fbpx
 

আবারও ভোটারবিহীন নির্বাচন

Pub: Friday, June 28, 2019 12:44 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: নির্বাচন বা ভোট থেকে কি পুরোপুরি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ? সদ্যসমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনের পর এ প্রশ্নটি জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন এবং ভোটাভুটির ব্যাপারে তাদের আগ্রহ অপরিসীম। বছর দশেক আগেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চায়ের কাপে ঝড় তুলতো সাধারণ মানুষ। রাজনীতি ছিল মানুষের আলোচনার প্রধান বিষয়। বৃহত্তর পরিসরের রাজনীতি তথা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তারা কথাবার্তা বলতেন নির্ভয়ে। স্থানীয় রাজনীতি অর্থাৎ উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, শহর এলাকায় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা নির্বাচন, সম্ভাব্য প্রার্থী এসব নিয়ে মানুষ আলোচনায় মেতে উঠতো নির্বাচনের অনেক আগে থেকেইÑ বলা যায় মানুষের আলাপ-আলোচনায়ই দেশে নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি হতো। প্রার্থীদের এলাকায় আনাগোনা শুরু হতো, নিজেকে যোগ্য প্রার্থীই শুধু নয়, ভোটারদের আপনজন হিসেবে প্রমাণ করতে কি প্রাণান্ত চেষ্টাই না করতেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
তবে এখন সেই চিত্র অনেক বদলে গেছে, আগে নির্বাচন হলে প্রার্থীরা ঢাকা থেকে নিজ নিজ এলাকামুখো হতেন ভোটারদের দোয়া পেতে। আর এখন অবস্থা উল্টো, সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন ঢাকামুখো হন প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ পেতে। আর হবেনই না কেন? প্রায় সব ধরণের নির্বাচনেই বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল বা জোটের প্রার্থী হতে পারা মানেই জয়ী হওয়ার নিশ্চয়তা, অনেক ক্ষেত্রে একেবারে বিনাভোটে জয়ী হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশে ভোটারদের এই নির্বাচন বিমুখতার সাম্প্রতিক সূচনা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় থেকে। একতরফা অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এমনকি রাজনীতি বিশ্লেষকরাও বলেছেন, বিএনপির মতো একটা দল নির্বাচন বর্জন করায় ভোটাররা নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ওই নির্বাচনে তারা ভোট দিতে যাননি।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আগের সংকট কাটানোর প্রত্যাশা নিয়ে। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেয়। মানুষের ধারণা ছিল, নির্বাচনের ফলাফল যাইহোক দীর্ঘ দিন পর তারা হয়তো আবার ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু এ নির্বাচনেও কি মানুষ ভোট দিতে পেরেছে? বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ, ভোটের আগের রাতেই বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল ব্যালটপেপার দিয়ে, কেউ ভোট দিতে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মাঝেই নির্বাচন কমিশন উপজেলা নির্বাচন নিয়ে মাঠে নামে। অনেকে বলেন, হুট করে উপজেলা নির্বাচন দেয়ার কারণ যতোটা না নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা তারচে’ অনেক বেশি ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলা সমালোচনা ও বিতর্ককে আড়াল করা। তবে কমিশনের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে হওয়া বিতর্ককে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে, বিতর্কের আগুনে যেন ঘি ঢেলেছে।
যাইহোক, ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৭৮টি উপজেলায় নির্বাচন হয়। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন দেখার পর এটা মোটামুটি নিশ্চিত বোঝা গেছে যে, মানুষ ভোট দেয়ার ব্যাপারে আর খুব একটা আগ্রহ দেখাবে না, তারপরও নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা ছিল স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়ায় এ নির্বাচনে মানুষ হয়তো ভোট দিতে আসতেও পারে। তবে উপজেলা নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও ভোটটা হয় রাজনৈতিক দলের প্রতীকে, আগে এ নির্বাচনটা রাজনৈতিক প্রতীকে হতো না কিন্তু এই প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক প্রতীকে হলো। আর বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতীক মানেই নৌকা আর ধানের শীষ! কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর ’নৌকা’ আর ’ধানের শীষ’ এর লড়াইটা রাতের ভোটের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় উপজেলা নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়ে। তার ওপর এ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ফলে এ নির্বাচন যে আরেকটা ৫ জানুয়ারি বা ৩০ ডিসেম্বর ধরনের কিছু একটা হতে যাচ্ছে এ ধারণা প্রবল হচ্ছিলো।
আওয়ামী লীগ যখন দেখলো নির্বাচনটা আসলে কিছু হচ্ছে না তখন তারা কিছুটা নির্বাচনের আবহ তৈরির জন্য কৃত্রিম উপায় উদ্ভাবন করে। চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী দিলেও ভাইস চেয়ারম্যান পদটি উন্মুক্ত করে দেয়, অর্থাৎ এ পদের জন্য আওয়ামী লীগ কাউকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেনি। বিএনপি না থাকলেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা অনেক স্থানে চেয়ারম্যান পদের জন্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে বিদ্রোহী প্রার্থীর জয় হলেও তা হয়ে যায় নৌকার পরাজয়, তাই রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন কেউই নৌকার হার মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। এতে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নৌকার প্রার্থীর চক্ষুশুলে পরিণত হন।
যাইহোক ১০ মার্চ শুরু হয়ে ১৮ জুন পর্যন্ত পাঁচ ধাপে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে অর্থাৎ ১০ মার্চ ভোট হয় রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৭৮ উপজেলায়। অবশ্য এরমধ্যে ১৫জন চেয়ারম্যান ও ১৩জন ভাইস চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচন হয় ১৮ মার্চ। এ দিন ভোট হয় ১১৬টি উপজেলায়। এর মধ্যে ২৩টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ১৩জন ভাইস চেয়ারম্যান ও ১২জন নারী ভাইস চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে প্রথম ধাপের চে’ ভোটার উপস্থিতি আরো কম হয় বলে বাস্তবে দেখা গেলেও নির্বাচন কমিশনের দাবি হলো, প্রথম ধাপের চে’ দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতি ছিল বেশি। ওই দিন নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে একজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত হন।
২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ২৫ জেলার ১১৬ জেলায় ভোট গ্রহণ করা হয়। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের ৩১জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচন হয় ৩১ মার্চ। এদিন ১২৮টি উপজেলায় ভোট হওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে ছয় উপজেলার নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়, ১৫ উপজেলায় সব পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে ভোট হয় ১০৭ উপজেলায়। এই ১০৭টি উপজেলার মধ্যে আবার ২৪টিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, অর্থাৎ তফসিল অনুযায়ী এদিন ১২৮টি উপজেলায় নির্বাচনের দিন থাকলেও চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হয় ৮৩টি উপজেলায়। নারীসহ ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ৪৯জন। পঞ্চম অর্থাৎ শেষ ধাপের নির্বাচন হয় গত ১৮ জুন। এদিন ২০টি উপজেলায় নির্বাচন হয়।
পরিসংখ্যান এবং বাস্তবতা
উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কেমন ছিল সে সব বিষয়ে দেশের গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। সেইসব চিত্র বলে দেয়, ভোটার উপস্থিতি হতাশাজনক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ভোটের যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে তাতে দেখা যায় প্রথম ধাপে ভোট পড়েছে ৪৩ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৪১ শতাংশ, তৃতীয় ধাপেও ভোট পড়ে ৪১ শতাংশ।
ধাপে ধাপে উপজেলা নির্বাচনের আয়োজন করা শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছরও পাঁচ ধাপে নির্বাচন হয়েছিল সব ধাপ মিলিয়ে ওই বছর উপজেলা নির্বাচনে গড়ে ৬১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ২০০৯ সালে একদিনে সারাদেশে উপজেলা নির্বাচনের ভোট হয়েছিল। সে বছর ভোট পড়েছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ উপজেলা নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতির হারের সূচক নি¤œমুখী। তবে সদ্যসমাপ্ত অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির সূচককে নি¤œমুখী বলার সুযোগ নেই, বলা যায় ভয়াবহ ধস নেমেছিল ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে, শেয়ারবাজারে দর কমলে আমরা তাকে দরপতন বলি, এবার উপজেলা নির্বাচনে যা হয়েছে তাতে একে ভোটার উপস্থিতির পতনই বলা যায়। যদিও নির্বাচন কমিশন দাবি করছে, ৪১-৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছে, বাস্তবে যারা ভোট কেন্দ্রের পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখেছেন তাদের কেউই নির্বাচন কমিশনের এমন দাবিকে সত্য বলে মেনে নিতে পারছেন না। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের হিসাব মতে, উপজেলা নির্বাচনে ভোটের হার ৫% থেকে ৭% শতাশেংর বেশি নয়।
পরিসংখ্যান আর বাস্তবতায় অনেক সময় মিল পাওয়া যায় না, তারপরও পরিসংখ্যানের প্রয়োজন আছে, পরিসংখ্যানই ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদি পরিসংখ্যানের এই উপযোগিতাকেই আমরা আমলে নিই তাহলে বলা যায় নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজনে সফল না হলেও ডাহা মিথ্যা পরিসংখ্যান দাঁড় করানোয় সফল তারা। তারা যে ভোটের হার বলছে মানুষ তা এখন বিশ^াস করছে না এবং মিথ্যাচার বলে আখ্যায়িত করছে, যদিও ভবিষ্যতে এই পরিসংখ্যানটাই ব্যবহার হবে। ইসির যে কথা বা তথ্য মানুষ এখন বিশ^াস করছে না একদিন এসব মিথ্যা তথ্যই ব্যবহৃত হবে, উদাহরণ হিসেবে সামনে টেনে আনা হবে।
ইসির খুশি
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ’অল্পতে তুষ্ট থাকা’ সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচন আর তাতে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্ভার মন্তব্যে মনে হয় কমিশন এই ’অল্পতে তুষ্ট’ হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। কমিশন সচিব তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়লো তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। কমিশনের কাছে বিবেচ্য হচ্ছে নির্বাচনটা সুষ্ঠু বা শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে কি না তা, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে তাতেই তারা খুশি বলে জানান সচিব। ভোটারের হার কম হলে তা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না দাবি করে ইসি সচিব বলেছিলেন, শতকরা কত ভাগ ভোট পড়তে হবে সে ব্যাপারে কোন আইন নেই, কত শতাংশ ভোট পড়লে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কোন আইনে তা বলা নেই। সম্ভবত: আইনে এমন কিছু না থাকায় বড় বাঁচা বেঁচে গেছে নির্বাচন কমিশন।
তবে ভোটার উপস্থিতির হার তাদের কাছে কোন বিবেচ্য বিষয় না হলেও ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে বিএনপি বা ওই দলের নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিকা ঠিকই বের করে ফেলেছেন ইসি সচিব। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, একটি জোট নির্বাচনে অংশ নেয়নি, ইসি সচিবের অভিযোগÑ তারা শুধু নির্বাচনই বর্জন করেনি ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে না যায় সেজন্য তারা প্রচারণাও চালিয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনে হতাশাজনক ভোটার উপস্থিতিকে অবশ্য নির্বাচন কমিশন তাদের ব্যর্থতা বলে মনে করে না। ওই নির্বাচনের পর কমিশন সচিবালয় থেকে বলা হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনে নানা দলকে নিয়ে আসার ব্যাপারে কমিশনের দায় থাকে কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কে প্রার্থী হবে আর কে হবে না সে ব্যাপারে কমিশনের কোন দায় থাকে না। তাই এ নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিত করার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের তৎপরতাটাই মুখ্য।
উপজেলা নির্বাচনের সব ধাপ শেষ হওয়ার আগেই ইসি সচিব পদে আসে নতুন মুখ। ইসি সচিব হেলালউদ্দিন আহমেদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব হন, নির্বাচন কমিশন সচিব হয়ে আসেন মোহাম্মদ আলমগীর। কমিশনের সচিব পদে নতুন মুখ আসলেও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কমিশন সচিবদের বক্তব্যে নতুন কোন ভাষা আসেনি, হেলালউদ্দিনের মতো মোহাম্মদ আলমগীরও অনেকটা নির্লজ্জভাবে বলেছেন উপজেলা নির্বাচনের শেষ ধাপ খুব ভাল হয়েছে।
‘কর্তৃত্ববাদী শাসনে অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ’
বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই গোটা কমিশনে একমাত্র কমিশনার মাহবুব তালুকদার জনমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সত্য কথাগুলো প্রকাশ করেছেন। যদিও তার একার বক্তব্য কমিশনের কর্মকা-ে কোনো প্রভাব ফেলছে না। বরং তাকে ভিন্ন মতাবলম্বী হিসেবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন কমিশনের অন্যরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও তিনি বিভিন্ন সময় এমন সব কথা বলেছেন যা কমিশনের মধ্যে বিরোধ হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে। তার কাজ, ভূমিকা ও অবস্থানের জন্য আওয়ামী লীগ মাহবুব তালুকদারকে বিএনপিপন্থী হিসেবে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। কিন্তু, সাধারণ সচেতন মানুষ তার অবস্থানকে ‘সত্যের পক্ষে সাহসী ভূমিকা’ বলেই গ্রহণ করেছে।
উপজেলা নির্বাচনের বেলায়ও দেখা গেছে মাহবুব তালুকদার বাস্তবচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে কমিশন সচিব এমন দাবি করলে একইদিন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোটাররা ভোট দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, ভোটারদের নির্বাচন বিমুখীতা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলেও মনে করেন মাহবুব তালুকদার। অবশ্য নির্বাচন কমিশন সচিব পরে সাংবাদিকদের বলেন, মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মন্তব্য। কমিশনে এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি।
এবারের নির্বাচনে একশ’রও বেশি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় নিজের হতাশা চেপে রাখতে পারেননি মাহবুব তালুকদার। তিনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয় তা নির্বাচন হয় কী করে? প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীনদের ইংরেজিতে ইলেকটেড না বলে সিলেকটেড বলা যেতে পারে বলেও মত দেন সাবেক এই আমলা।
সব ধাপের নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, এবারের নির্বাচনের সবচে’ আশংকার দিক হচ্ছে ভোটারদের নির্বাচন বিমুখতা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ ও জাতির জন্য এরকম নির্বাচন বিমুখতা অশনি সংকেত। তিনি বলেন, নির্বাচন বিমুখতা জাতিকে গভীর খাদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী শাসনে অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ। এই অবস্থা কখনো কাম্য হতে পারে না।
মাইক দিয়ে ডেকেও সাড়া মেলেনি
৯০এর দশকে এরশাদ সরকারের পতনের পর এমন একটা দিনের কথা কি কেউ কখনো ভেবেছিলেন যে বাংলাদেশে ভোটকেন্দ্রগুলো ভোটারশূন্য হবে? কেউ কি ভেবেছিলেন, সংসদ নির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন কোন আসন বা উপজেলা কিংবা জেলায় ভোটার উপস্থিতির হার দুই সংখ্যার ঘরেও পৌঁছবে না? সম্ভবত এমনটা কেউই ধারণা করেননি কিন্তু এগুলো এখন আর ধারণা নয়, বাস্তবতা। তবে ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে কমিশন তো আর কম করেনি! এমনকি মাইক দিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে পর্যন্ত বলা হয়েছে ভোটের দিন। জানা গেছে, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মুগারচর ভোটকেন্দ্রে ভোটের দিন সকালে নৌকা আর আনারস প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর আর কেন্দ্রটিতে কোন ভোটার খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয় মসজিদের মাইকে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়, তবে সে আহ্বানেও খুব একটা সাড়া মেলেনি। মসজিদের মাইকে আহ্বান জানিয়েও ভোটারদের কেন্দ্রে নেয়া যায়নি।
ভোটারদের এই নির্বাচন বিমুখতা নিয়ে সংসদেও কথা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। উপজেলা নির্বাচনই তার প্রমাণ, মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায়নি, এটা শুধু নির্বাচনের জন্যই নয় গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভোটাধিকারের জন্য অতীতে আন্দোলন করে তারা সফল হয়েছেন, তার আশংকা এ বয়সে এসে না তাকে আবার সেরকম আন্দোলনে নামতে হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা অবশ্য ভোট দেয়া বা না দেয়া নিয়ে নয়, আগ্রহী ইভিএম নিয়ে, তিনি আশা করেন ইভিএমএ ভোট হলে কারচুপির সুযোগ থাকবে না।
তবে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে আরো কিছু করা যায় কি না তা নিয়ে ভাবছে, কিছুদিন আগে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় তারা ‘মডেল’ নির্বাচনী কেন্দ্র বানাবেন। ওইসব কেন্দ্রে ভোটারদের জন্য থাকবে নানা সুযোগ-সুবিধা। তাদের যাতে রোদে পুড়তে না হয় সেজন্য সামিয়ানা টাঙানো হবে, বসার জন্য চেয়ার ও সোফার ব্যবস্থা করা হবে, থাকবে পানি খাওয়ার ব্যবস্থা, এমনকি বয়স্ক ভোটার ও গর্ভবতী নারীদের জন্য থাকবে আরো বেশ কিছু সুবিধা।
তবে এ কথা সবাই জানেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাটা দেশের ভোটারদের জন্য বড় কোন সমস্যা না বা ভোট বিমুখতার জন্য ভোট দেয়ার পেরেশানিকেও দায়ি করার সুযোগ নেই। অভিজ্ঞজনেরা বলেন, মানুষ ভোট দিতে যায় না, কেন না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ভোট দিতে পারেন না, গেলেই বলা হয় তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে, কখনো কখনো ভোট দিয়ে দেখাতে হয় কোন মার্কায় ভোট দিয়েছেন তাও। তাছাড়া বিনা ভোটে অনেক জায়গায় নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার প্রভাবও পড়ে অন্যসব জায়গার ভোটারদের মাঝে।
ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং ভোট দেয়ার নিশ্চয়তা থাকলে ভোটারদের মাইকেও ডাকতে হবে না, ভোটকেন্দ্রে চেয়ার বা সোফারও দরকার পড়বে না, ভোটাররা এমনিতেই কেন্দ্রে যাবে, কেন না ভোট এ দেশের মানুষের কাছে একটা উৎসব। ভোটের উৎসবে মানুষকে ফের মাতিয়ে তুলতে সবচে’ সাহসী ভূমিকা নিতে হবে সরকারি দলকে, কেন না এদেশে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সুষ্ঠু নির্বাচন করার মতো সাহস কমিশন দেখাবেÑ এটা একটা অসম্ভব কল্পনা। জনগণ সেই কল্পলোকে থাকতে চায় না, তারা বাস্তবতা মেনেই চলে, আর চলে বলেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাকিয়ে থাকে সরকারের মনোভাবের দিকে, জনগণের ভোট দেয়ার ইচ্ছা বা আকাঙ্খা আছে, এখন সরকার জনগণের এই মনোভাবটা উপলব্ধি করে তাকে সম্মান করলেই দেশে চলে আসবে ভোট উৎসবের দিন। সরকার মানুষের এই আকাঙ্খা উপলব্ধি করবে এমন আশায় নাগরিক, এমন দিনের অপেক্ষায় সুজন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৪ জুন ২০১৯ প্রকাশিত)


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ