fbpx
 

বিমানের লুটপাটের দায় হজযাত্রীদের কাঁধে?

Pub: Saturday, July 14, 2018 2:44 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: এমনিতেই অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে অনেক বেশি। তার উপর আবার প্রতিবছরই বাড়ানো হচ্ছে হজযাত্রীদের বিমানভাড়া। যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা। বাড়তি ভাড়া আদায় হাজযাত্রীদের সঙ্গে এক ধরনের জুলুমও বটে। সর্বশেষ, চলতি বছর হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া আরেক দফা বেড়েছে। এই ভাড়া অন্যান্য সময়ের ভাড়ার প্রায় তিনগুণ। অনেকে বলছেন, বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা কর্মচারীরা সারা বছর যে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করে তা মেটাতেই এ ব্যবস্থা। হজযাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করে বিমানের ঘাটতি মেটানো হয়। কিন্তু বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লুটপাটের দায় কেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে- এমন প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এ নিয়ে শুধু হজযাত্রী ও এজেন্সিগুলোই নয়, খোদ ধর্ম মন্ত্রণালয়ও ক্ষুব্ধ। কিন্তু বিমান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের খামখেয়ালিপনার কাছে অন্যেরা নিরূপায়। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন হাব নেতারা।
জানা গেছে, চলতি বছর হজযাত্রীদের বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা (নিট)। যা অন্যান্য খরচসহ ১৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। অথচ একই সময় ওমরাহ যাত্রীদের বিমানভাড়া ৪৮ থেকে ৫২ হাজার টাকা। ২০১৭ সালে হাজিদের কাছ থেকে বিমানভাড়া নেয়া হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬১ টাকা (নীট)। গত বছরের তুলনায় এবার বিমানভাড়া ৪ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ বিমান। এ সব যুক্তিকে অযৌক্তিক বলছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ হজ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এমনিতেই হজযাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হচ্ছে অনেক বেশি। এখন আবার বাড়ানো হয়েছে। ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারণের যুক্তি ধোপে টিকে না।
প্রথমত- হজযাত্রীদের পরিবহন করা বিমানে সাধারণ যাত্রী একই সময় পাশের সিটে বসে ভাড়া দিবেন ৩৬ হাজার থেকে ৩৯ হাজার টাকা। ওমরাহ পালনকারী যাত্রীর ভাড়া ৪৮ হাজার থেকে ৫২ হাজার টাকা। অথচ একজন হাজীর কাছ থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা আদায় করা কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। বরং এটা বড় ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও জুলুম।
দ্বিতীয়ত, হজযাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বিমান একেবারে খালি আসে না। আর খালি আসলেও সর্বোচ্চ দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫২ হাজারের স্থলে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রায় তিনগুণ ভাড়া আদায়- অনৈতিক খামখেয়ালিপনা ছাড়া কিছুই বলা যায় না।
তৃতীয়ত, হজ মৌসুম ছাড়াও বছরের অন্য সময় ৬০ শতাংশের বেশি যাত্রী পায় না বাংলাদেশ বিমান। অর্থাৎ সারা বছরই গড়ে ৪০ শতাংশ সিট খালি রেখে বিমান ঢাকা-জেদ্দা রুটে চলাচল করে। কিন্তু হজের সময় একবার শতভাগ সিট পুর্ণ করে যায়। ফেরার সময়ও কমপক্ষে ২০ শতাংশ যাত্রী পায়। সেই হিসাবে আসা-যাওয়ার গড় ৬০ শতাংশই দাঁড়ায়। সুতরাং হজযাত্রীর কাছ থেকে এক টাকা বেশি নেয়ারও সুযোগ নেই। আর তেলের দাম যে পরিমাণ বেড়েছে তাতে যাত্রীপ্রতি ৪ হাজার ভাড়া বাড়ে না। এছাড়া সৌদি আরব বিমানের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। কিন্তু হজযাত্রী ভাগাভাগিতে এ সুবিধা পাচ্ছে সৌদিও।
যদিও প্রতিবেশী দেশ- ভারতে ফিরতি টিকিটসহ হজে বিমানভাড়া আগের চেয়েও কমানো হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চলতি বছরের খসড়া হজ প্যাকেজে হজের খরচ আরো বাড়ানো হলো।
‘হজ প্যাকেজ ২০১৮’ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার পবিত্র হজ পালনের খরচ নির্ধারণ করে ‘হজ প্যাকেজ ২০১৮’ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় দু’টি প্যাকেজের মাধ্যমে হজ পালনের বিধান রাখা হয়েছে এ খসড়ায়। ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান জানান, আগামী ১৪ জুলাই বাংলাদেশ থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট সৌদি আরবের পথে রওনা দেবে। এ বছর হজে যেতে আগ্রহীদের জন্য ১ মার্চ থেকে নিবন্ধন শুরু হয়ে শেষ ১১ মার্চ। প্যাকেজ-১ অনুযায়ী, এবার খরচ হবে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ টাকা এবং প্যাকেজ-২ এর আওতায় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়ও হজের খরচ ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকার কম হবে না। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছেন, গত বছর বিমান ভাড়া ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২১ টাকা। এবার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ভাড়া বেড়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী, এবার বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজ করতে পারবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার ১৯৮ জন এবং বাকি ১ লাখ ২০ হাজার জন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ করার সুযোগ পাবেন।
সূত্র বলছে, শুধু এবার নয়, নিয়ম করে প্রতিবছর হজের খরচ বাড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে বিমানভাড়াই সিংহভাগ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও ডলারের দাম বাড়ার অজুহাত দিয়ে বিমান ভাড়া বাড়ানো হলো। অথচ ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে বরাবরই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ, এমনিতেই হজযাত্রীদের কাছ থেকে অনেক বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বিমানের দুর্নীতিবাজদের পুষতেই হজযাত্রীদের দফায় দফায় ভাড়া বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সৌদি এয়ারলাইন্স ঢাকা-জেদ্দা ভাড়া নেয় ৪৮ হাজার টাকা। এ বছরের ওমরায় বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স জেদ্দা যাওয়া-আসার ভাড়া নিচ্ছে ৫২ হাজার টাকা। অন্যদিকে সৌদি আরবে অন্য (শ্রমিক, ব্যবসা) ভিসায় প্লেনের টিকিটের মূল্য যাতায়াত বাবদ নেয়া হয় ৩৬ হাজার থেকে ৩৯ হাজার টাকা। অথচ সেই ভাড়া হজের সময় ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা করা কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। হজের সময় বিমানের ফ্লাইট হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দা গিয়ে আসার সময় খালি আসে এবং হজ শেষে ঢাকা থেকে খালি গিয়ে জেদ্দা থেকে হাজিদের নিয়ে আসে- এ যুক্তিতে ভাড়া দ্বিগুণ করা হলেও দাঁড়াবে ৫২ হাজার টাকার দ্বিগুণ অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪ হাজার টাকা। কিন্তু তা কোনোভাবেই এর বেশি নেয়ার সুযোগ নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিমানের ক্রমাগত লোকসান ঠেকাতে আবারও হজ মৌসুমকে উপলক্ষ করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির এমন সিদ্ধান্তকে অনেক হজযাত্রী ‘অযৌক্তিক’ বলেছেন। ভাড়া বৃদ্ধির এমন সিদ্ধান্তের ফলে হজে গমনেচ্ছুদের নানা দুর্ভোগে পড়তে হবে। বিশেষ করে একবছর আগে হজ নিবন্ধনের পর যখন বিমান ভাড়া বাড়ানোর খবর আসে, তখন হজে গমনেচ্ছুদের বিপাকে পড়তে হয়। অনেকেই স্বল্প সামর্থে হজের প্রস্তুতি নিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হন।
এ বছর বিমান ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে কর্তৃপক্ষ এই মর্মে যুক্তি দেখাচ্ছে যে, গত এক বছরে ৪ দফা জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং হজ ফ্লাইট সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার ওপর সৌদি সরকারের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ আরোপ করেছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিমান কর্তৃপক্ষের ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি টেকে না। কারণ, জ্বালানি তেলের দাম ইতিপূর্বে আরও বেশি ছিল। মাঝে তেলের দাম কমার পর ভাড়া কমানো হয়নি। তাই এখন নতুন করে তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বিমান ভাড়া বাড়ানোটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাছাড়া হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া যে আগে থেকেই অনেক বেশি ধরা হয়েছে সেটা ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে। আর সৌদি আরবের সার্ভিস চার্জ ৫% বাড়ানোর যে কথা বলা হচ্ছে সেটিও এক্ষেত্রে ধোপে টেকে না। কারণ, বেশি ভাড়া নির্ধারণের কারণেই তো হজযাত্রীদেরকে বরাবর বেশিহারে সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ বিমান সরকারের লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সুতরাং হজকে কেন্দ্র করে ভাড়া না বাড়িয়ে বিমানের দুর্নীতি বন্ধ আগে প্রয়োজন। বিমানকে শুদ্ধাচারের আওতায় আনতে সরকার নানা চেষ্টা করেও সুফল পাচ্ছে না। উল্টো খেসারত দিতে হচ্ছে হজযাত্রীদের। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিমান কর্তৃপক্ষ যেসব যুক্তি দেখিয়ে হজযাত্রীদের ভাড়া বাড়াচ্ছে, এ যুক্তি মেনে নিলেও বলা যায়- ওমরাহ্র তুলনায় ভাড়া বড়জোর দ্বিগুণ হতে পারে। কিন্তু দ্বিগুণেরও বেশি নেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
হাজযাত্রীদের থেকে কত টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে?
গত বছর বাংলাদেশ থেকে হজ করেছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। চুক্তি অনুযায়ী অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করেছে বাংলাদেশ বিমান। এ বছরও সমান সংখ্যক মুসলিম হজ করতে পারবেন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ আগস্ট চলতি বছরের পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। সূত্রমতে, ২০১৭ সালে প্রত্যেক হাজীর কাছ থেকে বিমানভাড়া অন্তত ২০ হাজার টাকা বেশি নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ ১২৭ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা বাড়তি আদায় করেছে। চলতি বছর প্রত্যেক হজযাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি বিমানভাড়া নিচ্ছে ২৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এবার হাজীদের থেকে ১৫২ কোটি ৬৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় এই বাড়তি ভাড়ার পরিমাণ সাড়ে ৩শ কোটি টাকারও বেশি।
বাড়তি ভাড়া দিয়ে হজযাত্রীদের সুবিধা কী?
ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা সরাসরি বিমানভাড়া ৬৫ হাজার ৬৯৩ টাকা। বাংলাদেশ বিমানের ওয়েবসাইটে আগামী ১২ জুলাই ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে জেদ্দা থেকে ২০ আগস্ট ঢাকায় ফিরতি বিমানভাড়া এটা। ওই সময়ে হজযাত্রী হজ ভিসা নিয়ে হজ পালন করতে যাবেন। তাকে দ্বিগুণ টাকায় বিমানের টিকিট কিনতে হবে। একই বিমানে পাশের আসনে বসা সাধারণ যাত্রীর তুলনায় হজযাত্রী ৬৫ হাজার টাকা বেশি দিচ্ছেন। তাহলে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রী বছরে ৭০০ কোটি টাকা বেশি দিচ্ছেন। যা বিমান ও সৌদিয়া এয়ারলাইনস ভাগাভাগি করছে। হিসাব অনুযায়ী বিমান বাংলাদেশ পাচ্ছে সাড়ে ৩শ কোটি টাকা। প্রশ্ন হলো দ্বিগুণের বেশি ভাড়া দিয়েও হজযাত্রীরা বাড়তি কী কী সুবিধা পাচ্ছেন? গত বছর হজ প্যাকেজে বিমানভাড়া নেয়া হয় ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬১ টাকা। তবে বাড়তি কোনো সুবিধাই মেলেনি হাজীদের জন্য।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হজযাত্রী ও হাজী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আবদুল্লাহ আল নাসের বলছেন, ওমরাহসহ সারা বছরই বিমানভাড়া ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। শুধু হাজীদের জন্য দ্বিগুণ হয়ে যায়। যৌক্তিকভাবে হজ প্যাকেজে বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হলে হজযাত্রীদের ওপর বাড়তি টাকার চাপ কমে যাবে।
কয়েক বছরের হজ প্যাকেজের বিমানভাড়া খাতটিতে দেখা যায়- ২০০৮ সালে বিমানভাড়া ছিল ৯৮ হাজার ৯৭০ টাকা, ২০০৯ সালে বিমানভাড়া ছিল ৯২ হাজার ২৭০ টাকা, ২০১০ সালে ছিল ৯৬ হাজার ৯২৫ টাকা, ২০১১ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৫০ টাকা, ২০১২ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬২০ টাকা, ২০১৩ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ২৮ টাকা, ২০১৪ সালে ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৫৪ টাকা, ২০১৫ সালে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫৮ টাকা, ২০১৬ সালে ১ লাখ ২১ হাজার ২৩১ টাকা এবং ২০১৭ সালে বিমানভাড়া ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৬১ টাকা। আর ২০১৮ সালে বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা। এই বিমানভাড়া নিট।
জেদ্দা ডিপারচার ট্যাক্স, হজ টার্মিনাল সার্ভিস চার্জ, এম্বারকেশন ফি, এম্বারকেশন ফির ওপর ভ্যাট, এক্সাইজ ডিউটি, সৌদি সরকারের সিকিউরিটি চার্জ, ট্রাভেল এজেন্ট কমিশন, বিমানভাড়ার ওপর উৎসে কর, ফুয়েল সারচার্জ, ইনস্যুরেন্স সারচার্জ অন্তর্ভুক্ত করে এ বছর মোট ভাড়া দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা মূল ভাড়ার সাথে যুক্ত হবে।
লুটপাটের ঘাটতি পোষাতেই বাড়তি ভাড়া
এক হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিমান ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গত ছয় বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ বিমানের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট জানা গেছে, বর্তমানে ১৫টি আন্তর্জাতিক রুটে এবং ৭টি অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করছে বিমান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর লোকসানি রুট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাসহ নানা কারণে ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটিতে টানা লোকসান শুরু হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছর ৮০ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৯১ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬০০ কোটি ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২১৪ কোটি টাকা লোকসান দেয় বিমান। এ ছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিমানের লোকসান হয় ১৯৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর পেছনে লুটপাট, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও স্বজনপ্রীতিই কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিভিন্ন সময় চলা তদন্তকারীরা।
প্রতিবছর এভাবে শত শত কোটি টাকার লোকসান থেকে বিমানকে উদ্ধারে হজযাত্রীদের ওপর বিমানভাড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকে। যে কারণে ২০১০ সালে ৯৬ হাজার টাকা বিমানভাড়া বেড়ে বর্তমানে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ৭ বছরে বেড়েছে ৩২ হাজার টাকা। বিমান বলছে, হাজীদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ফলে গত দুই অর্থবছরে মুনাফা করতে সমর্থ হয় বিমান। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩২৪ কোটি ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭৬ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে বলে দাবি করছে। কিন্তু, বাস্তবে এটি শুভংকরের ফাঁকি।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা
হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। গত ৫ মার্চ নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টরিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হাবের মহাসচিব এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, বিমান কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য না দিয়ে হজে বিমানভাড়া তিনগুণ নির্ধারণ করেছে। এর সাথে ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং হাব একমত নয়। আমরা অবিলম্বে অতিরিক্ত ধার্যকৃত টাকা বাদ দিয়ে প্রকৃত ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি। সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এতে সর্বনিম্ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৮ টাকা। এর সাথে কুরবানি বাবদ ৫০০ রিয়াল বা ১১ হাজার ১৭৫ টাকা নিজে সৌদি নিয়ে যেতে হবে। এছাড়া ট্রলি ব্যাগ হজযাত্রীকে কিনে নিতে হবে। গত বছর এ খাতে আড়াই হাজার টাকা ধার্য ছিল। বেসরকারি এজেন্সি দু’টি প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে। তবে হাব ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কম হতে পারবে না।
হজে বিমান ভাড়া প্রসঙ্গে হাব মহাসচিব বলেন, জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি বা ভ্যাট প্রয়োগের অজুহাতে যদি হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে সাধারণ যাত্রী ও ওমরাহযাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমানভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি কেন? বরং ওমরার ক্ষেত্রে ভাড়া আরো ৫০ ডলার কমানো হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম কিছু বাড়লেও সৌদিতে দাম বাড়েনি। এতে প্রতীয়মান হয়, হজযাত্রীদের বিমানভাড়া তিনগুণ বৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
শাহাদাত হোসাইন তসলিম আরো বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা আসা যাওয়ার বর্তমান ভাড়া সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে ৩৬ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। ওমরাহযাত্রীদের আসা যাওয়ার ভাড়া ৪৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার টাকা। হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে বলা হয়, বিমানকে এক পথে খালি আসতে হয়; সেজন্য হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া সর্বোচ্চ দ্বিগুণ অর্থাৎ ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তাছাড়া প্রায় সারা বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। অথচ হজের সময় প্রায় ১০০ ভাগ যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালিত হয়। হজের সময় প্রচার খাতসহ আরো অনেক খাতে বিমানের খরচ কমে যায়। কাজেই হজে বিমান ভাড়া ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা হতে পারে না।
বিমানভাড়ার বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, বিমানভাড়ার বিষয়ে আমাদের আপত্তি আমলে নেয়া হয়নি। ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে আমরা একমত ছিলাম না।’
ভারতে বিমানভাড়া আরো কমেছে
ভারত থেকে এ বছর রেকর্ডসংখ্যক মুসলমান হজে যাবেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৫ জন হজে যাচ্ছেন। বিপুল সংখ্যক হজযাত্রীর কারণে এবার বিমান ভাড়াও ১৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। সৌদি সরকার চলতি বছরে ভারতের জন্য হজযাত্রীর কোটা ৫ হাজার বাড়িয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি সম্প্রতি বিমান ভাড়া কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ইউপিএ সরকার কর্তৃক ২০১৪ সালে হজযাত্রার জন্য যে বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে তুলনায় এবার নির্ধারণ করা বিমান ভাড়া অনেকটাই কমেছে। যদিও হজযাত্রীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার চলতি বছর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে হজে গেলে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫০ টাকা বিমান ভাড়া দিতে হতো। এবার তা কমে ৮৯ হাজার ৫৮৯ টাকা করা হয়েছে। মুম্বাই থেকে বিমানভাড়া আগে ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা ছিল। বর্তমানে তা ৫৭ হাজার ৮৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে শ্রীনগর থেকে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৫০ টাকা বিমানভাড়া ছিল, এখন তা কমে ১ লাখ ১ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে। আহমেদাবাদ থেকে ভাড়া ছিল ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা, বর্তমান তা কমিয়ে ৬৫ হাজার ১৫ টাকা করা হয়েছে।
এ বছর এয়ার ইন্ডিয়া, সৌদি এয়ারলাইনস এবং ফ্লাইনাস বিমান সংস্থার মাধ্যমে ভারতের হজযাত্রীদের সৌদি আরব নিয়ে যাওয়া হবে। এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য কলকাতা, চেন্নাই, গোয়া, নাগপুর, শ্রীনগর, মুম্বাই কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সৌদি এয়ারলাইনসের জন্য আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু, কোচি, দিল্লি, হায়দরাবাদ, জয়পুর এবং ফ্লাইনাসের জন্য আওরঙ্গাবাদ, ভূপাল, গয়া, গোয়াহাটি ও রাঁচিতে কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
থার্ড ক্যারিয়ার ওপেনের দাবি
প্রতিবেশী দেশে যখন বিমানভাড়া কমানো হয়েছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ানোকে ‘অবৈধ ও অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে বিমান বাংলাদেশ ও সৌদি এয়ারলাইন্সের বাহিরে হজযাত্রী পরিবহনে থার্ড ক্যারিয়ার ওপেনের দাবি জানিয়েছে হাব। হাবের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম বাহার বলেন, ‘যদি থার্ড ক্যারিয়ারটা ওপেন হতো তাহলে এই যে স্বেচ্ছাচারিতা, দুটি মাত্র এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরশীলতা এবং হাজীদের জিম্মি করা- এ বিষয়টির অবসান ঘটত।’ চলতি বছরের হজ ব্যবস্থাপনাকে সুন্দর ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে এবং হজযাত্রী ও হাব সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় হাব ওলামা সোসাইটি’র উদ্যোগে নেতৃবৃন্দ যেকোনো মূল্যে হজযাত্রীদের বিমানের অযৌক্তিক বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী থার্ড ক্যারিয়ার চালুর জন্য হাবের কাছে ছয় দফা দাবি পেশ করেছে।
হাব মহাসচিব শুধুমাত্র বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্সে হজযাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে থার্ড কেরিয়ার অর্থাৎ জেদ্দাগামী অন্যান্য এয়ারলাইন্সেও হজযাত্রী পরিবহনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার যদি বিমানভাড়া কমিয়ে দেয়, তাহলে এজেন্সিগুলোও সে পরিমাণ টাকা হজযাত্রীদের কমিয়ে ধার্য করবে।’
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৫ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)

 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ