fbpx
 

নুসরাত রাফি হত্যাকাণ্ড ভয়ঙ্কর অপরাধী অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা

Pub: Saturday, April 13, 2019 1:28 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফাঁসির দাবিতে সারা দেশে মানববন্ধন * আ’লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ ও ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন গ্রেফতার * যৌন হয়রানি ও মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের তথ্য পেয়েও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন * হত্যার আগের দিন রাতে শেল্টার হাউসের (ঘটনাস্থল) ছাদে কেরোসিন ও ম্যাচ রাখা হয় * ২০০১ সাল থেকেই স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে চালিয়েছেন অপকর্ম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ ও রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ্দৌলা একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করেও পার পেয়ে যান তিনি। জামায়াত নেতা হলেও নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে ২০০১ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসম্পর্ক। আর কৌশল হিসেবে ওইসব নেতাকে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতেন তিনি।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, এলাকাবাসী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, তার (অধ্যক্ষ সিরাজ) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলেও কখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো তাকে বাঁচাতে বারবারই তার অনুগতরা তৎপর ছিল। এমনকি গত অক্টোবরে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার যৌন হয়রানির বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন অবগত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমন অন্তত ১০টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা।

শুধু তাই নয়, সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্দে মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠলেও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিম যুগান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছিল সেটি তদন্ত করে জানা গেছে, সেটি অর্থ আত্মসাৎ নয়, অনিয়ম হয়েছে। এই অনিয়ম রোধে সে সময় আমরা একটা নির্দেশনা দিয়েছিলাম।

অক্টোবরে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল সেটি বেনামি অভিযোগ ছিল। ভিকটিম পরিবার তখন বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। এ কারণে সেটি ওই সময়ে আর তদন্ত হয়নি। আর আমি তখন মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সভাপতি ছিলাম না। এখন আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে ও হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকা ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুক্রবারও অব্যাহত ছিল বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন। এদিন রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলম ও ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। মুকসুদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এই মুকসুদ আলমকে রাতেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে তার দুই সহযোগী ছিল পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন গঠন ও জামায়াতের পৌর সভাপতি আবদুল মান্নান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দুই নেতাকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেন পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। শেখ মামুনের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারায় দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তিনি তাকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সহসভাপতি করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে।

আর এভাবেই কৌশলে প্রভাবশালীদের কব্জা করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন। এমনকি দুই বছর আগে মাদ্রাসার তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই অধ্যক্ষ নিজে টিকে থাকতে এবং লুটপাট করতে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে রাফিকে পুড়িয়ে মারতে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সহযোগীরা অংশ নিয়েছে এটা এক রকম নিশ্চিত। এমনকি এ ঘটনাটি পুরোপুরি পরিকল্পিত।

ঘটনার আগের দিন স্থানীয়রা মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি এবং অধ্যক্ষের দুই সহযোগী নুরুউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমকে মাদ্রাসার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। তারা দু’জন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দু’জন পরীক্ষার আগের দিন রাতে ঘটনাস্থল ‘শেল্টার হাউস’র ছাদে কেরোসিন এবং ম্যাচ রেখে এসেছিল। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত যে চারজন বোরকা পরা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যখন সবাই রাফির শরীরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত তখন তারা বোরকা খুলে মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শুরু থেকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। এদিকে মানবাধিকার কমিশনের সংশ্লিষ্টরা শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছে, আগে ব্যবস্থা নেয়া হলে এ ধরনের ঘটনা হয়তো ঘটত না।

এদিকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় শুক্রবার অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূরউদ্দিন ও কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, এখন এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থী এবং তার পরিবারের অভিযোগ, ৬ আগস্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যায় ওই শিক্ষার্থী। দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওইদিনই গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান।

সোমবার লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে রাফি অগ্নিসংযোগকারী একজনের নাম বলেছে। দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে দেয়া বক্তব্যে রাফি বলেছেন, পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে চার দুর্বৃত্ত তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। একজনের নাম ‘শম্পা’। তারা সবাই নেকাব, বোরকা, হাতমোজা পরা ছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি ম্যানেজিং কমিটিতে সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন এবং তার সহযোগী জামায়াত নেতা ও পৌর জামায়াতের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানকে সদস্য করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বিপাকে পড়ে যায়। পরে ২০১২ সালে আলাউদ্দিন ও আবদুল মান্নানকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটিতে সদস্য করেন আওয়ামী লীগের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে।

জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয় জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা। তখন শেখ মামুনকে হাতে রেখে অন্যদের ঘায়েল করতে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। ২০১৫ সালে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় মামুনের। পরে অধ্যক্ষ তার দলে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। ২০১৮ সালে রুহুল আমিনকে মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও তার সহযোগী পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিনকে সদস্য করেন।

যত অপকর্ম : ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর মাদ্রাসার তহবিল থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিরাজের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম। অথচ পরে এ নিয়ে আর কিছুই হয়নি।

এমনকি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকা অবস্থাতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফেনীর মহীপালে ২০১৩ সালে উম্মল ক্বুরা নামে একটি মাদ্রাসা এবং ফাউন্ডেশন গড়ে তোলে। ওই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সে। সেখানেও বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবদুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে এক কোটি ৩৯ লাখ টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০১৫ সালে ফেনীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলা এখনও বিচারাধীন। এই মামলায় একাধিকবার সে কারাগারেও ছিল।

এদিকে ১৯৯৬ সালে ফেনী সদরের দৌলতপুর সালামতিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে অনিয়ম এবং ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

ফেনী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানিয়েছেন, সিরাজের বিরুদ্ধে তিনটি নাশকতার মামলা আছে।

মুকসুদ জেল হাজতে : রাফি হত্যা মামলার এজহারভুক্ত আসামি মুকসুদ আলমকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া ইসলামের আদালতে নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত আগামী সোমবার শুনানির দিন ধার্য করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব : ২০১৫ সালের পর থেকে কলেজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। অধ্যক্ষ নিয়ন্ত্রিত গ্রুপটির নেতৃত্ব দেয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। মাদ্রাসার নিজস্ব তহবিল থেকে সাততলা ভবন তৈরির অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে এই গ্রুপটি তৎপর হয়ে ওঠে।

মাদ্রাসা সূত্র জানায়, গত বছর পুরাতন ভবন ভাঙার কাজের ঠিকাদারি পান রুহুল আমিনের সহযোগী মুকসুদ আলম। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে পৌরসভায় অভিযোগ দেন শেখ আবদুল হালিম মামুন। পরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। মাদ্রাসা মার্কেট থেকে প্রতি বছর মার্কেটে আয় হতো এক লাখ টাকা। এই টাকার ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়েও দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব ছিল।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, আমি কাউকে শেল্টার দেইনি। আমি কোনো ভাগ-ভাটোয়ারাতেও নেই। ছয় মাস আগে কেন আমাকে কমিটিতে ঢোকানো হল এটাও রহস্যজনক।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি অধ্যক্ষের অপকর্মের বিরোধিতা করেন। তিনি কাউকে কখনোই শেল্টার দেননি বলেও দাবি করেন।

যৌন হয়রানির তদন্তে নির্বিকার প্রশাসন : অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত অক্টোবরে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা আরও এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছিল। ওই ছাত্রী স্থানীয় অন্য একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মেয়ে। ওই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করেছিলেন তিন শিক্ষক। পরে অধ্যক্ষ তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।

পরে বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ে ওঠে। সেখানে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পদাধিকারবলে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আক্তারুন্নেছা শিউলি ওই মিটিংয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে আলটিমেটাম দেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। এ বিষয়ে ওই ছাত্রীর বাবা শুক্রবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ওই সময় আমি অধ্যক্ষ সিরাজকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে তিনি অস্বীকার করেছেন। তখন তিনজন শিক্ষক এর প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে তাদের নাজেহাল করতে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরে আমরা আর এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ দিইনি। তবে জেলা প্রশাসন বরাবর এ নিয়ে একটি অভিযোগ গিয়েছিল। সেটার তদন্ত হওয়ার কথা শুনেছিলাম। পরে আর অগ্রগতি হয়নি।

প্রতিবাদকারী গণিত বিভাগের শিক্ষক বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে তিনজন কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছিলাম। আমরা চাই কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির শিকার না হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি করার দাবি তিনি তুলেছিলেন। পরে আর এ নিয়ে তদন্ত হয়নি।

নুরুদ্দিন ও মুকসুদ গ্রেফতার : রাফি হত্যা মামলার আসামি নুরুদ্দিন ও পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই শুক্রবার তাদের গ্রেফতার করে। পিবিআইয়ের একটি সূত্র জানায়, শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহের ভালুকা সিড স্টোর এলাকায় অভিযান চালিয়ে নুরুদ্দিনকে আটক করা হয়। পরে তাকে ফেনীতে আনা হয়। অপরদিকে বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকার মুকসুদকে একটি আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

সোনাগাজীতে মানববন্ধন : উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত আগুন সন্ত্রাসী ও কারাবন্দি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ফাঁসি দাবি করে সোনাগাজী বাজারের জিরোপয়েন্টে শুক্রবার সকাল ১০টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল মোতালেব রবিন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মীর এমরান, কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি নেয়ামত উল্লাহ ও চরচান্দিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি জীবন মিয়াজী প্রমুখ। এ সময় তারা নুসরাতের নামে মাদ্রাসাটির নামকরণ করারও দাবি জানান।

কাউন্সিলর মুকসুদ বহিষ্কার : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সোনাগাজী পৌর আ’লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উপজেলা আ’লীগের সভাপতি মো. রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারান্তরীণ থাকায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার স্থলে আমিনুল হক মানিককে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে বৃহস্পতিবার রাতে মুকসুদ আলমকে করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় : নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার সারা দেশ প্রায় উত্তাল ছিল। বিক্ষুব্ধ সাধারণ জনতা রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণবিরোধী পদযাত্রা, মানববন্ধন ও সভা করেছে। এসব কর্মসূচি থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ফাঁসির দাবি করা হয়। পাশাপাশি তার হুকুমে রাফির গায়ে আগুন ধরানো অপরাধীদেরও ফাঁসি দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যক্ষকে প্রশ্রয় দানকারী এবং তার পক্ষাবলম্বনকারীদের বিচার দাবি করা হয়েছে।

এদিন দুপুরে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ) বিভাগের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী পুনর্মিলনীর উদ্বোধনকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এমপি রাফি হত্যার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ফেনীর নুসরাত হত্যার ঘটনা আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা এ হত্যার বিচার চাই। তিনি বলেন, আমাদের সামাজিকভাবে এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে হবে। সমাজের প্রতিটা মানুষ যদি সচেতন হয় তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন ঢেলে হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ বিক্ষোভ করেন তারা। ‘সর্বস্তরের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে নারীদের জন্য নিরাপদ দেশ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। এ সময় শামসুন নাহার হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক ফাতিমা তাহসিন বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে ধর্ষক-নিপীড়কদের জায়গা হবে না। দল-মত নির্বিশেষে আমরা প্রতিবাদ করছি। ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

এদিন রাজধানীর শাহবাগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পদযাত্রা ও মানববন্ধন হয়। বেলা ১১টায় শাহবাগ থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে তা শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। গৌরব একাত্তর, পূর্ণিমা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ এ পদযাত্রায় অংশ নেন।

এর আগে সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), নিরাপদ বাংলাদেশ চাই, নিরাপদ নোয়াখালী চাই, সার্ক মানবাধিকার বাংলাদেশ, মুসলিম সাপোর্ট বাংলাদেশ, আলোকিত গোপালঞ্জ, যুব ঐক্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের কওমি ছাত্র পরিষদ, ইসলামী ছাত্র সেনাসহ কয়েকটি সংগঠন। এসব কর্মসূচি থেকে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির দাবি করা হয়। এ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিভিন্ন অফিস আদালতে যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি শিশুদেরও যৌন নির্যাতনকারীদের প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার দাবি করা হয়েছে।

ওদিকে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে শুক্রবার বরিশাল, সিলেট, যশোর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মাগুরা মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীরা এবং টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন করেছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ