-দিন বাড়ছে ধর্ষণ, বেড়েই চলছে। নারীর প্রতি সহিংসতার এতএত আইন করেও কমানো যাচ্ছে না ঘৃন্য ও বর্বর এই কাজটি।গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দেখলেই তা সহজে অনুমান করা যায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। ২০১৯ সালে হয়েছে ১ হাজার ৩১৩ জন।২০১৭ ও ১৮ সালের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷ ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী। ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির শকিার হয়েছে ১৭০ জন , ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৫৮ জন।আশঙ্কাজনক হারে প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে নারী ও শিশু নির্যাতন। নারী ও শিশুর প্রতি নির্মমতা ও ন্যক্কারজনক নির্যাতনে হতবাক দেশের বিবেকবান মানুষ। এ হিংস্র ছোবল থেকে বাদ যাচ্ছে না বয়স্ক নারী থেকে শুরু করে চার বছরের কন্যাশিশুও। শুধু তা-ই নয়, ধর্ষণের পর নির্যাতন করে হত্যা করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে এ ধরনের নির্মম ও পৈশাচিক ঘটনা। বিগত দশ বছরে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অর্ধলক্ষাধিক নারী ও কন্যাশিশু। শুধু এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গত চার মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩৪৫ জন।

প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া, প্রশাসনের ব্যর্থতা, তদন্তে ধীরগতি, বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া আইনি দুর্বলতার কারণে অপরাধীরা পার পাওয়ায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। তবে মহামারী আকার ধারণ করেছে ধর্ষণ।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গত চার মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩৪৫ জন নারী ও শিশু। যার মধ্যে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩১০ জন, হত্যাকাণ্ডের শিকার ১৮০ জন, শ্লীলতাহানির কারণে আত্মহত্যা করেছে ১০৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা ১৬ জন, অপহরণ ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার ৯২ জন এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে ১৩১ জনকে। এ ছাড়া ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে মোট ধর্ষণ কর হয়েছে ৮ হাজার ৭০ জন। ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা করা হয়েছে ৮৯২ জনকে, যা প্রতি বছরই বেড়েই চলেছে। ২০০৮ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ সংখ্যা ছিল ৪৩৯ জন। ২০০৯তে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৩৯ জন। ২০১০ সালে আরো বৃদ্ধি পেয়ে ৭০০ জন, ২০১১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০তে। ২০১২ সালে কিছুটা কমে হয় ৬৬৫ জন। কিন্তু ২০১৩ সালে এ সংখ্যার ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে। ওই বছরে ৮৮১ জন, ২০১৪ সালে ৮৪০ জন, ২০১৫ সালে ১ হাজার ৭ জন, ২০১৬ সালে ১ হাজার ৬ জন এবং ২০১৭ সালে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৯৩ জনে। এ বছরে গত চার মাসে ২৪৮ জন নারী ও শিশুকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।
২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৫৫ জনকে ও হত্যা করা হয়েছে ৩ হাজার ৯০০ জনকে। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ১২৯ জন, গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা করেছে ৬৮ জন ও গৃহপরিচারিকা হত্যা ১৫২ জন। যৌতুকের কারণে হত্যা ১০৩৭ জন ও বাল্যবিয়ে ৬২৮। এ ছাড়া শ্লীলতাহানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার জন নারী। এর আগে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা ৭১ জন; গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা ১৮ জন; গৃহপরিচারিকা হত্যা ১৩০ জন; বাল্যবিয়ে ৩২৯ জন। এ সংখ্যা পরবর্তী সময়ে কোনটি দুইগুণ আবার কোনটি চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কমে এসেছে নারী ও শিশু পাচার। ২০১৩ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত পাচার হয়েছে ১৭১ জন, যা ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ছিল ৯১৪ জন।
এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে ধর্ষণ বেড়েছে দেড়গুণ; উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা প্রায় দুইগুণ; গৃহপরিচারিকা আত্মহত্যা চারগুণ; বাল্যবিয়ে দ্বিগুণ। আর বিগত দশ বছরে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার নারী ও কন্যাশিশু।

১২ বছরে বাংলাদেশে ধর্ষণের পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ পুলিশ: গত বছর ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছর ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): আসকের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে। গত বছর সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার ১ হাজার ৪১৩ নারী ও শিশু। ২০১৮ সালে সংখ্যাটি ছিল ৭৩২।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন: গত বছর ৯০২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৫৬।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম: ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। গত বছর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। ২০১৮ সালের চেয়ে গত বছর শিশু ধর্ষণ ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন এক হাজার ২০৪ নারী। যেখানে ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ নারী ধর্ষণ, ২০১৮ সালে ৭৩২ জন এবং ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ নারী। বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা কেমন আছে, তা জানার জন্য প্রায় ৫০টির মতো জেলা ও প্রায় ১১০টি সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’। ২০২০ সালের এপ্রিল-জুলাই চারমাসে দেখা যায় ৪১ হাজার ৯৫৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়। ২০১৯ ও ২০১৮ সালে সারা দেশের জেলা ও সহযোগী সংগঠনের এই তথ্যগুলো পাওয়া যায়নি। তবে মূলধারার গণমাধ্যমের আটটি পত্রিকা থেকে নেয়া তথ্য মতে ২০১৯ সালে শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এমন সংবাদ প্রকাশ পায় তিন হাজার চারটি, ২০১৮ সালে দুই হাজার চার শত ৪৪টি এবং ২০১৭ সালে দুই হাজার ৯শ’ ৭৩টি। বাংলাদেশের প্রায় মূলধারার ১৫টি গণমাধ্যম থেকে শিশু নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করে ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’। তাদের মতে, ১লা জানুয়ারি থেকে ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার প্রায় দুই হাজার ৪৫৯ শিশু।

যেখানে মার্চ থেকে ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৯০২ জন। যেখানে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে দুই হাজার ২৬ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রথম ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনে মামলা হয়েছে এক হাজার ৮০টি। যেখানে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মামলা হয় এক হাজার ১৯টি।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২জন৷ অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷

২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী৷ এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০জন নারী৷

নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ৷ ২০১৯ সালে যৌন হয়ানারীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৭০ জন৷

২০১৯ যৌন হয়রানীর শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন৷ প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন৷ যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷

গত বছর যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৬৭ জন নারী৷ তাদের মধ্যে নির্যাতনে নিহত হন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন তিনজন৷ আর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ৪২৩ জন নারী৷

ধর্ষণ ঘৃণ্য অপরাধ। এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি এই আইন করা হয়েছে । অথচ আমাদের দেশে এই ঘৃণ্য অপরাধটাই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই, প্রতিরোধ নেই, নেই আইন কার্যকর করার কোনও বিশেষ ব্যবস্থা। ক্ষমতার দাপট, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচার প্রক্রিয়া নারীবান্ধব করতে না পারাসহ সামাজিক-রাজনৈতিক উদাসীনতার সুযোগে ধর্ষকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর আগে খাগড়াছড়িতে ডাকাতি করতে ঘরে ঢুকে প্রতিবন্ধী এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, নারীরা স্বামীর সঙ্গে থাকলেও নিরাপদ নয়, এমনকি ঘরে থাকলেও নয়। নারী আজ ছাত্রলীগ, অচেনা দুর্বৃত্ত, এমনকি পুলিশের কারণেও নিরাপত্তাহীন!

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে, অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে যাদের রুখে দাঁড়ানোর কথা, প্রতিবাদ করার কথা, ক্ষমতাসীন দলের সেই নেতাকর্মীরাই এই ধর্ষণের মচ্ছবে তাল মেলাচ্ছেন। নিজেরাই ধর্ষক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ক্যাম্পাসে ধর্ষণ বা দলগত ধর্ষণের ঘটনা গত তিন দশক ধরেই ঘটছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠে। তারা এতটাই বেপরোয়া থাকে যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে—এমনটি তারা মনে করে না। তাইতো তারা স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের দুঃসাহস দেখায়। ১৯৯৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলগত ধর্ষণ করে ছাত্রদল নেতা সীমান্ত, মিতুল ও জাপানসহ কয়েকজন। পরিসংখ্যান বিভাগের সামনের জঙ্গলের মধ্যে তারা গণধর্ষণ করে।

১৯৯৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনায় দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরির স্বঘোষিত ঘোষণায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই মানিক বিএনপি আমলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সেসময় প্রায় ছয় মাস বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে। আন্দোলনের একপর্যায়ে মানিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর আর মানিককে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এরপর ২০০০ সালে থার্টি ফার্স্ট নাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাঁধন নামে এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়। তখনও ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই থার্টি ফার্স্ট নাইটে ছাত্রীদের হলের বাইরে আসা বন্ধ করা হয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও কোনো তরুণীকে থার্টি ফার্স্টের কর্সূচিতে অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

২০১৭ সালে মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম জাহিদ মাহমুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন ছাত্রলীগ নেত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্রী জাহিদ ছাড়াও মুজিবুর রহমান অনিকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।

যার ক্ষমতা আছে সে এক ধরনের বিচারহীনতার সুবিধা ভোগ করে৷ সেই সুবিধা তাকে নানা অপকর্মে প্ররোচিত করে৷ এর মধ্যে ধর্ষণ একটি৷ এর জন্য বর্তমান অবক্ষয়গ্রস্ত দলীয় রাজনীতি সবচেয়ে বেশি দায়ী। ক্ষমতার সুবিধা নিতে দলে দুর্বৃত্ত-অপরাধীরা নেতৃত্বের আসন পর্যন্ত বাগিয়ে নেয়। যখনই কারো অপরাধের খবর ফাঁস হয়ে হয়ে যায়, তখন বলা হয়, সে আসলে আমাদের দলের কেউ নয় অথবা অনুপ্রবেশকারী। এটা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। ক্ষমতায় থাকা একটা দলের কেউ যখন খুন-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে, তারপরও দল লজ্জিত হয় না। কোনো অনুতাপও দেখা যায় না। দলে যেন এ ধরনের দুর্বৃত্তরা স্থান না পায়, সে ব্যাপারে সতর্কতা ও কঠোর অঙ্গীকারও দেখা যায় না। আসলে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাই পচে গেছে। যে রাজনীতি মানুষকে স্বপ্ন দেখাবে, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, মানুষের পাশে থাকবে— তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে, খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করছে। আসলে পুরো রাজনীতিই বর্তমানে দুর্বৃত্তকবলিত হয়ে পড়েছে। অপরাধীদের প্ল্যাটফরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন। যেকারণে মাদক ব্যবসা, অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অর্থপাচার, খুন, রাহাজানির অভিযোগে তারা গ্রেফতার হন, ধর্ষণের ঘটনায় আসামি হন। আজ আদর্শিক চর্চা নেই বলেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দুর্বৃত্তরা একের পর এক ধর্ষণ ঘটাচ্ছে।

আর আমাদের জাতীয় নেতারা পরম যত্নে এই দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কারখানটাকে চালু রেখেছেন। নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য যেখানে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার কথা, সেখানে তারা এই কাজটি না করে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন, তাদের অপরাধ মুছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন। প্রখ্যাত ইয়াবা ব্যবসায়ী হন সেলিব্রিটি নেতা, জাহাঁবাজ মাফিয়া গডফাদাররা পর্যন্ত বড় কোনো অপরাধ না ঘটালে দলের সদস্যপদও হারান না। এমনকি ধরা পড়লেও আইন-আদালত-প্রশাসন তাদের পক্ষেই ভূমিকা পালন করে। এই দুর্বৃত্তরাই রাজনৈতিক দলের হাত ধরে সাদা পাঞ্জাবি পরে একদিন জনপ্রতিনিধি হয়ে যান। সব বড় রাজনৈতিক অপরাধীর প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে এমন অনেক লুকানো অপরাধের গল্প, নষ্ট রাজনীতির পাপ!

যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। ধর্ষণের ফলে শুধু একটি নারীই ধর্ষিত হয় না, ধর্ষিত হয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র সমাজ। কারণ, ধর্ষণ মানবতার অপমান। পুরো সভ্যতার জন্যই মানহানিকার। খুনের ক্ষমা আছে, ধর্ষণের নেই৷ অপরাধ স্বীকার করলে খুনিকে ক্ষমা করা যেতে পারে৷ তার সংশোধনের সুযোগও গ্রাহ্য৷ ধর্ষণকারীর বেলায় সেটা খাটে না৷ কঠোরতম শাস্তি তাকে পেতে হবে৷ দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন এ কথাই ঘোষণা করেছে৷

কী করলে ধর্ষণের সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়? সে আলোচনার গোড়াতেই ঝাড়ু-বোলানো কথাগুলো বাদ দেওয়া দরকার। ‘সমাজ না বদলালে অবস্থা বদলাবে না’ আর ‘কোনও দিন ধর্ষণ কমবে না’ এ দু’টো একই কথা। দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, হাড়-শয়তানদের সমাজেও সুশাসন সম্ভব। এই সমাজেও ধর্ষণ কমানো যাবে, যদি যথাযথ বিধিব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। আর তা করতে চাইলে ভাবতে হবে, কেন ধর্ষণের ঘটনাগুলোর দ্রুত বিচার হয় না।

আমাদের থানা, পুলিশ, আইন, তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া কোনো কিছুই নারীর প্রতি সংবেদনশীল নয়। বরং তা অনেকটাই ধর্ষকবান্ধব। প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী নারীকেই ধর্ষণ-প্রমাণের যাবতীয় দায় বহন করতে হয়। ভুক্তভোগীর প্রতি অশালীন মন্তব্য, সাক্ষ্য সংগ্রহে গাফিলতি, তদন্তে দেরি, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে অথবা ভুক্তভোগীর কাছে টাকা না পেয়ে মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল ইত্যাদি নানা অসংগতি রয়েছে। বিচার পাওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটিই এমন জটিল করে রাখা হয়েছে যাতে মেয়েটি ভয় পেয়ে, হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। এসব নিয়ে গত তিন দশক ধরে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে, অনেক সুপারিশ-বিধি-পদ্ধতি জারি করা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ তাতে কমেনি। ধর্ষকের শাস্তিও নিশ্চিত করা যায়নি।

আমরা চাই অবিলম্বে ধর্ষণের মহামারী বন্ধ হোক। সরকারের প্রথম এবং প্রধান এজেন্ডা হোক দেশ থেকে ধর্ষণ বন্ধ করা। এ জন্য সরকারকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা করতে হবে। স্বামী, ভাই, বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিংবা ঘরে ঢুকে নারীকে দলগতভাবে ধর্ষণ করা হবে, আর সরকার বসে বসে আঙুল চুষবে, তা হতে পারে না, হতে দেয়া যায় না।

সম্প্রতি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যদন্ড আইন পাশ হয়েছে,আশা করি আইনটির যথাযত প্রয়োগ হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।আইনটি ধর্ষনের আগ্রাসন থেকে আমাদের মা বোন ও কমলমতি শিশুরা নিরাপদ থাকবে।

লেখকঃ প্রধান সম্পাদক
শীর্ষ খবর ডটকম


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়া হয়েছে 218 বার

Print

শীর্ষ খবর/আ আ