fbpx
 

বিমান ও বেবিচক নিয়ে দুদকের প্রতিবেদন সীমাহীন দুর্নীতি ১৯ খাতে

Pub: সোমবার, মার্চ ৪, ২০১৯ ২:২৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: সোমবার, মার্চ ৪, ২০১৯ ২:২৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় দুর্নীতি হয় * প্রতিরোধে ১৯ দফা সুপারিশ * সুপারিশ পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা : বিমান প্রতিমন্ত্রী

শীর্ষ খবর ডেস্ক : বিমানের ক্রয় ও লিজের পছন্দের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছেন কতিপয় বোর্ড পরিচালক। বিমান ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটার নামে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়।

বিমানের বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করে কার্যাদেশ প্রদান দিয়ে থাকেন। বারবার দুর্নীতি করতে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের ইকুইপমেন্ট কিনে থাকেন তারা। গ্রাউন্ড সার্ভিসের নামে লাখ লাখ টাকা বিল করা হলেও বিমান বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী এয়ারলাইন্সগুলোকে ন্যূনতম সেবা দেয়নি। এসব দুর্নীতির কারণে বহু বিদেশি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায় না।

ফলে অনেক এয়ারলাইন্স ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে তাদের অপারেশন বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া টিকিট বিক্রি, কার্গো আমদানি-রফতানি, বিমান ফুড ক্যাটারিংসহ আরও বেশ কিছু খাতে বড় রকমের দুর্নীতি হচ্ছে। সিভিল এভিয়েশনের অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারের বিদেশে একাধিক বাড়ি রয়েছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। কাগজপত্র ঠিক রেখে কাজের কোয়ালিটি কমপ্রোমাইজ করে যেনতেন কাজের মাধ্যমে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নেন। দু’একজন ভালো সৎ ইঞ্জিনিয়ার থাকলেও অসৎদের দাপটে তারা প্রমোশন ও যথাযথ পদায়নবঞ্চিত। অন্যদিকে ভালো ঠিকাদার কর্তৃক দায়ের করা টেন্ডার থেকে প্রায়শ প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক কাগজ গায়েব করে দিয়ে টেন্ডার বাদ দেয়া হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। টিমের তৈরি করা প্রতিবেদনটি রোববার দুদকের কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে হস্তান্তর করেন। এতে দুর্নীতির ১৯টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের জন্য ১৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরীর সই করা প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, এসব দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরলে এই প্রতিষ্ঠানটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে ১৯ ধরনের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আটটি খাতে মোটা অংকের দুর্নীতি হয় বলে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াকে পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ঘুষ-দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং জনহয়রানি বন্ধে দুর্নীতি কমিশন গঠিত টিম এ প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনে প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদন ও সুপারিশের বিষয়ে পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। তিনি বলেন, দুদক যেসব সুপারিশ করেছে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা ইতিমধ্যেই বিমানে যাত্রীদের সেবা প্রদানে মান ও দ্রুত লাগেজ প্রদানের জন্য কাজ শুরু করেছি। বিমানের টিকিট বিক্রি না করার সঙ্গে কারা জড়িত সে বিষয়েও আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি। বিমানের ভাবমূর্তি নষ্টের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

বিমান ক্রয় ও লিজ খাতে দুর্নীতি : দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, বিমান, বিমানের স্পেয়ার্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টস ক্রয় এবং বিমান লিজের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। কম্পিউটার-নেটসর্বস্ব কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ফার্ম এসব ক্রয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিমানের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার নামে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কতিপয় বোর্ড পরিচালককে অনৈতিকভাবে কনভিন্স করে মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেয়। বড় অংকের অর্থ লগ্নি করে এ সব ফার্ম দরপত্রের স্পেসিফিকেশন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এমনভাবে নির্ধারণ করে, যাতে পছন্দসই কোম্পানি কাজ পায়। প্রাক্কলিত মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দেখানোর ব্যবস্থা করে নেয়। ফলে নিম্নমানের ইকুইপমেন্ট ২-৩ গুণ উচ্চমূল্যে ক্রয় করতে হয়। বিমানের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বোর্ড ডিরেক্টর এসব ফার্মের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মালিকানা/লভ্যাংশের অংশীদার বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমান লিজের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী ফার্ম কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে এমন শর্তে লিজ নেয়া হয়, যাতে বাংলাদেশ বিমানকে হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। ইঞ্জিনের মেজর চেকসাইকেল, এক্সপায়ারি ইত্যাদি হিসেবে না নিয়ে ইতিপূর্বে বিমান লিজ নেয়ার কারণে মেয়াদ শেষে হাজার কোটি টাকা দিয়ে নতুন ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন করে বিমান ফেরত দিতে হয়েছিল। এমনভাবে দরপত্র আহ্বান করা হয়, যখন ভালো কোম্পানির হাতে লিজ দেয়ার মতো বিমান থাকে না। বাধ্য হয়ে বেশি মূল্যে অসাধুদের পছন্দের কোম্পানি হতে নিম্নমানের বিমান লিজ নিতে হয়। এসব বিষয়ে প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ ও সরকারি নিরীক্ষা দল কর্তৃক অজস্র আপত্তি প্রদান করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা অনিষ্পন্নই থেকে যায়।

রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং খাতে দুর্নীতি : বিমান এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটায় শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিমানের বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করে কার্যাদেশ প্রদান করে থাকেন। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ অতি উচ্চ মূল্যে ক্রয় দেখিয়ে ঠিকাদার ও ম্যানুফ্যাকচারার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। তাছাড়া বিমান সি-চেকের জন্য তাদের পছন্দসই বিদেশি প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করে অতি উচ্চ মূল্যের বিল দেখিয়ে ভাগাভাগির মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

গ্রাউন্ড সার্ভিস খাতে দুর্নীতি : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুর্নীতির অন্যতম খাত হল- গ্রাউন্ড সার্ভিস খাত। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি (ইকুইপমেন্ট) ক্রয় করা হয়। অদক্ষতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ক্রয় না করে অপ্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ক্রয় করা হয়। ক্রয়কৃত ইকুইপমেন্টের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এমনকি রক্ষণাবেক্ষণের মূল্যবান উপকরণ বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রাদি নির্ধারিত সময়ের আগেই অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে আবার নতুন করে ক্রয় করতে গিয়ে দুর্নীতি করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ নিয়োগেও চলে ব্যাপক দুর্নীতি। এতে দিন দিন বাংলাদেশ বিমান অদক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার এ পরিণত হয়েছে। Round Service বিল বাবদ বিভিন্ন এয়ারলাইন্স হতে প্রতিদিন ফ্লাইট-টু-ফ্লাইট ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকা বিল গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে দেখা যায়, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স তাদের নিজস্ব লজিস্টিক সাপোর্টের মাধ্যমে গ্রাউন্ড সার্ভিসের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করে থাকে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চুক্তি অনুযায়ী অন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে ন্যূনতম সেবাও দিতে পারে না। এতে বহু বিদেশি এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে অপারেশন পরিচালনা করতে অনাগ্রহী। ইতিমধ্যে অনেক এয়ারলাইন্স ঢাকায় তাদের অপারেশন বন্ধ করে দিয়েছে।

কার্গো এক্সপোর্ট ইমপোর্ট খাতে দুর্নীতি : বিমানের আয়ের একটি বড় খাত হল কার্গো সার্ভিস। কিন্তু এই খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা এয়ারওয়ে বিল কম পাচ্ছে বিমান। অনেক সময় বিমানের কার্গো সার্ভিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী, আমদানি/রফতানিকারকদের সঙ্গে যোগসাজশে ওজনে কম দেখায়। আবার কখনও একক পরিবর্তন করে (টন কে সিএফটি, সিএফটি কে টন) কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া আমদানি ও রফতানি পণ্যের ওজন ও ভলিয়ম রেকর্ডভিত্তিক কম দেখিয়েও বেশি পরিমাণ মালামাল বিমানে ওঠানো হয়। এই অতিরিক্ত টাকা আমদানি/রফতানিকারকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করা হয়।

যাত্রী খাতে দুর্নীতি : ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার ও লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসাব এদিক-সেদিক করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিদিন ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারের সংখ্যা যতজন হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে খাবারের বিল করে অতিরিক্ত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। লে-ওভার প্যাসেঞ্জারদের জন্য নিয়ম অনুযায়ী হোটেলের প্রতি রুমে একজন রাখার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রতি রুমে ৪-৫ জন রাখা হয়। আর বিল তৈরি করা হয় জনপ্রতি। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্যাসেঞ্জারদেরকে খাবার ও হোটেল দেয়া হয় না, কিন্তু যথারীতি বিল জমা দিয়ে অর্থ উত্তোলন করে তা আত্মসাৎ করা হয়।

অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ : যাত্রীরা অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যাগেজ নিয়ে বিমানে ওঠেন। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ গ্রহণ করে তা মূল হিসাবে না দেখিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। অন্যদিকে যাত্রীদের বুকিং ট্যাগ এবং ফ্লাইট ডিটেইলে অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শন করা হয় না। এতে আরও দ্ইু ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। প্রথমত, কোনো যাত্রীর ব্যাগ মিসিং হলে তিনি ট্যাগ না থাকার কারণে অতিরিক্ত ওজনের অংশের ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন। দ্বিতীয়ত, ফ্লাইট ডিটেইলে সঠিক ওজন ইনপুট না দেয়ার প্রেক্ষিতে ফ্লাইট মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে।

টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে দুর্নীতি : প্রায়ই বাংলাদেশ বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না। এমনকি অনলাইনেও টিকিট পাওয়া যায় না। অথচ বাস্তবে বিমানের আসন খালি যায়। এক্ষেত্রে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের টিকিট বিক্রির সুবিধা করে দেয়া হয়। বিমানের কর্মকর্তারা কমিশন নিয়ে এসব কাজ করে থাকেন। এ খাতে ফ্ল্যাসবেগের সুযোগ থাকায় অনিয়ম বেশি হয়। সাধারণত নিয়োজিত এজেন্ট ফ্ল্যাসবেগের মাধ্যমে আসন ব্লক করে রাখে। পরে টিকিট বিক্রি না হওয়ার কারণে আসন খালি যায় এবং বিমান রাজস্ব অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশ বিমান অন্যান্য এয়ারলাইন্সের তুলনায় এজেন্টদেরকে কম কমিশন দেয়। এ কারণেও এজেন্টরা বিমানের টিকিটের পরিবর্তে অন্য এয়ারলাইন্সের দেয়া বেশি কমিশনে টিকিট বিক্রিতে আগ্রহী হয়। বিমানের আসন খালি নেই বলে যাত্রীদের ভুল তথ্য দিয়ে অন্য এয়ারের টিকিট কিনতে প্রভাবিত করা হয়।

ফুড ক্যাটারিং খাতে দুর্নীতি : নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের কারণে অনেক দেশি-বিদেশি বিমান বিএফসিসি থেকে খাবার না নেয়ায় বাংলাদেশ বিমান কেবল বিএফসিসি খাতেই কোটি কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। অন্যদিকে বিএফসিসি থেকে ঢাকাস্থ নামিদামি হোটেলসমূহে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার খাবার বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। আত্মসাৎকৃত অর্থ বিএফসিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও পেয়ে থাকেন। এসব খাতে কোনো নজরদারি নেই। তাছাড়া বিএফসিসিতে আন্তর্জাতিক মানের শেফও নেই। ফলে রান্নার গুণগত মান ভালো না।

এছাড়া সিভিল এভিয়েশন অথরিটির ১১টি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক। খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক্রয়, নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক কাজ, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরের স্পেস ও স্টল এবং বিলবোর্ড ভাড়া, কনসালটেন্ট নিয়োগ, কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণ, মন্ট্রিল কনভেনশন বাস্তবায়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, এয়ার ক্রাফট ও পাইলটের লাইসেন্স, ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি ও সিডিউল অনুমোদন এবং অপারেশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাওয়ার, বোর্ডিং ব্রিজসহ বড় বড় ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে। ঠিকাদাররা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় অংকের ঘুষ দিয়ে এসব ক্রয়ে টেন্ডারের স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলন প্রি-ডিফাইন করিয়ে নিয়ে কাজ পান। এরপর নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এক্ষেত্রে ঠিকাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর জন্যও অর্থ লগ্নি করে থাকেন।

সিভিল এভিয়েশনের অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারের বিদেশে একাধিক বাড়ি রয়েছে। কাগজপত্র ঠিক রেখে কাজের কোয়ালিটি কমপ্রোমাইজ করে যেনতেন কাজের মাধ্যমে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে থাকেন। দু’একজন ভালো সৎ ইঞ্জিনিয়ার থাকলেও অসৎদের দাপটে তারা প্রমোশন ও যথাযথ পদায়ন বঞ্চিত। অন্যদিকে ভালো ঠিকাদার কর্তৃক দায়ের করা টেন্ডার থেকে প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক কাগজ গায়েব করে দিয়ে টেন্ডার বাদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এভাবে ১১টি খাতে ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে।

এদিকে বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের দুর্নীতির ১৯টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ১৯ দফা সুপারিশ করে দুদক।

এতে বলা হয়, দুর্নীতি জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। অতীত ক্রয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বড় অসঙ্গতির দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ যাবতকালের অডিট আপত্তিগুলো গুরুত্বসহ বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয়। এতে আরও বলা হয়, বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের তালিকা, কখন কেনা হয়েছে, কী দামে কেনা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা হয়েছে, কত টাকা মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে- এসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দুর্নীতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং খাতে কেনাকাটার সময় আন্তর্জাতিক দরপত্রের নিয়ম সঠিকভাবে পরিপালন হচ্ছে কিনা তা পর্যালোচনার জন্য বিষেশজ্ঞ টিম গঠন করা দরকার। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য ই-টেন্ডারিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। বিমানের কার্গো ওজনের কাজটি নিয়মিত মনিটরিং করা প্রয়োজন। ওজন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে এ দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ রোধে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে আগমনী যাত্রীদের বুকিং ট্যাগ ও বহনকৃত ওজন পরীক্ষা করে মিল না পাওয়া গেলে বোর্ডিংপাস ইস্যুকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজের জন্য একটি নিরপেক্ষ টিম গঠন করতে হবে।সূত্র:যুগান্তর


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ