সাজানো প্রশাসনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতি!

Pub: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ ১:০৬ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ ১:০৬ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে :“জেনুইন নির্বাচন না হলে বিপর্যয় নামবে”- এমন মন্তব্য করছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও। মোটকথা সবাই তাকিয়ে আছেন একটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য। শুধু দেশের জনগণই নয়, বলা যায়- সারাবিশ্বই বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশে সহিংসতামুক্ত, নিরপেক্ষ, অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা নির্বাচন দেখতে চায় গোটা দুনিয়া। রেফারি হিসেবে নির্বাচন কমিশন হবে পুরোপুরি নিরপেক্ষ, কমিশনের ভেতরে থেকে কেউ সিস্টেমেটিক ম্যানুপুলেশন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না- এমনটিই আশা করে সবাই। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে?
বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশির নামে হয়রানি করা হচ্ছে। গায়েবী মামলায় এখনো গ্রেফতার-নির্যাতন চলছে। সাধারণ ভোটাররা আতংকিত- আদৌ সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন কিনা। কারণ, ইতিমধ্যেই অভিযোগ এসেছে যে, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা রিটার্নিং অফিসার বা ডিসিদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গোপন বৈঠক করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারাসহ সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তারা গোপন বৈঠক করেছেন এবং নির্বাচনে কারচুপির ছক তৈরি করছেন মর্মেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বার বার লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির দাবি তোলা হলেও ইসি তাতে কর্ণপাত করছে না। সিইসি সচিবের সহযোগিতায় ভোট কারচুপির ছক তৈরি করা হচ্ছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ২২ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের ৯২ জন কর্মকর্তার তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে নির্বাচন কমিশনের সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, র‌্যাবের ডিজি, ঢাকার পুলিশ কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তারা। বলা হয়েছে এরা একেবারেই সরকার দলীয় কর্মকর্তা। ভোট কারচুপির পরিকল্পনার সঙ্গে এরা জড়িত। এদের সরিয়ে সিনিয়রিটি অনুযায়ী নিরপেক্ষ কর্মকর্তা পদায়ন করা না হলে লেভেল প্লেইং ফিল্ড হবে না।
এদিকে একই দিনে পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠকে ইসি মাহবুব তালুকদার বলেছেন, গায়েবী মামলার সঙ্গে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ওই একই দিনে দলবাজ পুলিশ অফিসারদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, কাউকেই বদলি করা হবে না। অর্থাৎ এদের সবাইকে ষড়যন্ত্র ও অপকর্ম করার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছেন তিনি। এমনকি প্রশাসনে অভিযুক্তদের বদলি বা কোনোরকমের ব্যবস্থা না নিয়েই সিইসি কেএম নুরুল হুদা গত ২৪ নভেম্বর এক বক্তৃতায় বলেছেন, লেভেল প্লেইং ফিল্ড হয়ে গেছে। ওইদিন তিনি ম্যাজিস্ট্রেটদের বলেছেন, প্রিসাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া কেন্দ্রে ঢোকা যাবে না। এর আগে ইসি সচিব বলেছেন, পর্যবেক্ষকদের মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সিইসি কেএম নুরুল হুদার একের পর এক চরম একপেশে ও বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন অবশেষে বাধ্য হয়ে তার অপসারণ চেয়েছেন। তিনি গত ২৫ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সিইসি কেএম নুরুল হুদাকে অপসারণ করা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর আগে গত ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশস্থ বৃটিশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘প্রশাসন-পুলিশের ভূমিকা পক্ষপাতমূলক, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি।’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বসে নির্বাচনের ছক সাজানো হচ্ছে। রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, সাজানো প্রশাসনে পাতানো নির্বাচনের ছক তৈরি করা হয়েছে। এ অবস্থায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না।
দলীয় প্রশাসন
২৩ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে যে ৯২ জন কর্মকর্তাকে বদলির দাবি তোলা হয়েছে তারমধ্যে ইসি সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবসহ সিভিল প্রশাসনের রয়েছেন ২২ জন। বাকিরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন ও মাঠ পর্যায়ের বহুল আলোচিত কর্মকর্তা। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, শতাধিক কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাকে সচিব করেছে বর্তমান সরকার। তিনি সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের পিএস ছিলেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশন অফিসে বসে আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ভোট কারচুপির যড়যন্ত্র করছেন। শুধু ইসি সচিব হেলাল উদ্দীনই নয়, এখন যারা পুলিশ এবং সিভিল উভয় প্রশাসনের উচ্চপদে আছেন সকলের অতীত-বর্তমান পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করেই এদেরকে এই পর্যায় পর্যন্ত আনা হয়েছে, যাতে নির্বাচনের সময় দলীয় কাজে লাগানো যায়। দফায় দফায় পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে এদেরকে। এক কথায় বলা যায়, ডিএনএ টেস্টে উত্তীর্ণ কর্মকর্তা এরা। ইসি মাহবুব তালুকদার গায়েবী মামলাসহ দু’একটি উদাহরণ দিয়ে এসব কর্মকর্তার আচরণ কিছুটা তুলে ধরেছেন যদিও, কিন্তু বাস্তব অবস্থা তারচেয়েও খারাপ। ইতিমধ্যেই ভোট কারচুপির ছক তৈরির অভিযোগ উঠেছে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যেহেতু এরা আওয়ামী লীগ থেকে মাত্রাতিরিক্ত সুবিধা নিয়েছেন, কাজেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার সকল কলাকৌশল তারা চালাবেন এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখাটা তাদের জন্য জরুরি। মরিয়া হয়ে কাজ করবেন। তাই করছেন।
একেবারে উপসচিব থেকেই ছেঁকে অর্থাৎ যাচাই-বাছাই করে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি দিয়ে এসব কর্মকর্তাকে উপরে তোলা হয়েছে। দেখা গেছে, পদোন্নতির প্রত্যেকটি ধাপেই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে পুনঃ পুনঃ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। কোনো রকমের সন্দেহজনক মনে হলেই তাকে পদোন্নতি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নিজে ছাড়াও আত্মীয়স্বজন কেউ বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। ছাত্রজীবন এবং চাকরিজীবনে যারা কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, নিরপেক্ষ বলে বরাবর পরিচিত ছিলেন তাদেরকেও বিরোধী পক্ষের বলে চিহ্নিত করে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ডিসি-এসপিসহ মাঠ প্রশাসন, সচিবালয় এবং পুলিশের উচ্চ পর্যায়সহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে তো ডিএনএ টেস্টের মতো করে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে বার বার। মাঠ প্রশাসনের জন্য ফিট লিস্টের পরও, এমনকি স্ত্রী-পরিবারসহ ট্রেনিং নেয়ার পরও অনেককে পদায়ন করা হয়নি। দলকানা সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের বাছাই করা লোকদের নিয়ে গত ছয় মাসে মাঠ প্রশাসন সাজানো হয়। উভয় প্রশাসনকেই তিন স্তরে সাজানো হয়েছে। সরকারি দল ধরেই নিয়েছিল নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে এসব দলবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে আপত্তি উঠবে। আর যদি সে ক্ষেত্রে প্রশাসনে কোনো পরিবর্তন আনতেই হয় সেজন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের কর্মকর্তাদেরও তৈরি রাখা হয়েছে। যাতে করে পরিবর্তনেও কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে। একজন সাবেক প্রবীণ আমলার নেতৃত্বেই প্রশাসনের এ সেটআপ তৈরি করা হয়। সামান্য সন্দেহযুক্ত কাউকেই নির্বাচনকালীন এ মাঠ প্রশাসনে সংশ্লিষ্ট রাখা হয়নি। পুলিশ প্রশাসনের সব কর্মকর্তার নির্বাচনের সময়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা হয়নি। যেসব কর্মকর্তা বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নামে একাধিক মামলার বাদি ছিলেন বেছে বেছে তাদেরকেই দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়।
অফিসার্স ক্লাবে গোপন বৈঠক
রির্টানিং অফিসার অর্থাৎ ডিসিদের ডেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক করা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে গোপন বৈঠকের অভিযোগ উঠছে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত ২৪ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে এই মর্মে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, গত ২০ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের চার তলার পিছনের কনফারেন্স রুমে এক গোপন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব সাজ্জাদুল হাসান, জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমদ, নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, সচিব পানিসম্পদ (প্রধানমন্ত্রীর অফিসের প্রাক্তন ডিজি) কবির বিন আনোয়ার, বেসামরিক বিমান পরিবহন সচিব মহিবুল হক, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার (মহানগরীর রিটার্নিং অফিসার) ও সদস্য সচিব আলী আজম, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-১ (জজ কাজী গোলাম রসুলের মেয়ে) কাজী নিশাত রসুল, র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ডিএমপির কাউন্টার টেররিজমের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের ডিআইজি প্রশাসন হাবিবুর রহমান, ডিএমপির ডিসি প্রলয় জোয়ার্দার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাক্তন প্রটোকল অফিসার) প্রমুখ।
ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ যদিও এ বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছেন কিন্তু অন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, বিমান সচিব মহিবুল হক বৈঠকের কথা স্বীকার করে বলেছেন, ওনারা ব্যাচমেটরা মিটিংয়ে বসেছিলেন! তিনি বলেন, তাদের ব্যাচমেটদের মেলামেশাকে রাজনৈতিক রং দেওয়া হচ্ছে। সচিব মহিবুল হক আরো বলেন, “আমরা ব্যাচমেটরা মাঝে মধ্যে একসাথে বসি, ভবিষ্যতেও বসবো। এটাকে পলিটিসাইজ করার কিছু নেই।”
এ ব্যাপারে বিএনপির মন্তব্য চাওয়া হলে রুহুল কবীর রিজভী বলেন, সচিব হেলালুদ্দীন, সাজ্জাদুল হাসান, ফয়েজ আহমদ, কবির বিন আনোয়ার, পুলিশের আছাদুজ্জামান মিয়া, বেনজীর আহমেদ- এরা না হয় সবাই বিসিএস ৭ম ব্যাচের কর্মকর্তা। কিন্তু বাকীরা? আলী আযম ৮ম ব্যাচ, তোফাজ্জল হোসেন ৯ম, মনিরুল ইসলাম ১৫তম ব্যাচ, হাবিবুর রহমান ১৭তম, কাজী নিশাত ২২তম এবং প্রলয় জোয়ার্দার ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা। এটা কেমন ব্যাচমেটদের মিটিং?
তিনি বলেন, মূলত নৌকার পক্ষে নির্বাচনের ফল কব্জা করতেই পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের এ গুপ্ত মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
রুহুল কবীর রিজভী জানান, ওইদিন রাত সাড়ে ৭টা থেকে আড়াই ঘন্টা ধরে চলা এ মিটিংয়ে সারাদেশের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সেট-আপ ও প্ল্যান রিভিউ করা হয়। ডিআইজি হাবিব ওই মিটিংয়ে জানায়, পুলিশ সূত্রের খবর অনুযায়ী ৩৩টি সিট নৌকার কনফার্ম আছে এবং ৬০-৬৫ টিতে কনটেস্ট হবে, বাকি আর কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজেই সাংঘাতিক কিছু করা ছাড়া এ খেলা উৎরানো যাবে না।
তিনি জানান, ওই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে মূল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, নির্বাচন কমিশন থেকে বিএনপি-ফ্রন্টকে চরম অসহযোগিতা করা হবে, যতই চাপ দেয়া হোক প্রশাসনে হাত দেয়া যাবেনা, ধরপাকড় বাড়ানো হবে, প্রার্থী গুম খুণ করে এমন অবস্থা তৈরী করা হবে যাতে তারা নির্বাচন থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর শেষ পর্যন্ত ভোটে থেকে গেলে ভোটের দিন পর্যন্ত ধরপাকড়ের তান্ডব চালানো হবে নির্দয়ভাবে, যেনো ভোট কেন্দ্রে কেউ হাজির হতে সাহস না করে। আর যদি ভোটের ফ্লো ঠেকানো না যায়, তবে মিডিয়া ক্যু করে নৌকাকে জিতানো হবে, বিটিভির মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করে সব মিডিয়াতে তা রিলে করার ব্যবস্থা করা হবে। একবার ফল ঘোষণা করতে পারলে তারপরে নির্মমভাবে সব ঠান্ডা করা হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির নামে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ৮ জন আওয়ামী দলীয় কর্মকর্তা দিয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে পুলিশ সদর দপ্তর। এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান ৪৫ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ৬৪ জেলার উপদেষ্টা (মেনটর) নিয়োগ করে একটি নজিরবিহীন সরকারি আদেশ জারি করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ নিয়ে বিএনপির লিখিত আপত্তির প্রেক্ষিতে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু গোপনে ঐসব কর্মকর্তারা জেলায় জেলায় মনিটরিংয়ের কাজ এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। এর বাইরে সারা দেশের ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা প্রথম তালিকার ৬ জন সচিবকে নিয়ে একটি গুপ্ত কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে। মুলত এখানে সব ধরনের অফিসারদের গমনাগমন ঘটে থাকে, তাই বিরোধী পক্ষের চোখ এড়ানো সহজ হবে মনে করে জনবহুল এই স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সভাটি বসে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং কমকর্তা অর্থাৎ ডিসিদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে বৈঠক করা প্রসঙ্গে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মির্জা ফখরুলের এ ধরনের অভিযোগের ভিত্তি নেই। কিন্তু মির্জা ফখরুল ওই দিনই পাল্টা বলেছেন, ‘ঢালাও নয়, অভিযোগ সুনির্দিষ্ট এবং সুষ্পষ্ট।’ অবশ্য পরদিনই আবার ১৪ দলের পক্ষ থেকে এক লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো ডিসি বা রিটার্র্নিং কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডাকা হয়নি। দু’একজন নিজে থেকেই যেতে পারেন।
ইইউ’র উদ্বেগ, হানিফের ডেমকেয়ার
একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা। তারা বাংলাদেশে অবাধ. সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় বলে জানিয়েছে। তবে তাঁদের উদ্বেগ এবং হুঁশিয়ারিকে পরোয়া করে না বলে জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাদের উদ্বেগ-হুঁশিয়ারিকে আওয়ামী লীগ পরোয়া করে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ করে দিক। তাতে কিছু যায়-আসে না।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সুবিধা দিয়েই। বিশ্বে শুধুমাত্র এই দেশগুলো থেকেই বাংলাদেশের বড় অংকের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। চীন এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিশাল অংকের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তা মেটানো হয় এই দেশগুলোর উদ্বৃত্ত দিয়েই।
লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির দায়িত্ব ইসির-ই
নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ করার জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড অর্থাৎ সবার জন্য সমান সুযোগ অপরিহার্য- এটা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীসহ রাজনৈতিক সচেতন মানুষের পক্ষ থেকেও দাবি উঠেছে। অতীতে এ কাজটি করতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯১ সালে, ১৯৯৬ সালে, ২০০১ সালে এবং ২০০৮ সালে তা-ই হয়েছে। কিন্তু এবার যেহেতু দলীয় সরকার, তাই স্বাভাবিকভাবে এ কাজটি নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে। অথচ নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
নির্বাচন কমিশনে দেয়া এক চিঠিতে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি), জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশ সদর দপ্তরে বদলির দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। পাশাপাশি প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়েও বদলির কথাও বলা হয়েছিল চিঠিতে। এরপর ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করে পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের ৯২ জন কর্মকর্তার তালিকা ইসিতে জমা দিয়ে এদেরকে বদলির দাবি জানানো হয়েছিল। বদলির ক্ষেত্রে ব্যাচের সিনিয়রিটি ও মেধাক্রম অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছিল। সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং পদোন্নতিবঞ্চিত সকল যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার দাবিও জানানো হয়েছিল। সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনে গত দশ বছরে যে দলীয়করণ হয়েছে সেটিকে লেভেল প্লেইং করার জন্য এ দাবিগুলো ছিল নিঃসন্দেহেই যৌক্তিক। ইসি সচিব বলেছেন, প্রতীক বরাদ্দের আগে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই এর দু’দিন পর সিইসি নুরুল হুদা ঘোষণা করলেন, লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি হয়ে গেছে। এতে মনে হচ্ছে যে, তিনি আদতে বিরোধীদলের দাবির সঙ্গে কৌতুক করলেন।
যে ৯২ কর্মকর্তার প্রত্যাহার চাইল ঐক্যফ্রন্ট
নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদসহ জনপ্রশাসনের ২২ জন কর্মকর্তার প্রত্যাহার চেয়েছে ২৩ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের বিতর্কিত উল্লেখ করে তাড়াতাড়ি প্রত্যাহার করে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহিত দেয়ার দাবি জানায় দলটি। কী কারণে তাদের প্রত্যাহার করা দরকার তাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
নির্বাচন কমিশন সচিবের পদত্যাগের কারণ হিসেবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিতর্কিত ও অতিমাত্রায় প্রচারমুখী। বিসিএস ৮২ বিশেষ ব্যাচের এবং ৮৪ পদের শতাধিক কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাকে সচিব পদে পদায়ন করা হয়। তিনি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জানতে পেরেছেন। হেলালুদ্দীন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মহীউদ্দীনের একান্ত সচিব ছিলেন। মহীউদ্দীনের ছেলে ব্যারিস্টার নওফেল এখন আওয়ামী লীগের নেতা। যিনি এখন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে কমিশনে নিয়মিত যাতায়াত করেন। তাই এ সচিবের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। অন্য কর্মকর্তারা হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, ভোলার ডিসি মো মাসুদ আলম সিদ্দিকী, চট্টগ্রামের ডিসি মো. ইলিয়াস হোসাইন, কুমিল্লার ডিসি মো. আবুল ফজল মীর, ফেনীর ডিসি ওয়াহেদুজ্জামান, লক্ষ্মীপুরের ডিসি অঞ্জন চন্দ্র পাল, কিশোরগঞ্জের ডিসি সারোয়ার মোর্শেদ চৌধুরী, নরসিংদীর ডিসি সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, টাঙ্গাইলের ডিসি মো শহিদুল ইসলাম, ঝিনাইদহের ডিসি সুরজ কুমার নাথ, খুলনার ডিসি হেলাল হোসেন, কুষ্টিয়ার ডিসি মো. আসলাম হোসেন, নড়াইলের ডিসি আঞ্জুমান আরা, ময়মনসিংহের ডিসি ড. শুভাস চন্দ্র বিশ্বাস, জয়পুরহাটের ডিসি মো. জাকির হোসেন, নওগাঁর ডিসি মিজানুর রহমান, রাজশাহীর ডিসি আবদুল কাদের ও সিলেটের ডিসি কাজী ইমদাদুল হক।
পুলিশ বিভাগের যারা এ তালিকায় রয়েছেন- এডিশনাল আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমান, র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, এডিশনাল আইজিপি (টেলিকম) ইকবাল বাহার, ডিআইজি (নৌ পুলিশ) শেখ মো. মারুফ হাসান, ডিআইজি সিলেট রেঞ্জ মো. কামরুল আহাসান, ডিআইজি চট্টগ্রাম রেঞ্জ খন্দকার গোলাম ফারুক, ডিআইজি খুলনা রেঞ্জ মো. দিদার আহমেদ, ডিআইজি রাজশাহী রেঞ্জ এম খুরশিদ হোসেন, কমিশনার (ডিআইজি কেএমপি) হুমায়ুন কবির, ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কমিশনার (ডিআইজি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ মাহবুবুর রহমান রিপন, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি, ঢাকা) মীর রেজাউল আলম, ডিআইজি (সিটি এসবি ঢাকা) মোহাম্মদ আলী মিয়া, ডিআইজি (রংপুর রেঞ্জ) দেবদাস ভট্টাচার্য, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি ডিএমপি) কৃঞ্চপদ রায়, ডিআইজি (পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স) হাবিবুর রহমান, ডিআইজি (অপারেশন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স) আনোয়ার হোসেন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাফিস আক্তার, ডিআইজি (ট্রেনিং) ড. খ. মহি উদ্দিন, অতিরিক্ত কমিশনার (ডিএমপি) আবদুল বাতেন, র‌্যাব-৪ এর এডিশনাল ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, যুগ্ম কমিশনার (ডিএমপি) শেখ নাজমুল আলম, এডিশনাল ডিআইজি (খুলনা রেঞ্জ) একেএম নাহিদুল ইসলাম, এডিশনাল ডিআইজি (খুলনা রেঞ্জ) মো. মনিরুজ্জামান, এডিশনাল ডিআইজি (সিলেট রেঞ্জ) জয়দেব কুমার ভদ্র, এডিশনাল ডিআইজি (ঢাকা রেঞ্জ) মো. আসাদুজ্জামান, জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম, এসপি মোল্লা নজরুল ইসলাম, এসপি (টুরিস্ট পুলিশ, সিলেট) আলতাফ হোসেন, ডিসি (তেজগাঁও) বিপ্লব কুমার সরকার, ডিসি ডিএমপি হারুন অর রশীদ, ডিসি রমনা মো. মারুফ হোসেন সরকার, ডিসি (সিএমপি) এস এম মেহেদী হাসান, ডিসি (ডিবি, উত্তর) খন্দকার নুরুন নবী, ডিসি (সিএমপি) মো. ফারুকুল হক, ডিসি (কাউন্টার টেররিজম, ডিএমপি) প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, ডিসি (ডিএমপি) এস এম মুরাদ আলী, এডিসি (ডিএমপি) শিবলী নোমান, এসপি (ঢাকা) শাহ মিজান শফি, এসপি (নায়ারণগঞ্জ) মো. আনিসুর রহমান, এসপি (মুন্সিগঞ্জ) মো. জায়েদুল আলম, এসপি (নরসিংদী) মিরাজ, এসপি (টাঙ্গাইল) সনজিত কুমার রায়, এসপি (মাদারীপুর) সুব্রত কুমার হাওলাদার, এসপি (ময়মনসিংহ) শাহ আবিদ হোসেন, এসপি (শেরপুর) আশরাফুল আজিম, এসপি (সিলেট) মো. মনিরুজ্জামান, এসপি (বরিশাল) সাইফুল ইসলাম, এসপি (ভোলা) মোক্তার হোসেন, এসপি (খুলনা) এস এম শফিউল্লাহ, এসপি (সাতক্ষীরা) মো. সাজ্জাদুর রহমান, এসপি (বাগেরহাট) পঙ্কজ চন্দ্র রায়, এসপি (যশোর) মঈনুল হক, এসপি (ঝিনাইদহ) হাসানুজ্জামান, এসপি (কুষ্টিয়া) আরাফাত তানভির, এসপি (চট্টগ্রাম) নূর এ আলম মিনা, এসপি (নোয়াখালী) ইলিয়াস শরীফ, এসপি (ফেনী) এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, এসপি (কুমিল্লা) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এসপি (রংপুর) মিজানুর রহমান, এসপি (দিনাজপুর) সৈয়দ আবু সায়েম, এসপি (ঠাকুরগাঁও) মনিরুজ্জামান, এসপি (রাজশাহী) মো. শহিদুল্লাহ, এসপি (চাপাইনবাবগঞ্জ) মোজাহিদুল ইসলাম, এসপি (নওগাঁ) ইকবাল হোসেন, এসপি (নাটোর) সাইফুল্লাহ, এসপি (বগুড়া) আশরাফ আলী, এসপি (সিরাজগঞ্জ) টুটুল চক্রবর্তী ও এসপি (পাবনা) রফিকুল ইসলাম।
বাতিল হওয়া মেনটররা এখনো তৎপর!
উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির নামে বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান ৪৫ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ৬৪ জেলার উপদেষ্টা (মেনটর) নিয়োগ করে তা আবার বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশও জারি করা হয়েছে। বিএনপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যাকডেটে ওই নিয়োগ বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যে ৪৫ জন কর্মকর্তাকে উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে মাদারীপুর, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ইসতিয়াক আহমদকে মানিকগঞ্জ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক সচিব এম এ এন ছিদ্দিককে নরসিংদী, সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামকে টাঙ্গাইল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগমকে মুন্সীগঞ্জ, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জনবিভাগ সচিব সম্পদ বড়ুয়াকে কিশোরগঞ্জ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সচিব কামাল উদ্দিন তালুকদারকে শরীয়তপুর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ ইউসুফ হারুনকে গোপালগঞ্জ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) মো. আবুল কালাম আজাদকে জামালপুর, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সুবীর কিশোর চৌধুরীকে ময়মনসিংহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানকে নেত্রকোনা, নৌপরিবহন সচিব মো. আবদুস সামাদকে শেরপুর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম খানকে যশোর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. নমিতা হালদারকে বাগেরহাট, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষকে ঝিনাইদহ, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হান্নানকে খুলনা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনকে মাগুরা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমানকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ারকে সিরাজগঞ্জ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নওগাঁ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামালকে পাবনা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমানকে নাটোর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব খন্দকার মো. ইফতেখার হায়দারকে রংপুর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাকসুদুল হাসান খানকে গাইবান্ধা, ভূমি সংস্কার বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুর রহমানকে কুড়িগ্রাম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বনমালী ভৌমিককে পঞ্চগড়, জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুল ইসলামকে ঠাকুরগাঁও, প্রধান তথ্য কমিশনার মরতুজা আহমদকে সুনামগঞ্জ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. আব্দুল জলিলকে সিলেট, সাবেক নৌ-পরিবহন সচিব অশোক মাধব রায়কে হবিগঞ্জ, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেককে পটুয়াখালী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দীন চৌধুরীকে ভোলা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. আব্দুল হালিমকে বরিশাল, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইলকে ঝালকাঠি, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়াকে পিরোজপুর, খাগড়াছড়ি জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরীকে কক্সবাজার, বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর আ ল ম আব্দুর রহমানকে চট্টগ্রাম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) এন এম জিয়াউল আলমকে কুমিল্লা, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীকে ফেনী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে নোয়াখালী, নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে বান্দরবান, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর মো. মোশাররফ হোসেনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাকছুদুর রহমানকে চাঁদপুর জেলার উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, এসব মেনটরের নিয়োগ বাতিল করা হলেও তারা অনেকে এখনো আনঅফিসিয়ালি খবরদারি করছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের কথা বলা হলেও বাস্তবে এরা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজে খবরদারি করছেন।
পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের কেন এতো ভয় ইসির
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্র্রিফিংয়ে সংবাদকর্মীদের ডেকে এনে পরে বের করে দিলো নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ সময় সংবাদকর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণও করা হয়। গত ২৪ নভেম্বর সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে এই ঘটনা ঘটে। এ ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুরসহ কয়েকটি জেলার ২২৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, স্থানীয় পর্যবেক্ষক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ সভাসহ সংবাদকর্মীদের ভিডিও ফুটেজ ধারণ, ছবি নেওয়া, সিইসি, কমিশনার বা সচিবের বক্তব্য ধারণ করতে পারতেন সংবাদকর্মীরা। তবে এই প্রথমবারের মতো রীতি ভেঙে অনুষ্ঠানের শুরুতেই সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হলো।
অবশ্য এই দিনের অনুষ্ঠানে থাকার জন্য ইসির জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. আশাদুল হক আগেরদিন সাংবাদিকদের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে সাংবাদিকরা উপস্থিত হন। কিন্তু পরে তাদের বের করে দিয়েই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্রিফ করা হয়। এমনকি এসময় সাংবাদিকদের সঙ্গে রূঢ় আচরণও করা হয়।
এদিকে ইসি সচিব বলেছেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকবেন। তারা কোনো কথা বলতে পারবেন না। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কারো কাছ থেকে কোনো তথ্য জানতে চাইতে পারবেন না। কোনো ছবি তুলতে পারবেন না। তাহলে পর্যবেক্ষক থেকেই বা কী লাভ- এ প্রশ্ন রেখেছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, বস্তুত পর্যবেক্ষক নয়, মুর্তির প্রয়োজন ইসির- যাতে ইসির অপকর্মে এরা বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।
সিইসি আসলে কী চান?
পুলিশ প্রশাসনের বর্তমান কর্মকা- নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার আশংকা প্রকাশ করার একদিন পরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা বললেন, লেভেল প্লেইং ফিল্ড হয়ে গেছে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরির বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই সিইসি এমন বক্তব্য দিলেন। তিনি আসলে কী চান তা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দলবাজ বা দলীয় আনুগত্যের সব সীমারেখা তিনি ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছেন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
খান মোঃ নুরুল হুদা, সংক্ষেপে কেএম হুদা ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, একথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। চাকরি জীবনেও তার সেই ধারা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চের সময় কুমিল্লার ডিসি ছিলেন। সে অবস্থায় তিনি কুমিল্লা থেকে জনতার মঞ্চের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন, কুমিল্লা কালেকটরেট থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি নামিয়ে ফেলেছিলেন। যদিও নুরুল হুদা এখন সেইসব কথা অস্বীকার করছেন, কিন্তু তার কর্মকা-ের কথা তখন প্রকাশ হয়েছিল দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ৩০ মার্চ ১৯৯৬ সংখ্যায় সহ অন্যান্য জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায়। এ ছাড়াও ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের ঠিক আগে কুমিল্লার ডিসি নুরুল হুদাকে পদ থেকে প্রত্যাহার চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট দায়ের করেছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালের ১৬৩৫ নম্বর রিটে নুরুল হুদার জনতার মঞ্চ সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ আছে। কাজেই সিইসি নিয়োগ পাওয়ার পরে নুরুল হুদা সাহেব যেভাবে বলেছেন “জনতার মঞ্চের সাথে জড়িত ছিলাম না, কেননা আমি তখন কুমিল্লায়”- এটা সত্য ভাষণ নয়। নুরুল হুদার গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ বিবেচনা করে তাকে আর সরকারি চাকরিতে রাখা সম্ভব নয় বিবেচনায় ২০০১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপি সরকার তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তিনি প্রতিকারের জন্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে যান, তবে সেখান থেকে কোনো রায় পাওয়ার খবর জানা যায়নি। অথচ বলা হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে চাকরি ফেরত পান, এমনকি পেছনের তারিখে পদোন্নতিও নাকি হাইকোর্ট দিয়েছে। আসলে এসব তথ্য সত্য নয়। বাস্তবে হাতেম আলী খানের মামলায় রায়ের রেফারেন্স দেখিয়ে চাকরি ফেরত পাওয়ার কথাও হচ্ছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ মতাবলম্বী অন্যান্যদের সাথে নুরুল হুদার চাকরি ফেরত দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাথে দু’টো প্রমোশনও দেন অতিরিক্ত সচিব ও সচিব। কিন্তু এর পাঁচ বছর আগেই ২০০৫ সালে জনাব হুদার বয়স ৫৭ বছর পূর্তিতে স্বাভাবিক অবসরের তারিখ পার হয়ে যায়। মোটকথা, যেভাবে দাবি করা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের দায়িত্ব পালন করেন- তাও সর্বেব মিথ্যা। নুরুল হুদা বাস্তবে সর্বোচ্চ যুগ্মসচিব পদে চাকরি করেছেন। অতিরিক্ত সচিব বা সচিব পদে এক দিনও কাজ করার সুযোগ পাননি, যা কিছু বলা হচ্ছে সব কাগুজে।
কেএম নুরুল হুদা অবসরের ১৭ বছরে পরে আওয়ামী লীগ সরকারের দয়ায় একটি সাংবিধানিক পদে চাকরি পেয়েছেন। কাজেই আওয়ামী লীগের প্রতি তার বিশেষ আনুকূল্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে তিনি নিজের ভাগিনাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ারও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যদিও এই ভাগিনা আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য কেউ নয়। কিন্তু, সিইসি কেএম নুরুল হুদার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার খেসারত দিতে হবে কি গোটা এই দেশটিকে- সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসে গেছে।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৬ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1078 বার