শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের বহু দেশে যখন জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ব্রুনাইয়ের ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কম খরচ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে এসব সুবিধা সবার জন্য সমান নয়; নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে নিয়ম ও খরচে পার্থক্য রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ ব্রুনাই। একদিকে বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পদ, অন্যদিকে শান্ত পরিবেশ, ঘন সবুজ বন, পরিচ্ছন্ন শহর আর সরকারি জনকল্যাণমূলক নানা ব্যবস্থা- সব মিলিয়ে দেশটি আধুনিক বিশ্বের ব্যস্ততা থেকে আলাদা এক অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
ব্রুনাইয়ে বড় শহরের মতো কোলাহল, তীব্র যানজট কিংবা রাতভর জমজমাট নৈশজীবন তুলনামূলক কম চোখে পড়তে পারে। বরং দেশটির আকর্ষণ লুকিয়ে আছে নিরিবিলি পরিবেশ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং ধীরগতির জীবনযাপনে।
ব্রুনাইয়ের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাকৃতিক সম্পদ দেশটির সরকারি আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। জ্বালানিতে সরকারি ভর্তুকি থাকায় দেশটিতে কিছু জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম।
জ্বালানির স্বল্পমূল্যের পেছনে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও সরকারি মূল্যনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ব্রুনাইয়ে জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষায় নতুন নিয়ন্ত্রণও কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি নিবন্ধনযুক্ত যানবাহনের জন্য জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। অর্থাৎ, কম দামের জ্বালানি সব দেশের সব যানবাহনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।

ব্রুনাইয়ের জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি নিবন্ধনযুক্ত যানবাহনকে নির্দিষ্ট পেট্রলপাম্পে বাজারদরে প্রিমিয়াম জ্বালানি কিনতে হয়।
তেল ও গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোও দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা করলে সরকারি আয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কম খরচে চিকিৎসা, নাগরিকদের জন্য নানা সুবিধা
ব্রুনাইয়ের জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য দিক হলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। দেশটির নাগরিকরা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ভর্তুকিযুক্ত চিকিৎসার সুবিধা পান। কিছু সেবার ক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় অনেকের জন্য সহনীয় থাকে।
২০২৫ সালে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাগরিকত্বহীন কিছু স্থায়ী বাসিন্দার জন্য নিবন্ধন ফি ৩ ব্রুনাই ডলার থেকে কমিয়ে ১ ব্রুনাই ডলার করার ঘোষণা দেয়। এই ফি কমানোর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের চিকিৎসা মাত্র ১ ডলারে পাওয়া যায়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি সহায়তাও দেশটির জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তবে নাগরিকদের জন্য বিদ্যমান সুবিধা এবং বিদেশি পর্যটক বা প্রবাসীদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম এক নয়।
ব্রুনাইয়ে ব্যক্তিগত আয়করের প্রচলন না থাকা দেশটির আরেকটি আলোচিত দিক। তবে এর অর্থ এই নয় যে সেখানে কোনো ধরনের কর, শুল্ক বা সরকারি ফি নেই। বিভিন্ন পণ্য, সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য।
মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে অবস্থিত ব্রুনাইয়ের সরকারি নাম ব্রুনাই দারুসসালাম। দেশটির আয়তন প্রায় ৫ হাজার ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার। রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ান। জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং তেল-গ্যাস থেকে উল্লেখযোগ্য আয় আসায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আয়ের অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে স্থান পেয়ে আসছে।

ব্রুনাই একটি সুলতানশাসিত রাষ্ট্র। দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান ও সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ। দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে রাজতন্ত্র এবং ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্রুনাইয়ের অন্যতম বড় আকর্ষণ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিবন, নদী, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। বিশ্বব্যাংকের তথ্যভান্ডারে প্রকাশিত ২০২৪ সালের হিসাবে দেশটির মোট ভূমির প্রায় ৭২ দশমিক ১ শতাংশ বনভূমি।
ব্রুনাইয়ের উলু তেমবুরং ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নৌকায় যাত্রা, ট্রেকিং এবং উঁচু ক্যানোপি ওয়াকওয়ে থেকে সবুজ বন দেখার সুযোগ রয়েছে। শহরের বাইরে গেলে প্রকৃতির নীরবতা ও বন্য পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়।
রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে রয়েছে বিখ্যাত সুলতান ওমর আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ। এর সোনালি গম্বুজ, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য ও চারপাশের জলরাশি শহরটির অন্যতম পরিচিত দৃশ্য। এ ছাড়া কাম্পং আয়ার নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী জলগ্রামটি ব্রুনাইয়ের ইতিহাস ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রুনাইয়ের জনজীবন নিয়ে ভ্রমণকারীদের বিস্ময়ের একটি বড় কারণ হলো এর শান্ত পরিবেশ। বিশ্বের বড় বড় শহরে যেখানে সকাল-সন্ধ্যা যানজট, মানুষের ভিড় এবং উচ্চ শব্দ দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সেখানে ব্রুনাইয়ের অনেক এলাকায় তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশ দেখা যায়।
দেশটির জীবনযাত্রার ধরনও এই শান্ত পরিবেশের একটি কারণ। পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক জীবন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং তুলনামূলক সংযত বিনোদনসংস্কৃতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাতভর পার্টি, ক্লাব ও বারকেন্দ্রিক পর্যটনের পরিবর্তে প্রকৃতি, ঐতিহ্য, মসজিদ, জাদুঘর এবং স্থানীয় খাবারের অভিজ্ঞতা বেশি প্রাধান্য পায়।
তবে সব এলাকা ও সব সময়ে মানুষের ভিড় কম থাকে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। রাজধানী, বাজার, পর্যটনকেন্দ্র এবং বিশেষ অনুষ্ঠানস্থলে মানুষের সমাগম হতে পারে।

নৈশজীবন সীমিত, মদ্যপানে কঠোর নিয়ম
ব্রুনাইয়ে পশ্চিমা ধাঁচের জমজমাট নৈশজীবন তুলনামূলকভাবে সীমিত। দেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের প্রভাব দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট। তবে এখানে একেবারেই কোনো রাতের বিনোদন নেই, এমন ধারণা সঠিক নয়। সন্ধ্যার পর রেস্তোরাঁ, রাতের খাবারের বাজার এবং অন্যান্য কিছু কার্যক্রম উপভোগ করা যায়।
দেশটিতে অ্যালকোহল বিক্রি ও সেবনের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। অমুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক ভ্রমণকারীরা নির্দিষ্ট শর্তে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সীমিত পরিমাণ অ্যালকোহল আনতে পারেন। ব্রুনাইয়ের রয়্যাল কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ বিভাগ অনুযায়ী, ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী অমুসলিম যাত্রীরা সর্বোচ্চ দুই বোতল মদ (প্রতি বোতল এক লিটার অথবা ৩৩০ মিলিলিটারের সর্বোচ্চ ১২ ক্যান বিয়ার) আনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শুল্ক বিভাগে ঘোষণা দিতে হয় এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত শর্ত মানতে হয়। আনা অ্যালকোহল অন্যকে দেওয়া, বিক্রি করা বা ব্যক্তিগত বাসস্থানের বাইরে সংরক্ষণ ও পান করার অনুমতি নেই।
যারা নিরিবিলি পরিবেশ, সবুজ বন, পরিচ্ছন্ন শহর, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং ধীরগতির জীবনযাপন পছন্দ করেন, তাদের কাছে ব্রুনাই হতে পারে এক ব্যতিক্রমী গন্তব্য।













