খালেদা জিয়ার সিগন্যালে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত

Pub: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ ১:০৪ পূর্বাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে সংসদে যোগ দিয়েছে বিএনপি। ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচিতদের শপথ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঐক্যফ্রন্টের হয়ে নির্বাচন করা গণফোরামের দুই এমপি শপথ নেন আগেই। বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন শপথ নেবেন কিনা এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে
ছিল নানা জল্পনা, হিসাব-নিকাষ। দল এবং জোটেও ছিল এ নিয়ে টানাপড়েন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান জাহিদ সংসদে যোগ দিয়ে নতুন আলোচনার জন্মদেন। দলটির নির্বাচিত অন্য পাঁচজনও শপথ নিচ্ছেন এমন আলোচনা চাউর হয় রাজনৈতিক ময়দানে। রাজনৈতিক জটিল সমীকরণটি অনেকটা সহজ করে দিয়ে গতকাল সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।

সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন চার এমপি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার এবং বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। সন্ধ্যায় তাদের শপথ পড়ান স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। পরে রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে দলীয় সিদ্ধান্তেই এমপিরা শপথ নিয়েছেন বলে জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নিজেও দ্রুত সময়ের মধ্যেই শপথ নিচ্ছেন এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মতিতেই সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত দেন। এর আগে নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলেন তারেক রহমান।

এদিকে শপথ নেয়ার পরই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন চার এমপি। তাদের মধ্যে হারুনুর রশিদ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তোলেন। এর আগে শপথ নিয়ে বের হয়ে সংসদ ভবনের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আজকের এই দিনটির জন্য গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৩০শে ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির নির্বাচনে মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদ গঠিত হয়নি। তাই আমাদের দল ভোট ডাকাতির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমরাও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এতোদিন শপথ গ্রহণ করিনি। এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমতি ও নির্দেশক্রমেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছি। ১৭ কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলতে চাই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাতে চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কারো কারো উপর শপথ নেয়ার জন্য চাপ ছিল। সাদা পোশাকধারী ও অন্যান্য এজেন্সির লোকেরা আমাদের কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে শপথ গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিল।

পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নির্বাচনই ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র পথ। তাই সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল একটি কলঙ্কজনক প্রহসনের নির্বাচন। যা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলও প্রহসনের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই নির্বাচনের ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। দল মত নির্বিশেষে সকল ভোটারকেই জোর পূর্বক এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যা ক্ষমতাসীন মহলের কারো কারো মুখ থেকেও স্বীকারোক্তি হিসাবে বেরিয়ে এসেছে। নজিরবিহীন সন্ত্রাস, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ সর্বপরি নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে ভোটের দিনের আগের রাতেই ভোটের ফলাফল একতরফাভাবে তাদের পক্ষে সাজিয়েছে সরকার। আমরা সংগত কারণেই ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণের ক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এবং জাতীয় সংসদে আমাদের মনোনীত বিজয়ী প্রার্থীদের শপথ গ্রহণ না করার জন্য আহ্বান করেছিলাম। তিনি বলেন, আমাদের দল একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা বিশ্বাস করি নির্বাচনই ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র পথ। কিন্তু ক্ষমতাসীন মহল নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আজ এমনভাবে দলীয়করণ করেছে যে, গোটা নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান আজ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা প্রলম্বিত করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার জন্য সকল পদ্ধতিও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে এই সরকার তার গ্রহণযোগ্যতার জন্য ভোটারবিহীন এই সংসদকে সচল দেখাতে চায়। এইটুকুই কেবল আজ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার নূন্যতম সুযোগ হিসাবে বিরোধী জনমতের জন্য অবশিষ্ট আছে।
আমরা বরাবরের মতোই দাবী করছি, দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে জনগণের সংসদ নির্বাচন করাই এই সংকট সমাধান করার একমাত্র পথ। তাই একদিকে নতুন নির্বাচনের দাবী ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের অব্যাহত দাবী অন্যদিকে দেশের চলমান অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক চরম সংকট যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকলুট, নারী নির্যাতন, গুম-খুন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে একটি কার্যকরী ও জোরালো গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত হতে হবে।

ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করছি। জাতীয় রাজনীতির এই সংকটময় জটিল প্রেক্ষিতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা, মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমদের দল সংসদে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করি দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় অবিলম্বে একটি অবাধ জাতীয় নির্বাচন আদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রীসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্ত করে আমরা আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া ঘোষিত জাতীয় ঐক্যমতের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

সাংবাদিকদের প্রশ্ন, ফখরুলের উত্তর
বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে, তাহলে এখন বিএনপি কিভাবে শপথ নিচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর লিখিত বক্তব্যের কাগজটি দেখিয়ে বলেন, এখানে সব তো ব্যাখ্যা করেছি। মানুষ যেহেতু ভোট দিতে পারেনি সেহেতু অবৈধ সংসদ বলেছেন, এখন কিভাবে সে সংসদে যাবেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্র চর্চার সবগুলো পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। আমরা সংসদে গণতন্ত্র চর্চার স্পেসটুকু ব্যবহার করার জন্য সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শেষমুহুর্তে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নেতৃত্বের অদূরদর্শীতাকে প্রকাশ করে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা এটা গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য যাচ্ছি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, বিভিন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি ও কর্মীদের মতামত নিয়েছি। দলের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল নেতাকর্মীরা কিভাবে নেবেন বলে মনে করেন- জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আশাকরি ভালোভাবেই নেবেন। এই সিদ্ধান্ত দলে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা আপনি বলতে পারেন, ভবিষ্যৎ বলতে পারে, আমি তো এখন বলতে পারবো না। তবে আমি আশা করি না।

রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিনিময়ে বিএনপি সংসদে যাচ্ছে- এ ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন, এটা গুঞ্জনই। শপথ নেয়ার সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইগুলো এক নয়। সংসদে যাওয়ার মধ্যে সরকারের সঙ্গে কোন ধরনের সমঝোতা আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমঝোতা পেলেন কোথায়? আমরা বলেছি, সংসদে এবং সংসদের বাইরে দুই জায়গাতেই আমরা লড়াইটা করতে চাই। এটা (সংসদ) একটি জায়গা। আমরা আমাদের কথাগুলো বলার জন্যই সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

শপথের জন্য কোন চাপ আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের উপর এখন কোন চাপ নেই। মহাসচিব, তাহলে কি আপনি কোন চাপে নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি? আমি তো মহাচাপে আছি। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা, আমাদের নেত্রী এখন জেলে। আজ (সোমবার) বিকালেই দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার সংসদে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এ ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন, এটা সিদ্ধান্তের আগের বক্তব্য। বিএনপি মহাসচিব শপথ নিচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সময় আসুক জানতে পারবেন। তিনি শপথের জন্য আবেদন করেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বলেছি তো- সময় হয়েই জানতে পারবেন। তিনি সময়ের জন্য আবেদন করেছেন কিনা- জানতে চাইলে মির্জা আলমগীর বলেন, আমি কি করেছি না করেছি সময় হলেই জানতে পারবেন।

দলীয় সিদ্ধান্তে শপথ নেয়া হলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমানকে যে বহিষ্কার করা হলো তার কি হবে- এই প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সময় মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ২০ দলীয় জোটের শরিক দল এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বিএনপির এমপিদের শপথগ্রহণকে হঠকারি সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন, এই ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন- এটা উনার বক্তব্য। বিএনপি নেতারা প্রথমে শপথ নেয়া জোটের দুই নেতাকে জাতীয় বেঈমান আখ্যায়িত করেছে, এখন বিএনপির এমপিদের জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত করা হবে বলে মনে করেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর বলেন, পলিটিক্সে কালকে যেটা হবে সেটা আজকে বলা যাবে না তো। আমরা আজকে যেটা বলছি, কালকে অবস্থার প্রেক্ষিতে সেটা আমাদের পরিবর্তনও করতে হতে পারে। প্র্যাকটিক্যাল পলিটিক্স এটা। আমাদের যেটা প্রয়োজন দলের জন্য, রাজনীতির জন্য, দেশের জন্য সেটাই করেছি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ