fbpx
 

সমাজ বদলে অঙ্গীকারবদ্ধ তিন সংগ্রামী তরুণী

Pub: Tuesday, May 28, 2019 7:08 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সমাজ পরিবর্তনে সবরকম সহিংসতা প্রতিরোধ, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণে চেঞ্জমেকার হিসেবে কাজ করছেন মরিয়ম আক্তার মিতু, হিমা সিংহ ও হাসি রায়।

এখন তারা ক্লাস করছে : মরিয়ম আক্তার মিতু

কুমিল্লার হুচ্ছা মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার মিতু। সমাজের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন তিনি। ‘দৃষ্টি’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত উঠোন বৈঠকে মাসে দুদিন সভায় অংশ নেন। এ সভার আলোচনায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, কম বয়সে বিয়ে দিলে কি হয়? বেকার মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল করার জন্য হাতের কাজের ওপর প্রশিক্ষণ, ঝরেপড়া শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি বিষয়গুলো উঠে আসে।

এ প্রসঙ্গে মরিয়ম আক্তার মিতু জানান, গত বছর দিনাজপুরে অক্সফামের ‘তৃণমূল নারী’ নেতৃত্ব বিষয়ক চারদিনের একটি প্রোগ্রামে কুমিল্লা থেকে দু’জন অংশ নেই। এখানেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট আয়োজিত তিনদিনের কর্মশালায় অংশ নিয়ে নতুন আইন, মূলভাব, মানুষের অন্ধবিশ্বাস (বাবা-মা এ কাজ করেছেন, আমাকেও করতে হবে) ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন।

নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য স্থানীয় মেম্বার লিটন, পুতুল এবং কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিলকে নিয়ে ‘চামেলী নারী আড্ডা’ দল নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে সবাইকে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর প্রতিরোধে কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রতিবন্ধী তিন শিশুকে স্থানীয় মেম্বারের সহায়তায় বজ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।

প্রধান শিক্ষক এ তিন শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাতে চাচ্ছিলেন না। প্রধান শিক্ষক তিন প্রতিবন্ধী শিশু সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশু স্কুলে ভর্তি করালে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দেবে। এর চেয়ে ক্লাস করতে না দিয়ে শুধু পরীক্ষায় অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া যায়।’ বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন তারা ক্লাস করছে। উঠোন বৈঠকে একজন নারী অভিযোগ করেন রিকশা চালক স্বামী নেশা করে তাকে মারধর করে। ব্যবসার জন্য টাকা চায়। টাকা দিলে নেশায় খরচ করে। তিনি স্বামীর ঘর করবেন না। কুমিল্লার আদালতে তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আইনি সালিশির মাধ্যমে তার স্বামী স্বীকারোক্তি করে তিনি আর নেশা করবেন না। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তারা এখন ভালো আছেন।

এভাবে এলাকার সমস্যা দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন মরিয়ম আক্তার মিতু। ওর মা হাসিনা আক্তার কুমিল্লার ব্র্যাকে ডেলিভারি সেন্টারের ধাত্রী। মায়ের গর্ভে থাকতেই বাবাকে হারায় সে। মা, বড় বোনদের স্নেহ, ভালোবাসায় বেড়ে ওঠেন তিনি।

একতাবদ্ধ হয়ে দ্রুত কাজ করা যায় : হিমা সিংহ

দিনাজপুরের কেবিএম কলেজের অর্থনীতিতে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিমা সিংহ। চেঞ্জমেকার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন জোটের ক্রিয়ের্টিং স্টেট প্রকল্পের আওতায় অক্সফাম কানাডার আর্থিক সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ‘পল্লীশ্রী’ ২০১৮ সালে স্থানীয় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘নারী নেতা, যুবদল’ গঠন করে। যারা সমাজের উন্নয়নে কাজ করবে। দিনাজপুরের ৪নং শ্বেতপুরা ইউনিয়নের চারটি গ্রামে একটি যুবদল, দুটি নারী নেতা দল গঠন করা হয়। তিনিও এই দলের সদস্য হন।

‘পল্লীশ্রী’ থেকে ‘দিঘন এসটি উচ্চ বিদ্যালয়ে’ এসে কয়েকজন কর্মী প্রতি মাসে একটি সভা করেন। সভায় বাল্যবিয়ে বন্ধ, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ, নারীর ক্ষমতায়ন আলোচনায় ইত্যাদি বিষয় উঠে আসে। যারা কাজ করতে আগ্রহী, কর্মক্ষম তাদের পল্লীশ্রী থেকে তিন মাসের ব্লক, বাটিক, পুঁতির গহনা তৈরি ইত্যাদি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

পল্লীশ্রী’র ক্রিয়েটিং স্টেট প্রকল্পের ‘যুবদল’, ‘নারী নেতা দল’ এর সদস্য হয়ে আমরাই পারি পারিবারিক প্রতিরোধ জোট এর আওতায় গাজীপুরে তিন দিনের কর্মশালায় এসেছিলেন হিমা সিংহ। এ প্রসঙ্গে হিমা সিংহ বলেন, আমার পরিবারের কোনো সদস্য নির্যাতনের শিকার হলে তা আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করব। নিজের পরিবারের সমস্যা সমাধান হলে যুবদলের সদস্যরা সবাই মিলে এলাকার অন্য পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করব।

স্লোগানের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, ‘ঘরে-বাইরে-বাসে-ট্রেনে নারীর স্থান সব খানে’/ ‘আমরা কে আমরা কে চেঞ্জমেকার চেঞ্জমেকার’/ ‘এসো সবাই মিলে হাতে হাত রাখি’/ ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করি।’ এই কর্মশালায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগুলো সম্পর্কেও জানতে পারি। খেলার মাধ্যমে শেখানো হয় হঠাৎ কোনো কাজ এলে তা একতাবদ্ধ হয়ে দ্রুত করা যায়। নারী-পুরুষ উভয়ে সমান।

যুবদলের সদস্য হয়ে হিমা সিংহ এলাকার মানুষের তাদের অধিকার সম্পর্কে অবগত করছেন। জন্মের পর ৪৮ দিনের মধ্যে বিনা পয়সায় নবজাতকের জন্মনিবন্ধন করা। কোনো পরিবারে নারী নির্যাতনের ঘটনা শোনামাত্র যুবদল ও নারী দলের সদস্যদের সেই পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন নির্যাতন করা হচ্ছে। যুবদলের সদস্যদের সঙ্গে হিমাও নির্যাতনকারীর পরিবারের সদস্যদের আলোচনার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এতে তারা নিজেদের সংশোধন করলে পরবর্তীতে আর আইনি সহায়তার দ্বারস্থ হন না। পারিবারিক নির্যাতন না কমলে এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সালিশি বসিয়ে তা প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। এরপরও নির্যাতন বন্ধ না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়।

পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা জন্মাচ্ছে : হাসি রায়

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যারা বাল্যবিয়ে দেন সেই অভিভাবকদের বোঝানো, যৌন হয়রানি ইভটিজিং বন্ধে পাড়ার বড় ভাই, কাকা, মামা, পুরুষদের বোঝানো তারা যাতে মেয়েদের সঙ্গে খারাপ আচরণ না করে। মেয়েরা যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে এভাবেই এলাকার মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি করছেন দিনাজপুরের কিষানবাজার পূর্ব রামনগরের মেয়ে হাসি রায়।

হাসি রায় দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের আইএ’র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এই কাজে অভিভাবকরাও তাকে সমর্থন করছেন।

‘পল্লীশ্রী’র মাধ্যমে আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট-এর তিন দিনের কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন হাসি রায়। এ প্রসঙ্গে হাসি রায় বলেন, এই কর্মশালায় অংশ নিয়ে জানতে পারি, নিজেকে পরিবর্তন করা, বাবা-মাকে পরিবর্তন করা এরপর এলাকাবাসীকে পরিবর্তন করা। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সহযোগিতা পাচ্ছি। কারণ তারা দেখছেন এর মাধ্যমে সমাজের ভালো করছি।

পরিবারের বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা জন্মাচ্ছে। আমাদের এলাকায় মাস দুয়েক আগে বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে চেয়ারম্যান, মেম্বারকে জানাই। সবাই মিলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করি। অভিভাবক বলেছে, ‘ভালো ঘর পেয়েছি। আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দেব।’ তাদের বুঝিয়ে বিয়ে বন্ধ করে সবাই বাড়ি ফিরে এসেছি। কাজীকে ঘুষ দিয়ে বিয়ে পড়াতে রাজি করায়। মধ্যরাতে অভিভাবক মেয়ের বিয়ে দেন। ওই রাতেই মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এভাবে অনেক সময় উদ্যোগ নিলেও বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে পারি না। এরপরও আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মেয়েরা যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে এজন্য এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ