বিবিসির বিশ্লেষণ বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?

Pub: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাম্প্রতিক অতীতে বিএনপি তাদের ভারত-বিরোধিতার পুরনো লাইন ত্যাগ করার নানা ইঙ্গিত দিলেও ভারতের দিক থেকে তেমন সদথর্ক কোনো সাড়া মেলেনি
বাংলাদেশে বিরোধী দল বিএনপি সাম্প্রতিক অতীতে তাদের ভারত-বিরোধিতার পুরনো লাইন ত্যাগ করার নানা ইঙ্গিত দিলেও ভারতের দিক থেকে তেমন সদথর্ক কোনো সাড়া পায়নি। ফলে ৩০ ডিসেম্বরের নিবার্চনের পর বিএনপি আবার ভারত-বিরোধিতার দিকে ঝুঁকতে পারে বলেও আভাস মিলেছে, ইতিমধ্যেই সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশিদের হত্যার বিরুদ্ধেও তারা সরব হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নেতাদের চেষ্টা সত্তে¡ও কেন তারা শেষ পযর্ন্ত ভারতকে একেবারেই পাশে পায়নি?

বস্তুত বাংলাদেশে এবারের সাধারণ নিবার্চনের বেশ কয়েক মাস আগ থেকেই বিএনপি নেতারা যেভাবে দিল্লি সফর করছিলেন ও নানা ধরনের ‘ফিলার’ পাঠাচ্ছিলেন তাতে এটা পরিষ্কার ছিল যে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পকর্ নতুন করে শুরু করতে চান।

গত বছর ভারতে গিয়ে বিএনপি নেতারা দেখা করেছিলেন মূলত ক্ষমতাসীন বিজেপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা (যাদের অন্যতম দলের সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব) এবং দিল্লির বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে।

তারা অনেকেই বলছেন, নিবার্চনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে খোলাখুলি সমথর্ন না করে ভারত অন্তত একটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখুক, বস্তুত সেটাই ছিল দিল্লির কাছে বিএনপির অনুরোধ। সম্ভবত সে কারণেই তিস্তা চুক্তির মতো ইস্যুকেও তারা নিবার্চনে একেবারেই ব্যবহার করেনি। কিন্তু শেষ পযর্ন্ত ভারতের ভ‚মিকায় এমন কিছুই দেখা যায়নি, যা বিএনপিকে বিন্দুমাত্র খুশি করতে পারে।

ভারতে গিয়ে বিএনপির প্রতিনিধিরা যাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাদের অন্যতম বিজেপির পলিসি রিসাচর্ সেলের সিনিয়র সদস্য অনিবার্ণ গাঙ্গুলি।

ড. গাঙ্গুলির মতে, জামাতের সঙ্গে বিএনপির সম্পকর্ই আসলে এই সমস্যার মূলে।

তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘কথাটা হলো বিএনপি তাদের ভারতবিরোধী অবস্থান বদলাবে কি বদলাবে না, সেটা কিন্তু গৌণ। প্রধান ব্যাপারটা হলো জামাতের সঙ্গে তাদের সম্পকর্ তারা আগে পরিষ্কার করুক। ওটা নিয়ে তারা লুকোচুরি খেলেই যাচ্ছে! বাকি সবই অন্য কথা। বিএনপি কী ভাবল না ভাবল তাতে ভারতের বিশেষ কিছু এসেও যায় না।’

‘কিন্তু যে রাজাকারদের বিএনপি আজীবন তোষামোদ করে এসেছে তাদের প্রতি অবস্থান পরিষ্কার না-করলে ভারতেরও যে বিএনপির সঙ্গে সম্পকর্ রাখা সম্ভব নয়, এটা তো বুঝতে হবে!’

বিএনপি নেতারা প্রায়ই ভারতের নীতি-নিধার্রকদের উদ্দেশে পরামশর্ দিয়ে থাকেন, বাংলাদেশে তাদের সব ডিম একটাই ঝুড়িতে (অথার্ৎ আওয়ামী লীগ) রাখাটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

তার জবাবে অনিবার্ণ গাঙ্গুলি কটাক্ষ করে এমন কথাও বলছেন, ‘যারা নিজেদের সব ডিম জামাতের ঝুড়িতে রেখে বসে আছে, তাদের মুখে অন্তত এ ধরনের কথা মানায় না!’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মুচকুন্দ দুবে ঢাকাতেও ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও বিবিসিকে বলেন, ‘বিএনপির এ ধরনের আউটরিচ কিন্তু নতুন কিছু নয় গত পঁাচ-দশ বছর ধরেই তারা এই চেষ্টা চালাচ্ছে।’ ‘ভারতের ভেতর তাদের হয়ে যারা লবিং করতে পারেন বলে বিএনপির ধারণা, তাদের সঙ্গে এসে দলের নেতারা দেখাও করছেন।’

‘কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ তো মুখের কথায় নয় বরং পুরনো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই চলে।’

মুচকুন্দ দুবে বলেন, আমরা কী করে ভুলি খালেদা জিয়ার আমলে দুদেশের সম্পকর্ একেবারে থমকে গিয়েছিল?

তিনি আরও বলেন, ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বদ্ধমূল ধারণা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিএনপি আমলে যে দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার করার চেষ্টা হয়েছিল তাতে আইএসআই তথা পাকিস্তান সরকারে প্রত্যক্ষ যোগসাজস ছিল।

তবু ঘটনা হলো, ঠিক সোয়া ছ’বছর আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া যখন তার শেষ ভারত সফরে এসেছিলেন তখন দিল্লিও বলেছিল ‘অতীতে যা হওয়ার হয়ে গেছেÑ দু’পক্ষের কেউই আর গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে তাকাবে না, অথার্ৎ পেছনে না ফিরে এগোতে চাইবে সামনের দিকেই।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিনের ওই মন্তব্য অবশ্য অথর্হীন প্রতিপন্ন হয়ে যায় কয়েক মাসের ভেতরই, যখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখাজির্র প্রথম ঢাকা সফরে খালেদা জিয়া তার সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেন।

তখন থেকেই বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পকের্ আবার অস্বস্তির শুরু যাতে ছায়া ফেলতে শুরু করে তিক্ত ইতিহাস।

ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে বহু বছর কাজ করে আসা নিরাপত্তা বিশ্লেষক শান্তনু মুখাজির্র কথায়, ‘প্রথম সমস্যা হলো বিএনপির পাকিস্তানপন্থি ভূমিকা। ভারতের চেয়ে তারা যে পাকিস্তানের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ, সেটা তো সহজেই বোঝা যায়।’

‘তা ছাড়া খালেদা জিয়ার আমলে ভারতের উত্তর-পূবার্ঞ্চলে আসামের আলফা কিংবা মণিপুর-নাগাল্যান্ডের জঙ্গিরাও বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে বলে ভারতের কাছে প্রমাণ আছে আর সেটাও ছিল আমাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক।’

সাম্প্রতিক নিবার্চনে জামায়াতে ইসলামী এবং কামাল হোসেনের দলের সঙ্গে বিএনপির গঁাটছড়াও ভারত ভালোভাবে নেয়নি, সে কথাও বলেন শান্তনু মুখাজির্।

তার বক্তব্য ‘দেখুন, কামাল হোসেনের মতো স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, ভারতের বন্ধুকেও যেভাবে বিএনপি জোটে টানল এবং তিনি একরকম ঘুরিয়ে জামাতের হাত ধরলেন সেটাতেও ভারত খুবই হতাশ হয়েছে।’

‘পরে তিনি হয়তো জামাতের সঙ্গে সব ধরনের সম্পকর্ অস্বীকারও করেছেন, তবে ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে।

হ্যঁা, পলিটিক্যাল কনভেনিয়েন্স বা রাজনীতির স্বাথের্ এসব হয়তো চলে – কিন্তু ভারতের সাবের্ভৗমত্ব বা নিরাপত্তার নিরিখে আমি তো বলব বিএনপির পাশে না-দঁাড়িয়ে ভারত একেবারে ঠিক করেছে, বলেন শান্তনু মুখাজির্।

দিল্লিতে অনেকেই আবার মনে করেন, বিএনপি-র নেতৃত্বে যতদিন তারেক রহমান আছেন ততক্ষণ ভারতের পক্ষে কিছুতেই দলটিকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।

রাজধানীর নামী থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালিসিসের সিনিয়র ফেলো স্মরুতি পট্টনায়ক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপত্তিটা ঠিক ব্যক্তি তারেক রহমানকে নিয়ে নয়, বরং আইএসআই ও জামাতের সঙ্গে তার কথিত ‘যোগসাজস’ নিয়ে।’

‘২০০১ সালেই কিন্তু ভারত তারেকের সঙ্গে এনগেজমেন্ট চেয়েছিল, কিন্তু তাতে তখন সাড়া মেলেনি। এখনও ভারত ও তারেক রহমান দুদিক থেকেই পরস্পরের প্রতি একটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।’

আর বিএনপিও যতক্ষণ না ক্ষমতায় এসে প্রমাণ করতে পারছে যে তাদের ভারতবিরোধী অবস্থান সত্যিই পাল্টে গেছে ততক্ষণ সেটা থাকবে বলেও আমার বিশ্বাস, বলেন ড. পট্টনায়ক।

রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তারেক রহমান যে এখনো ভারতের আস্থা অজর্ন করতে পারেননি, সেই ইঙ্গিত ছিল বিজেপি নেতা অনিবার্ণ গাঙ্গুলির কথাতেও।

ড. গাঙ্গুলি বলেন, ‘তারেক রহমান নেতা হিসেবে এখনও পযর্ন্ত নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেন কোথায়? তিনি তো তার নিজের দলের ভেতরের ব্যাপার-স্যাপারই সামাল দিতে পারছেন না!’

মুচকুন্দ দুবে বলেন, বিএনপি ও ভারতের মধ্যেকার সম্পকের্ একটা মানসিকতার সমস্যাও রয়ে গেছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও খালেদা জিয়ার আমলে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান পযর্ন্ত শেখ হাসিনার সবশেষ ভারত সফরের পর ঢাকার পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে মন্তব্য করেছিলেন ওই সফরে ‘ভারতেরই সব সুবিধে হয়ে গেল।’

‘যেন বাংলাদেশ সরকারের কাজই হওয়া উচিত ভারতের অসুবিধা করাÑ যেমনটা পাকিস্তান চায়!’

‘আর বিএনপির এ ধরনের মনোভাব না-পাল্টালে তাদের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিও কখনো বদলাবে না’, বলেই মুচকুন্দ দুবে-সহ দিল্লির অনেক বিশেষজ্ঞর ধারণা। বিবিসি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1164 বার