ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি, শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রতারণা, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিনটি মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তিনটি মামলায় আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৪ হাজার ৭৫৫ টাকা। দুদকের অনুমোদন অনুযায়ী, তিনটি মামলায় সালমান এফ রহমানসহ যথাক্রমে ২২, ২২ ও ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এ তথ্য জানান।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের মাধ্যমে স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড, আরবান ফ্যাশনস লিমিটেড ও মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ঋণ ও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) সুবিধা নিয়ে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি দেখানো হয়। এর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
প্রথম অনুমোদিত মামলায় স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ ১ হাজার ১৭১ টাকা, দ্বিতীয় মামলায় আরবান ফ্যাশনস লিমিটেডের নামে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৬ টাকা এবং তৃতীয় মামলায় মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫২৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নবসৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনুকূলে ঋণ ও ইডিএফ সুবিধা মঞ্জুর করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। পরে নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হয়।
স্প্রিংফুল অ্যাপারেলসের ক্ষেত্রে ১ কোটি ৭০ লাখ ৬১ হাজার ৫৮২ মার্কিন ডলারের কথিত বিল তৈরি করা হয়। এর বিপরীতে দেশে আসে মাত্র ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৯২ ডলার। বাকি ১ কোটি ৬৬ লাখ ২১ হাজার ১৯০ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুমোদন হওয়া দ্বিতীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, আরবান ফ্যাশনসের নামে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭৭ ডলার বা প্রায় ৪১৭ কোটি ৪ লাখ টাকার পেমেন্ট নেওয়া হয়। নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে এ অর্থ আত্মসাৎ এবং নগদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
মিডওয়েস্ট গার্মেন্টসের নামে ৬ কোটি ৬২ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৮ ডলার বা প্রায় ৫৬৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার পেমেন্ট নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার দেশে ফেরত না আসার কথা উল্লেখ করেছে দুদক। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫২৭ টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনটি মামলার অভিযোগে সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সংশ্লিষ্ট পোশাক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং জনতা ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে।
অভিযোগে জনতা ব্যাংকের তৎকালীন সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বেক্সিমকো সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের কথা বলা হয়েছে।
দুদকের অনুমোদন অনুযায়ী, এসব ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭এ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে।
এদিকে, সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে জালিয়াতি, প্লেসমেন্ট শেয়ার কারসাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ ও আত্মসাৎ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদক জানায়, তিন মামলায় মোট আসামি ৬৯ জন। এর মধ্যে ১৩ জন কমন আসামি তিন মামলাতেই রয়েছেন। ফলে তিন মামলায় মিলিয়ে পৃথক আসামির সংখ্যা ৩১ জন।
স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেড মামলার আসামি ২২ জন। এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমান, তার ছেলে এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কে চৌধুরী এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল আহমেদ, এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা।
এছাড়া স্প্রিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাইমিনুল ইসলাম ও পরিচালক কোহিনুর আবেদিন, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর রয়েছেন।
অন্য আসামিরা হলেন আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডইর স্বত্বাধিকারী আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমান; জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জব্বার, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, ব্যবস্থাপক ও অবসরপ্রাপ্ত এজিএম (রপ্তানি) মো. হুমায়ুন কবির ঢালী, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুর রহিম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক সিনিয়র অফিসার মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং বিবি এলসি বিভাগের ম্যানেজার (প্রিন্সিপাল অফিসার) শ, ম, মাহাতাব হোসাইন বাদশা।
আরবান ফ্যাশনস লিমিটেড মামলার আসামি ২২ জন
এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কে চৌধুরী এবং পরিচালক এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা।
এছাড়া আরবান ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল উদ্দিন ও পরিচালক সাহিদা রহমান, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর এবং আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডইর স্বত্বাধিকারী আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমান রয়েছেন।
জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শহিদুল হক, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মো. মমতাজুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, বিবি এলসি বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. সালেহ আহম্মেদ এবং একই বিভাগের সিনিয়র অফিসার রফিকুল ইসলামও এ মামলার আসামি।
এ মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, এ এস এফ রহমান, বেক্সিমকো লিমিটেডের পরিচালক ইকবাল আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কে চৌধুরী এবং পরিচালক এ বি সিদ্দিকুর রহমান, মাসুদ ইকরামুল্লাহ খান, শাহ মঞ্জুরুল হক ও রীম এইচ শামসুদ্দোহা।
এছাড়া মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাইমিনুল ইসলাম ও পরিচালক কোহিনুর আবেদিন, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাঈম মাহমুদ সালেহিন ও পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর এবং আরআর গ্লোবাল ট্রেডিং এফজেডইর স্বত্বাধিকারী আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমান রয়েছেন।
জনতা ব্যাংকের সাবেক সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরবর্তী সময়ে সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জব্বার, সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. শহিদুল হক, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মো. মমতাজুল ইসলাম ও মো. আব্দুর রহিম, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, বিবি এলসি বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. সালেহ আহম্মেদ, সিনিয়র অফিসার রফিকুল ইসলাম, ম্যানেজার (প্রিন্সিপাল অফিসার) শ, ম, মাহাতাব হোসাইন বাদশা এবং ব্যবস্থাপক ও অবসরপ্রাপ্ত এজিএম (রপ্তানি) মো. হুমায়ুন কবির ঢালীও এ মামলার আসামি।












