বাংলাদেশ ও কভিড-১৯: বিপর্যয়ের ভেতরে বিপর্যয়

Pub: সোমবার, জুন ২২, ২০২০ ৮:১২ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাবরিয়া চৌধুরি বাল্লান্দ

“পৃথিবী মন্দ লোকদের জন্য ধ্বংস হবে না, যারা মন্দদের কর্ম দেখেও কিছু করে না তাদের জন্য হবে।”- আলবার্ট আইনস্টাইন।
কভিড-১৯ মহামারির বিস্তার থামাতে ফের লকডাউন জারি ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের হাতে আপাতদৃষ্টিতে আর কোন উপায় নেই। ফের লকডাউন জারির প্রয়োজন দেখা দেয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রথম লকডাউনে সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনার দায়। আগেভাগে অর্থনীতি সচলের সিদ্ধান্তের প্রত্যাশার বিপরীত পরিণতি টেনে এনেছে।
দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন কৃষি থেকে শুরু করে উৎপাদন, তথ্য, হোটেল, পরিবহণ ও পর্যটন বহু খাতের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। চাকরি হারিয়েছে ১০ লাখ পোশাকশ্রমিক। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম অনুসারে, সাধারণত, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জিডিপির ৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে মহামারিটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনের কঠোর প্রভাব ফেলেছে। তাদের বেশিরভাগই এমন দেশে বাস করে যেখানে জারি করা হয়েছে কঠোর লকডাউন। রেমিট্যান্স কমার পেছনে অন্যতম একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম হ্রাস পাওয়া।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এ অঞ্চলে বাস করে।
বিশ্বব্যাংক অনুসারে, চলতি বছর প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো মোট রেমিট্যান্স ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার হ্রাস পাবে। গত বছরের তুলনায় এ হার ২৫ শতাংশ কম। মাস প্রতি রেমিট্যান্সের নিম্নগামী হার বাংলাদেশের কোটি কোটি পরিবারের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। এসব ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগে। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কি মহামারিটির বিস্তার কমাতে প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের জন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে?
বৃহস্পতিবার অবধি বাংলাদেশে নিশ্চিত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি। বেসরকারি স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের দল সম্প্রতি একটি জরিপ করে দেখেছে যে, দেশের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে তিন জন গুরুতর স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন। দরিদ্ররা কাজ হারিয়ে আরো খারাপ অবস্থার মুখে পড়ছেন।
ওই জরিপ অনুসারে, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন থাকা ১০ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার মানুষ চরম দারিদ্রতার সম্মুখীন। দিন প্রতি তাদের আয় ১৬০ টাকারও নিচে। জরিপে আরো বেরিয়ে আসে যে, এদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে চরম দারিদ্রতা-পীড়িত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। তারা বলছে, তাদের কাছে জমানো অর্থ ফুরিয়ে গেছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) অনুসারে, করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে এখন অবধি বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার দ্বিগুণ হয়ে থাকতে পারে। শতকরা হিসেবে এ হার ৪০.৯ শতাংশ। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত গড় পারিবারিক আয় ৭৪ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে।
মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি লোকসানের শিকার হয়েছেন কৃষকরাও। উৎপাদন কমে গেছে ব্যাপক হারে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগই আসে এই খাত থাকে। ৪০ লাখের বেশি পোশাককর্মীর জীবিকা এই খাতের উপর নির্ভর। এই শিল্পের ধস নামায় আঘাত পড়েছে তাদের জীবনেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অর্ডারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১০০ কারখানা। কাজ হারিয়েছেন ২০ লাখের বেশি পোশাককর্মী। অন্যদিকে, বেড়েছে খাদ্য, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম।

সম্প্রতি দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) মহামারি মোকাবিলায় সরকারের অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেছে। তারা বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার উল্লেখিত খাতগুলোয় ব্যর্থ হয়েছে: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা, পর্যাপ্ত হাসপাতাল সেবা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগীদের সেবা দেয়া, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও ভেন্টিলেটর সরবরাহ, স্বস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ, কর্মসংস্থান হারানো ৫ কোটি দিনমজুরের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা, মৌলিক জিনিসপত্র বিতরণে দলীয় প্রাধান্যতার অভিযোগ, দরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত তহবিল বিতরণে দুর্নীতি, মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মেডিক্যাল সরঞ্জাম ক্রয়ে দুর্নীতি, ভেন্টিলেটর ক্রয়ে স্বচ্ছতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তালিকাটি এখানেই শেষ নয়। চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মধ্যেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষণিকের জন্যও তাদের নজরদারি ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অভ্যাস ছাড়েনি।
তথ্য মন্ত্রণালয় ৩০টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে ‘অপপ্রচার’ নজরদারি করতে একটি সেল গঠন করেছে। যারা আওয়ামী লীগকে চেনে, তারা জানে যে, এটা সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারীদের নজরদারির একটি সংকেত কেবল। মহামারিতে ত্রাণ বিতরণের সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চুরি ও জালিয়াতি নিয়ে প্রতিবেদন করায় ৩৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৬৭টি মামলা দায়ের হয়েছে।
স্বাস্থ্য, নীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার দেশের ভালোর জন্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, পরিচালনা করতে ও সমন্বয় করতে সক্ষম হবে কিনা- সবকিছু বিবেচনায় এটা একটা বাগাড়ম্বরপূর্ণ প্রশ্ন। পারফরম্যান্স বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে নম্বর দেয়া হয়ে, তারা নিশ্চিতভাবেই অনুত্তীর্ণ থাকবে।
যে সরকার ২০০৯ সাল থেকে জনগণের অনুমোদন ছাড়াই জোরপূর্বকভাবে ক্ষমতা দখল করে আছে সে সরকারের কাছ থেকে আর কী প্রত্যাশা করা যেতে পারে? অবশ্যই এ সরকারের মধ্যে কোন জবাবদিহিতা থাকবে না, স্বচ্ছতা থাকবে না, ভোট হারানোর ভয় থাকবে না। সবশেষে, প্রভাবিত করা ব্যতিত আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই।

দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে অন্যকোনো সরকার আসার সম্ভাবনা নেই, সুদূর ভবিষ্যতেও না। কারণ, পরিবর্তন আসার জন্য জনপ্রিয় কোনো ইচ্ছা নেই। পরিবর্তন আওয়ামী লীগের সমালোচনা ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ উক্তির মাঝ থেকে অলৌকিকভাবে হাজির হয় না। এর জন্য প্রয়োজন, আবশ্যিকভাবে একপাক্ষিক কর্তৃত্ববাদীতার মাধ্যমে সৃষ্ট অগণিত সকল সমস্যা চিহ্নিত করা, এরপর সেগুলো সমাধানের চেষ্টা ও চর্চা করা।
বাংলাদেশে ২০০৯ সালের পর থেকে সে জাগরণ হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে: এটা কি হবে, হলে কখন, তখন কি খুব দেরি হয়ে যাবে?
(এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংক্ষেপিত অনুবাদ।)

Hits: 57


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ