• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

জাতীয়

ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি, নেপথ্যে কারা

প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:৫৫
আপডেট: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:৫৫

ঢাকা ওয়াসার পদ্মা প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি, নেপথ্যে কারা
 

ঢাকা ওয়াসা ও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরস্পরবিরোধী স্বার্থের বলি হয়েছে পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্প। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, সরবরাহ লাইন নির্মাণ না করা এবং দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি নিশ্চিত না করেই ঠিকাদারকে জামানতসহ চূড়ান্ত বিল পরিশোধের নজিরবিহীন তথ্য মিলেছে।

এই জালিয়াতি ও অপচয়ের ফলে ওয়াসা ও সরকারের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানসহ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভয়াবহ এই দুর্নীতি হয়েছে বলে উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ম-দুর্নীতির কেন্দ্রে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, ওয়াসার সাবেক এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং চীনা ঠিকাদারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পরামর্শক আজিজুল আকিল ডেভিড। তাদের যোগসাজশে কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা ও নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করে ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মা থেকে পানি এনে মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়ায় শোধন করে ঢাকায় সরবরাহের প্রকল্পটি করা হয়। কিন্তু সামঞ্জস্যপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পরীক্ষামূলক চালুতে পাইপ ফাটলেও ঠিকাদার চূড়ান্ত বিল ও জামানত তুলে নিয়েছেন।

প্রায় চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে দুই হাজার কোটি টাকার পাইপ কেনায় ৫০০ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়ারেন্টির ত্রুটি ওয়াসার অর্থে সংশোধনের পরও ঠিকাদার ৩৬০ কোটি টাকার জামানত তুলে নেন। প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় প্রয়োজনীয় সরবরাহ লাইন করা সম্ভব হলেও তা হয়নি।

ওয়াসার দেওয়া গড় উৎপাদন অনুযায়ী দৈনিক ঘাটতি ২০ কোটি লিটার বা প্রায় ৪৪ শতাংশ। ২০১৯ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৭০৩ দিনে ঘাটতি ৫৪ হাজার ৬০ কোটি লিটার। এর ৯০ শতাংশ আবাসিক ও ১০ শতাংশ বাণিজ্যিক খাতে বিক্রি হতো ধরে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে হাজার লিটারে যথাক্রমে ১৬ টাকা ৭০ পয়সা ও ৪৬ টাকা ২০ পয়সা দরে সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। পাইপ কেনায় লোপাটের হিসাবসহ অঙ্কটি ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। এটি সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ও আত্মসাতের তথ্যের সমষ্টি; নিরীক্ষিত নিট ক্ষতি নয়।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, অর্থ লোপাটে নির্মাণের মান বিসর্জন দেওয়া হয়। বিগত ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তদন্তের দাবি উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাকসিম পলাতক। রফিকুল পদে বহাল থেকে সম্প্রতি অবসরে গেছেন। সূত্র জানায়, অর্থের বিনিময়ে পদে টিকে থাকা ও দুদকের তদন্ত থামানোর মূল কারিগর ছিলেন তিনি। পরিবারের অন্যরা ভারতের মুর্শিদাবাদে থাকেন। দুর্নীতির অর্থের অংশ সেখানে বিনিয়োগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেভিড বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। সংশ্লিষ্টরা জানান, বুয়েটে ড্রপআউট হলেও নিজেকে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অ্যালামনাই পরিচয় দেন। একসময় ছোট ঠিকাদার ছিলেন। ভাড়া বাসায় জীবন চালাতে হিমশিম খেতেন। ওয়াসায় ‘দুই টাকার ঠিকাদার’ পরিচিতি পাওয়া ডেভিড তাকসিমচক্রের সহায়তায় বড় ব্যবসায়ী হন। এখন গুলশানে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে থাকেন। ১১৭ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের ইউনিক হাইটসে কোম্পানির চার হাজার বর্গফুটের নিজস্ব অফিস করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ও বিভিন্ন ব্যক্তিকে অর্থ দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন ডেভিড। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত এই ব্যবসায়ী এখন বিএনপির ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। সূত্রের ভাষ্য, তাকসিম, রফিকুল ও ডেভিডের মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম রয়েছে। সেখানে দুর্নীতির অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। শেখ রেহানার বিরুদ্ধেও লন্ডনে অর্থ পাচারের তথ্য দিয়েছেন তারা।

২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এমএ রশীদ সিদ্দিকী ‘কে-৯ ডাকটাইল’ পাইপ পাঠাতে আপত্তি জানিয়ে ঠিকাদারকে চিঠি দেন। ওই রাতেই তাকসিম ই-মেইলে অসন্তোষ জানান। অনুলিপি দেন উপপ্রকল্প পরিচালক রফিকুল ও ডেভিডকে। পরে রশীদকে সরিয়ে রফিকুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কম দাম ও কম পুরুত্বের পাইপ কেনা আড়াল করতে রশীদকে বাদ দিয়ে অনুগত প্রকৌশলীদের চীনে পরিদর্শনে পাঠানো হয়। দেশে এনে বুয়েটে পরীক্ষার বাধ্যবাধকতাও মানা হয়নি।

রশীদ সিদ্দিকী বলেন, নিম্নমানের পাইপ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে সরানো হয়। পরে দুদক বুয়েটের মাধ্যমে পরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও তা হয়নি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিম্নমানের পাইপে প্রকল্প বাস্তবায়নের খেসারত দিচ্ছে নগরবাসী ও ওয়াসা।

পূর্ণ সক্ষমতা যাচাইয়ে পাঁচটি পাম্প একসঙ্গে চালালে ইনটেক ও শোধনাগারের মধ্যবর্তী সঞ্চালন লাইনের দুটি স্থানে পাইপ ফেটে যায়। সড়ক ভেদ করে পানি ওঠে। ভবনের দেওয়ালও ভেঙে পড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরে সংস্কার হলেও আর পাঁচ পাম্প একসঙ্গে চালিয়ে সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়নি।

এদিকে ‘আনরিফাইন্ড সয়েল সিমেন্ট কলাম’ করার প্রস্তাব দেন প্রকল্প পরিচালক। ডেনমার্কের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রন্টমিজের টিম লিডার ও কন্ট্রাক্ট স্পেশালিস্ট বোদো গোপাট আন্তর্জাতিক মানের নয় জানিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এর প্রতিবাদে তাকসিম উত্তেজিত হন। পরে প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞকে ফিরিয়ে নেয়। এরপর তাকসিম, রফিকুল ও ডেভিড নিজেদের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।

জানা গেছে, রফিকুলের স্ত্রী ও ডেভিড ন্যাশনাল ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেডে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ও নৌকা প্রতীকের সাবেক সংসদ-সদস্য প্রকৌশলী মো. আব্দুস সবুরসহ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত প্রকৌশলীরাও ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি ওয়াসার সায়েদাবাদ প্রকল্প-২-এর ল্যান্ড ফিলিংসহ বিভিন্ন কাজ করে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ডেভিডকে চীনা ঠিকাদারের পরামর্শক নিয়োগ দিতে রফিকুল চাপ দেন।

ডেভিড যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকার এ বিষয়ে তদন্ত করছে, করুক। তদন্তে যে বা যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদের শাস্তি হোক। এটা নিয়ে আপনার কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন?’ এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাননি তিনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ওয়াসার কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের অসাধু চক্র শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেনি। বর্তমান সরকারেরও তেমন উদ্যোগ নেই। পদায়নে এখনো দুর্নীতিবাজরা এগিয়ে থাকছে। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। দায়ীদের শাস্তি ও প্রকল্পের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সুফল না মিললেও বিদেশি ঋণের কিস্তি সরকারকে শোধ করতে হচ্ছে।

ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফা বলেন, শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট সামলাতে বোর্ড বারবার সরবরাহ লাইনের প্রকল্প নিতে বলেছিল। অর্থ থাকলেও তাকসিম পরামর্শ নেননি। এতে নির্মাণ মান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কারিগরি নিরীক্ষা প্রয়োজন হলেও তখন সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নেটওয়ার্ক তৈরির পরও নির্ধারিত পানি দিতে না পারলে নির্মাণের অনিয়ম প্রকাশ পাবে। এ কারণে তাকসিম বাধা দেন। এ বিষয়ে অভিমত জানতে তার ব্যক্তিগত নম্বরে কল ও এসএমএস করেও সাড়া মেলেনি। গণ-অভ্যুত্থানের পর পলাতক অবস্থায় তিনি ই-মেইলে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বিগত সরকারের প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কমিটি তদন্ত করেছে। প্রতিবেদন দুদকে পাঠানো হয়েছে। দুদক বিস্তারিত তদন্ত করলে অনিয়ম বেরিয়ে আসবে। তখন দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমান সরকার কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেবে না।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম