fbpx
 

চুনোপুঁটিতেই এত মুক্তো, বোয়াল হাঙরের পেটে না জানি কী!

Pub: Thursday, October 3, 2019 9:03 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দুর্নীতিকে বাংলাদেশে সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ বরাবরই দুর্নীতিতে টিআইবির তালিকায় উপরের দিকে থাকে। ২০১৮ সালে টিআইবি’র দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম। ২০১৭ সালে ছিল ১৭তম। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে এক ধাপ বেড়েছে। চলমান অভিযানকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান মনে করছে না মানুষ। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত যাদেরকে গ্রেফতার করেছে, তাদেরকে মূলতঃ জুয়া, মদ আর টেন্ডারবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার পর ১০ দিনে মোট ৩২টি অভিযান চালানো হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেনকে। গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক রাজন ভূইয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা না গেলেও নগদ কোটি কোটি টাকা ও কেজি কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানে নগদ মোট ১৭ কোটি টাকা, ১শ’ ৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ও ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে ২শ’ ১ জনকে সাজা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। যাদের আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে এরা দেশের দুর্নীতি-চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির জন্য আলোচিত কেউ নয়। তারপর এদের কাছে এতো বস্তায় বস্তায় টাকা পাওয়া গেছে, বিস্মিত না হয়ে থাকা যায় কী? কিন্তু মানুষের মনে ব্যাপক প্রশ্ন, চুনোপুঁটিদের পেটে এতো রত্ন, মণি-মুক্তো, বোয়াল-হাঙরের পেটে না জানি কী? তাই দেশের জনগণের লুট হয়ে যাওয়া বিপুল-অর্থ উদ্ধারে বোয়াল-হাঙরদের গ্রেফতারের জোর দাবি উঠেছে।
এর আগে বিভিন্ন সময় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত কিছু ব্যবস্থা নিেেয়ছে সরকার ও দুদক। স্বাস্থ্য অধিদফতরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আফজাল হোসেনের দুর্নীতি দেখে খোদ দুদকের কর্মকর্তাদেরই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, অষ্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা মো: আফজাল হোসেন ও তার স্ত্রী একই অধিদফতরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার রুবিনা খানের অগাধ সম্পদের হদিস পায় দুদক। তাদের দু’জনের নামে রাজধানীর উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে, ১৬ নম্বর রোডে রয়েছে একটি পাঁচতলা বাড়ি। ১১ নম্বরে রয়েছে একটি প্লট। নগদ টাকাসহ তার সম্পদের পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকা। কিন্তু দুদক আবজাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়েই থেমে যায়। স্বাস্থ্যখাতের আরো বড় ফাদার যারা, যারা আবজালেরও গডফাদার হিসেবে পরিচিত সেই হাঙরদের গায়ে দুদক হাত দিতে পারেনি বা দেয়নি। যে কারণে দুদকের পুরো অভিযানটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সিলেট কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিককে আটক করা হয়। দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে গত ২৮ জুলাই তাকে নিয়ে ধানমন্ডির ভুতের গলির বাসায় যায় দুদকের টিম। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ৮০ লাখ টাকা। পার্থ বণিক দাবি করেছেন, এ টাকার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা তার শ্বাশুড়ি দিয়েছেন বাকি ৫০ লাখ টাকা তার সারাজীবনের সঞ্চয়। এর আগে নগদ ৪৫ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস।
আরেক আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হচ্ছেন ডিআইজি মিজান। নারী কেলেংকারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। পরে তার বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে মিজান জানান, দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা এনামুল বাছির তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। মিজানের বিরুদ্ধেও অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আয়ের অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ গত ২৬ সেপ্টেম্বর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘অবৈধ জুয়া খেলা নিয়ে এখন সারাদেশে চলছে ব্যাপক আলোচনা, উত্তেজনা। ক্যাসিনো থেকে স্পা, বাড়িঘর থেকে ক্লাব কিছুই বাকি থাকছে না যেখানে বস্তা বস্তা টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। ধরপাকড়-চুনোপুঁটিদের ওপর দিয়েই যাচ্ছে, রাঘব বোয়ালরা কোথায় কে জানে।’ বিভিন্ন সময় ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে যাওয়ার উদাহরণ টেনে তিনি লিখেছেন- বাংলাদেশে ঋণখেলাপিও এক ধরণের জুয়াখেলা। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখাচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার চারশ’ ২৫ কোটি টাকা, তবে আইএমএফ এর তথ্য অনুযায়ী ২ লাখ ৪০ হাজার ১শ’ ৫৭ কোটি টাকা। ব্যাংক ঋণের নামে ক্যাসিনো থেকে যারা এই টাকা নিয়ে গেছেন তারা তা লুকিয়ে তো করেননি; আমার-আপনার সামনেই করেছে। এরা চুনোপুটি তো নয়ই, এমনকি রাঘব বোয়ালও নয়-রীতিমত হাঙর মাছ। এদের ধরবে সাধ্য কার?
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ আলী ইমাম মজুমদার গণমাধ্যমে বলেছেন, অভিযান অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। বীজ থেকে বেরিয়ে আসা চারাগাছ যখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে, অনেক ডালপালা ছড়িয়েছে তখন অভিযান শুরু হয়েছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম মনে করেন, ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের গ্রেফতার করা না হলে এ অভিযান ‘আইওয়াশ’ এ পরিণত হবে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার রোগের মূলে ঢোকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক আশা প্রকাশ করেন, চলমান অভিযানে রাঘব বোয়ালরা ধরা পড়বে।
অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশে ক্যাসিনো চলার সঙ্গে প্রশাসনের কেউ না কেউ জড়িত থাকতে পারে। তিনি বলেন, প্রশাসন জানে না বাংলাদেশে এমন কাজ হতেই পারে না।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, চুনোপুঁটি রাঘব বোয়াল কেউই ছাড় পাবেন না। তিনি বলেন, ব্যক্তি চুনোপুঁটি হলেও অনেকে দুর্নীতিতে রাঘব বোয়াল হয়েছেন। অপরাধী যত বড় আর যত ছোট হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানা কথা বলা হলেও তারা হুট করে অভিযান শুরু করলো মাদক আর ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে। অনেকেই বলছেন, জুয়া, মদ এসবের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সরকার জনমত টানার চেষ্টা করছে। এ অভিযানের বিষয়টি বিশ^ সম্প্রদায়কেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেয়ার ফলে মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে যারা ধরা পড়েছে তারা এমন কোন আহামরি বড় নেতা নন, একজন হচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতা, তবে তার পদ হচ্ছে সমবায় বিষয়ক সম্পাদক, আরেকজন হচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাদের অর্থবিত্ত আর অপকর্মের বহর দেখে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, এমন ছোট চুনোপুঁটিতেই মিলছে এতো মুক্তো মানিক্য, রুই-কাতলা আর বোয়াল কিংবা হাঙরের পেটে না জানি কী অবস্হা !


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ