ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব কাটছে না বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ শুরুর আট মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক হয়নি তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারদর। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেল, পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির বাজারেও তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭২ থেকে ৭৩ ডলারের মধ্যে। ২ নভেম্বর ২০২৬-এ তা প্রায় ১১২ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অপরিশোধিত এই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং তেল সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় সেদিন ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলারে স্থির হয়েছিল। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ছিল ৬৭ দশমিক ০২ ডলার।
অন্যদিকে, ২ নভেম্বরের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ৮৪ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ছিল ১০২ দশমিক ৫৬ ডলার। সেই হিসাবে যুদ্ধ শুরুর আগের শেষ কার্যদিবসের তুলনায় ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ব্যারেলপ্রতি ৩৯ দশমিক ৩৬ ডলার বা প্রায় ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ডব্লিউটিআইয়ের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
তবে সংকট কেবল অপরিশোধিত তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে তৈরি করা ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলের বাজারেও সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। এসব পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেলের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত অক্টোবর মাসের ‘অয়েল মার্কেট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরের পাইকারি বাজারে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তা সর্বোচ্চ প্রায় ২২০ ডলারে পৌঁছেছিল। ওই রেকর্ড উচ্চতা থেকে দাম কিছুটা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য এখনো অপরিশোধিত তেলের দামের প্রায় দ্বিগুণ। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায়ও তা অনেক বেশি।
পরিশোধিত জ্বালানির সাম্প্রতিক বাজারদরেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ৩০ অক্টোবরের সিঙ্গাপুর বাজারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১০ পিপিএম গ্যাসঅয়েল বা ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৭০ দশমিক ০২ ডলার। একই দিনে গ্যাসোলিনের দাম ছিল ১২৭ দশমিক ৬৪ ডলার এবং জেট কেরোসিনের দাম ১৬৮ দশমিক ৪২ ডলার।
তবে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম সরাসরি তুলনা করার সুযোগ নেই। কারণ অপরিশোধিত তেল শোধন করে ডিজেল, গ্যাসোলিন ও জেট ফুয়েল উৎপাদন করা হয়। শোধনাগারের সক্ষমতা, কাঁচামালের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং পরিশোধন মুনাফার ওপর নির্ভর করে এসব পণ্যের চূড়ান্ত দাম। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে তার প্রভাব পড়তে সময় লাগতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন, বাড়ছে বাজারের উদ্বেগ
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনে বিঘ্ন। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে সমুদ্রপথে বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করত। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
আইইএর জুলাই মাসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে বিশ্ববাজারে নজিরবিহীন সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে বাস্তব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পরিশোধিত জ্বালানির রপ্তানি পুনরুদ্ধার হচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে ডিজেল ও গ্যাসঅয়েলের সরবরাহও চাপে ছিল।
দাম কমলেও কাটেনি সংকটের শঙ্কা
যুদ্ধের অবসান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার খবরে ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ও কাতারের কর্মকর্তাদের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের আলোচনার খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই দরপতনকে জ্বালানি বাজারের স্থায়ী স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে হামলা এবং তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এখনো বাজারে ঝুঁকি তৈরি করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) অক্টোবরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সরবরাহ সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানি মজুত কমে আসার কারণে ২০২৭ সালেও ডিজেলের বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের চাহিদাও আগের বছরের তুলনায় কমতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার, সেখানে এখন তা ১১২ ডলারের কাছাকাছি। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে সংকট আরও প্রকট। যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি।













