• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

মতামত

গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে প্রয়োজন স্থানীয় সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে নির্বাচন

প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:১৩
আপডেট: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:১৩

গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে প্রয়োজন স্থানীয় সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে নির্বাচন
 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কয়েক দফায় বেশ কিছু সিটি কর্পোরেশনে এবং দেশের তাবৎ জেলা পরিষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করে এভাবে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসন চালানোতে বিভিন্ন মহলে কথা উঠেছে। এতো বিপুল পরিমান ভোট ও দুই-তৃতীয়াংশের উপরে জাতীয় সংসদে আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলটি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগের যৌক্তিকতা কতটুকু? এমন নিয়োগ সংবিধান ও গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সামঞ্জস্য নয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান দ‍্যর্থহীনভাবে বলেছে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন পরিচালিত হবে স্থানীয়ভাবে জণগন কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “The Republic shall be a democracy …… in which effective participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured” (অর্থাৎ “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র ….… প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে”)।

অপরদিকে, সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “Local government in every administrative unit of the Republic shall be entrusted to bodies, composed of persons elected in accordance with law” (অর্থাৎ “আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় সরকারের ভার প্রদান করা হইবে”)

Kudrat-e-Elahi Panir V Bangladesh [44 DLR (AD) 319] মামলার রায়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, “Local Government is meant for management of local affairs by locally elected persons. If government officers or their henchmen are brought to run local bodies, there is no sense in retaining them as Local Government bodies. Considering the origin, growth and development of local government institutions at different levels of the administration over one and half centuries, it is found that Local Government is an integral part of the democratic polity of the country (অর্থাৎ “স্থানীয় সরকার হলো স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা স্থানীয় বিষয়াদির ব্যবস্থাপনার জন্য। যদি সরকারি কর্মকর্তা বা তাদের অনুচরদের স্থানীয় সংস্থা পরিচালনার জন্য আনা হয়, তবে সেগুলোকে স্থানীয় সরকার সংস্থা হিসেবে বহাল রাখার কোনো অর্থ হয় না। দেড় শতাব্দী ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপত্তি, বৃদ্ধি ও বিকাশ বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, স্থানীয় সরকার দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ”)।

উপরের সাংবিধানিক বিধান ও সর্বোচ্চ আদালতের রায় থেকে স্পষ্ট যে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তর স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। এর ব‍্যথ‍্যয় ঘটানো সংবিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। অপরদিকে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাঠামো ও চরিত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত অষ্টম সংশোধনী মামলাসহ একাধিক মামলায় গণতন্ত্রকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) হিসেবে ঘোষনা করেছে। সুতরাং নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করানোর ব‍্যবস্থা করা গণতান্ত্রিক চেতনার সরাসরি পরিপন্থী।

সরকার যাদেরকে ইতিমধ্যে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তাদের সবাই সরকারি দলের সক্রিয় নেতা-কর্মী। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বেশিরভাগই সদ‍্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি বা মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। এভাবে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদকে সরকারি দলের মনোনয়ন বঞ্চিত বা নির্বাচনে পরাজিতদের বসানোর কারণ কি তা বোধগম্য নয়। সংসদ নির্বাচনে একটি আসনে বিজয়ী হতে পারেননি অথবা খোদ তার দল থেকে মনোনয়ন পর্যন্ত পেলেন না কিন্তু তাকে বানিয়ে দেয়া হলো কয়েকটি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত জেলা পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক! এটা গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক চেতনা ও জনগণের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষার সাথে যায় না।

দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় ধরে ফ‍্যাসিবাদের কবলে থাকা দেশ গণঅভ্যুত্থানের ফলে নতুন ডাইমেনশনে আসে। দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দেড় বছরের মাথায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পূন:যাত্রা শুরু হয়। এমতাবস্থায় দেশের জনগণের প্রত্যাশা সংবিধান অনুযায়ী নতুন সরকার স্থানীয় সরকারের সব স্তরে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। যদিও ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে কোন কোন মহল থেকে দাবি উঠেছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন করার। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের অন্যতম সুপারিশও ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন উভয়টি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে করা । বাস্তব ও বোধগম্য কারণে সেটা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় এসে ধীরে ধীরে স্থানীয় সরকারের সবকটি স্তরে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারতেন। এমনটি করলে গণতন্ত্র সুসংহত হতো, লাভ করতে পারত গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সরকারও প্রশংসিত হতো।

বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। তাদের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণও শতকরা ৫০ ভাগের কাছাকাছি, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক। বিএনপি বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। এমতাবস্থায়, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করলে এককভাবে তারা কমপক্ষে অর্ধেক বা এরচেয়েও বেশি প্রতিনিধি পেতো। অপরদিকে বিরোধী জোটও হয়তো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিনিধি পেতো। ফলে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো। আর এতে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা সুদৃঢ় হতো। বিএনপির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস তাতে আরো বাড়তো। স্থানীয় সরকারে বিরোধী জোট প্রত‍্যাশার চেয়ে বেশি প্রতিনিধি পেলেও তাতে কি, সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন তো ঐটা না।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন হচ্ছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের পূরো সপ্তম ভাগ নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে আছে পাঁচ পাঁচজন স্থায়ী নির্বাচন কমিশনার। আছে তাদের নিজস্ব স্থায়ী জনবল ও রিসোর্স। তাদের কাজই হচ্ছে যথা সময়ে অবাদ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। ইতিমধ্যে অনেক সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের আর তেমন কাজ থাকে না, বলা যায অনেকটা বেকার তারা। এমতাবস্থায়, নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে ইনস্ট্রাকশন বা পরামর্শ দিতে সরকারের অসুবিধা কি তা বোধগম্য নয়।

বিশেষ বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকারের কোন স্তরে কোন গুরুতর সমস্যা হলে সরকার স্বল্প সময়ের জন‍্য নিরপেক্ষ প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে। তবে সেই নিরপেক্ষ প্রশাসক নিয়োগ দেয়া উচিত সিভিল সার্ভিসের উপযুক্ত র‍্যাংক এন্ড ফাইল থেকে, কেননা সিভিল সার্ভিসে যারা কর্মরত তারা সাংবিধানিকভাবে ও সিভিল সার্ভিস রুল অনুযায়ী নিরপেক্ষ থাকার কথা। অথবা সরকার প্রয়োজন মনে করলে স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট স্তর বা ইউনিটে নিরপেক্ষ ব‍্যক্তিদের দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ (Interim Council) গঠন করতে পারে যাদের দায়িত্ব ও কাজ হবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুসারে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করা। সর্বোচ্চ আদালতের অভিমতও তাই। Ziaur Rahman Khan MP and others Vs Bangladesh and others 49 DLR 491 মামলায় উচ্চ আদালত বলেন, “Interim Council will be created only to meet an unforeseen situation and such a council in fact come in aid of an and to facilitate the implementation of the provisions of Articles 59 and 60 of the Constitution” (অর্থাৎ “শুধুমাত্র অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হবে এবং এই ধরনের পরিষদ প্রকৃতপক্ষে সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী বাস্তবায়নে সহায়তা ও সুবিধা প্রদানের জন্য কাজ করবে”)।

গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটেনে স্থানীয় সরকারে কখনও সরাসরি দলীয় বিবেচনায় সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় না। ইতিহাসে এমন নজীর নেই। তবে হ‍্যাঁ, স্থানীয় সরকারের কোন ইউনিট বা স্তরে (যেমন বারা কাউন্সিল বা কাউন্টি কাউন্সিল) কখনও কোন আর্থিক বা স্বচ্ছতার গুরুতর সমস্যা হলে অথবা দেউলিয়ার মতো অবস্থায় উপনীত হলে তাতে ইন্টারভেনশন হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনার, এনভয় বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি পাঠানো হয়। যেমন লন্ডন বারা অব টাওয়ার হ‍্যামলেটস, রদারহ‍্যাম ও ডনকাস্টার মেট্রোপলিটন বারা কাউন্সিলে অতীতে কমিশনার পাঠানো হয়েছিল। তবে তা দলীয় ভিত্তিতে নয়। বরং দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ সিভিল সার্ভিস বা প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয়।

বর্তমান সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক জনগণ (অনুচ্ছেদ ৭)। সেই একই সংবিধান স্পষ্টভাবে বলেছে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিয়ে (অনুচ্ছেদ ১১ ও ৫৯)। গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে “দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ” কখনই “জনগণের দ্বারা নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের” স্থলে প্রতিস্থাপন (substitute) হতে পারে না। মনোনয়ন বঞ্চিত বা নির্বাচনে পরাজিত দলীয় ব‍্যক্তি দলের জন্য ডেডিকেটেড ও কমিটেড হতে পারেন, তবে তিনি জনগণের সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির সমান বা সমকক্ষ নন বা এমনটি বিবেচনা করা ঠিক নয়। এমনটি ভাবলে জণগণের কাছে ভুল বার্তা যাবে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামো।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: [email protected]
Compose
Write to Barr Nazir Ahmed

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম