বালুখেকোদের এলাহি কারবার-৩: মুসল্লিদের অস্বস্তি নামাজে, মহিলাদের গোসলে

Pub: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ ৪:৫৭ অপরাহ্ণ   |   Upd: মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

মো. এনামুল কবীর :: বালু আনলোডের কারণে কেবল নদী ভাঙন, ভূমি ধ্বস বা লেখাপড়ার ক্ষেত্রেইযে সমস্যা হচ্ছে তাই নয়, ঘটছে আরও নানা যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা। যেমন, রাতে ঘুমাতে না পারা, মসজিদে নামাজ আদায়ে অসুবিধার সাথে মহিলাদের গোসল বা পানি সংগ্রহেও পড়তে হচ্ছে মারাত্মক অস্বস্তিতে।

সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়নের মুরাদপুর-পীরেরচক গ্রামের মানুষের জীবন বলতে গেলে যন্ত্রদানব আর তাদের চালক-শ্রমিকদের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছে।
শনিবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরজমিনে ঐ এলাকায় গেলে এই প্রতিবেদকের কাছে স্থানীয় জনসাধারণ জানালেন তাদের আরও নানা অসুবিধার কথা। মুরাদপুর মসজিদের সামনে জোহরের নামাজ শেষে জড়ো হয়েছিলেন কয়েকজন গ্রামবাসী।

এই প্রতিবেদককে তারা জানান, নদীতো ভাঙছেই, অনেক জায়গায় রাস্তা দেবে গেছে, এক সঙ্গে অনেকগুলো আনলোড ড্রেজার এক সাথে যখন চালু হয়, তখন শব্দ দুষণের কারণে বাচ্চারা লেখা পড়া করতে পারেনা। তারা রাতে ঘুমাতেও পারেন না। সারাদিন কাজ শেষে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে না পারায় অনেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি ঠিক মতো নামাজ আদায়ও তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ফজর ছাড়া আর কোন নামাজই শান্তিতে আদায় করা সম্ভব হয়না।

মসজিদের সামনে জড়ো হওয়া মুসল্লি গিয়াস মিয়া, আলা উদ্দিন, মখদ্দস আলী, আব্দুস সালাম, নাসির মিয়া, খলিল মিয়া প্রমুখ জানালেন, ‘অলা অবস্থা অয় রে ভাই, অনেক সময় নমাজোও বেরা লাগি যাই।’

মসজিদের ইমাম ও খতিব মো. শামসুল ইসলাম বলেন, একদিকে বালু আর অন্যদিকে পাথর ভাঙার যন্ত্রণায় আমাদের জীবন আজ অতিষ্ঠ।’ গ্রামের শেষপ্রান্তে একদল লোক পাথর ভাঙার ব্যাবসাও শুরু করেছে বলেও জানালেন গ্রামবাসী। তারা আরও জানান, সকাল ৮টার দিকে যখন ড্রেজারগুলো চালু হয় তখন শেষ রাতের দিকে ঘুমাতে যাওয়া মানুষজনকে বাধ্য হয়ে অতৃপ্তি নিয়ে উঠে পড়তে হয়। ঘুমে ব্যাঘাতের কারণে অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই মুহুর্তে এই দুই গ্রামে নারীসহ ৫/৬ জন সদ্য আক্রান্ত হৃদরোগী রয়েছেন, যারা জীবন বাঁচাতে যুদ্ধ করছেন। আর স্কুলের পাঠদান বিঘ্নিত হওয়ার মতোই বিঘ্নিত হচ্ছে সকালে মসজিদের পড়া। ছেলে-মেয়েদের নামাজ-সুরা-তেলাওয়াতের পরিবেশও আজ ধ্বংস। তারা পড়তে পারছেনা।

মুসল্লী আর ছেলে-মেয়েদের এমন সমস্যার পাশাপাশি সমস্যা হচ্ছে গ্রামের দরিদ্র শ’খানেক পরিবারের মহিলা সদস্যদের। তাদের নিজের পুকুর নেই। তাই গোসলের ক্ষেত্রে সুরমার পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেখানেও স্বস্তিতে গোসল বা পানি আনার উপায় নেই। ড্রেজারগুলোর স্থান পরিবর্তন চলে প্রায়ই। তারপর ঘাটে গোসল করতে গেলে চরম অশান্তি। ড্রেজারে থাকা শ্রমিকরা হা করে চেয়ে থাকে।

মুরাদপুর গ্রামের দরিদ্র আব্দুল খালিকের হার্টের সমস্যা ধরা পড়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। তার নদী তীরের বাড়িতে গেলে স্ত্রী জানালেন, তিনি অসুস্থ। তবু পেটের তাগিদে একটু দুরের এক ইটভাটায় গেছেন। তার অসুস্থতা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তার স্ত্রী জানালেন, ‘পেটর তাগিদে রাইত গাঙ্গো মাছ মারাত যাইন। মাঝ রাইতে আইয়াও ঘুমানির উপায় থাকেনা। ড্রেজারোর শব্দয়। এক লগে অনেকগুলো ড্রেজার চলে। কয়দিন আগে তার হার্টর সমস্যা ধরা পড়েছে।’

তিনি আরও জানান, তাদের পুকুর নেই। গোসল এবং ধোয়ামোছার পানির জন্য নদীই একমাত্র ভরসা। অথচ তা করতেও মারাত্মক অস্বস্তিতে পড়েন। কারণ জানতে চাইলে বৃদ্ধা নিরবে মাথা নিচু করে থাকেন। তার এই নিরবতা ভাঙেন পাশের ঘর থেকে অন্য এক মহিলা। উচ্চস্বরে তিনি জানালেন, ‘নাওয়াত গেলে কাপড় বদলানির উপায় থাকেনা। ড্রেজার তাকি আ-করি চাই থাকইন। পানি আনাত গেলেও ঔ এক অবস্থা।’

এছাড়াও আছে আরও দুর্ভোগ। মুরাদপুর গ্রামের কলেজ ছাত্র আবুল হোসেন ও মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নিজাম উদ্দিন দেখালেন, সিলেট-বুরহান উদ্দিন-গাছবাড়ি রোডের মুরাদপুর পীররচক অংশে প্রায় ১০/১২টি উঁচু বাধ। একেকটার উচ্চতা রাস্তার স্বাভাবিক অংশ থেকে অন্তত আড়াই/তিন ফুট বেশি। বালু আনলোডের পাইপ বসাতে এই কাজ করা হয়েছে। আবুল ও নিজাম জানালেন, বর্ষায় এসব বাঁধে অনেক সময় গাড়ি আটকে যায়। কোথাও কোথাও দেবেও যায়। এতে মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি হয়। যাত্রী সাধারণের যেমন মারাত্মক সমস্যা হয়, তেমনি সমস্যা হয় গ্রামের মানুষদেরও।

আনলোড ড্রেজার মালিক-শ্রমিক-কন্ট্রাক্টর ও ঠিকাদারদের এমন ভয়াবহ অত্যাচার নিপিড়ন বিষয়ে প্রশাসনের করণীয় জানতে চাইলে সিলেট সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজুম মুনিরা বলেন, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্য শাহপরাণ থানার ওসিকে বলা হয়েছে। তিনি ব্যাবস্থা নিবেন।

জানতে চাইলে শাহপরাণ থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) আখতার হোসেন বলেন, ‘ইউএনও কোন সহযোগিতা চাইলে আমি অবশ্যই সহযোগিতা করব। পুলিশ পাঠাবো।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আইনগত ব্যাবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে ইতিপূর্বে তিনি কোন অনুরোধ পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে আখতার হোসেন বার বার এককথাই বলেন, তিনি অভিযানে এলে আমি পুলিশ পাঠাবো। সাহায্য করব।’

মুরাদপুর গ্রামের অধিবাসীরা জানিয়েছেন, ১৪ আগস্ট ঐ এলাকা পরিদর্শন করেছেন শাহপরাণ থানার ২ জন এসআই। তাদের একজনের নাম জগদীশ বলে গ্রামবাসী জানালেও এই নামে তার থানায় কোন এসআই নেই বলে কয়েকদিন আগে আলাপকালে জানিয়েছিলেন ওসি আখতার হোসেন।

শীর্ষ খবর/এক

Print

শীর্ষ খবর/আ আ

সংবাদটি পড়া হয়েছে 1066 বার

 
 
 
 
সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
 
 
 
 
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com