• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

জাতীয়

বন্যা ও দুর্যোগের দেশ

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০২২ ১:২৭
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০২২ ১:২৭

 

বন্যা আর বর্ষাঋতুর রূপ-বৈচিত্র্য মানে বাঙালির চিরকালীন এবং চিরচেনা এক অভিজ্ঞতা। বর্ষা ও বন্যা একে অপরের অঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্মরণাতীত কাল থেকে বর্ষা এলে আমাদের এ নিম্নগাঙেয় বদ্বীপ জলে প্লাবিত হয়। ১৭৭২ খ্রি. ব্রিটিশ ভারতের আওতায় কোম্পানির শাসন অর্থাৎ যখন জেলা শাসন ব্যবস্থা চালু হয় তখনই ব্রিটিশ সরকারের কাছে এটি চিহ্নিত ছিল জলাশয় অঞ্চল হিসেবে। এখানে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি মানুষের নিত্য সঙ্গী। ব্রিটিশ শাসকরা এর নাম দিয়েছিল Lower Ganges।

তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই যে বন্যার মূল কারণ এটা সত্য এবং বিশ্বজুড়ে গবেষণায় প্রমাণিত। কম বৃষ্টি মানে কম বর্ষা। যদিও কম বর্ষার নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে আমরা কখনো বেশি উদ্বিগ্ন নই। আমরা হয়তো গভীর ভাবে ভাবি না প্লাবনের সাথে জমির উর্বরতার সম্পর্ক নিবিড়। বেশি হলেই যত সমস্যা, যত কষ্ট-বেদনা ও মানবিকতার প্রশ্ন উঠে। সরকারি বেসরকারি, দেশি-বিদেশি সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞগনের আলোচনা আর তর্ক-বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।

সরাসরি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াই এবং আঙুল তুলে বলি, বন্যার জন্য এই প্রকল্প দায়ী, ওই রাস্তা বা বাঁধ দায়ী এবং পুরো দায় সরকারের। অন্য কিছু বিষয় নেই। এমন অবিবেকী গতানুগতিক চিন্তা ভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে ভেতর থেকেই এর যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে হবে। আমরা সবাই জানি, উজানের ঢলে, বাঁধভাঙা জলে, ডুবে যাওয়া ফসলের অপূরণীয় ক্ষয়-ক্ষতি ইত্যাদি। এসব আমাদের কাছে ঐতিহাসিক ভাবেই দৃশ্যমান।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অভাবনীয় মনুষ্য-সৃষ্ট কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাও বন্যাসহ সকল দুর্যোগের জন্য ব্যাপকভাবে দায়ী। নব্বইয়ের দশক থেকে ‘ধরিত্রী সম্মেলন’ নামে বিশ্ব সম্মেলনে এ গীত গাওয়া হয়ে আসছে। স্থায়ী সমাধানের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে সভা সেমিনার সিম্পোজিয়াম গোলটেবিলের অন্ত নেই। আর আজকের বিশ্ব মানে প্রযুক্তিনির্ভর সচেতনতার বিশ্ব। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী এদেশ ওদেশকে দোষারোপ করার হেতু কী— জানি না। আমার কাছে স্পষ্ট নয়, বোধগম্যও নয়।

নিজের জীবদ্দশায়, এখনও অল্প মনে পড়ে ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কথা। শুনেছি এর কোন রাষ্ট্রীয় পূর্বাভাস ছিল না। তিন দিন পরে ঢাকায় পত্রিকা পড়ে নাকি মানুষ জেনেছিল দেশের উপকূলবর্তী জেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর খবর। নারী পুরুষ, বৃদ্ধ শিশু, গবাদিপশু, ফসল গাছপালা সবই চলে যায় এক নিমিষের আকস্মিকতায় এবং অকালে। স্বাধীনতার পর আমরা জেনেছি, এমন ভয়ংকর ও অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের সাথে সম্পৃক্ত ছিল পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক কূটকৌশল।

১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা স্পষ্টভাবে মনে পড়ে। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। রাস্তা ঘাটের বেহাল দশা, স্বজনহারা মানুষের আহাজারি তখনও থামেনি, রক্তের দাগ ও ক্ষত শুকায়নি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে কেবল নরহত্যা নয়, কেবল মা বোনের সম্ভ্রম হানি নয়। তাদের কারণে হাজার হাজার ব্রিজ কালভার্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এরই মধ্যে অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করে দেশব্যাপী নেমে আসে প্রবল বন্যা। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের মানুষের নৌকা জীবনের সাক্ষী হয়ে আছি আমি নিজেই। নৌকার প্রাচুর্য ছিল বিধায় তখন মানুষ নৌকায়ও রাত্রিযাপন করেছে। তখনও দেশের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটিতে সীমিত ছিল। বন্যার্ত মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, দুর্দশা দেখেছিলাম চোখের জলে। চাল-ডালের কঠিন সংকট মোকাবেলার চেয়েও সর্বাধিক আলোচিত ছিল লবণের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে।

এ মূল্য ছিল অকল্পনীয় এবং  আকাশছোঁয়া। সে সময় স্থানীয় বাজার থেকে খুব অল্প পরিমাণ লবণ কেনার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিজেরই আছে। বন্যার পানি নেমে গেলে নানা রোগ বালাই ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র গ্রাম বাংলায়। সেদিনও মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করেছিল।
অনুন্নত সড়ক যোগাযোগের মধ্যে সরকারের দেয়া সীমিত ত্রাণও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল বলে মনে পড়ে।

১৯৮৮ সালের বন্যায় প্লাবিত বিশাল বাংলাকে অবলোকন করেছিলাম খুব কাছে থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করা এক আশাবাদী যুবক আমি। বন্যায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। পল্টনের নিকটে মতিঝিল শিল্পাঞ্চল জুড়ে থৈথৈ জল। রিকশা করে কমলাপুর রেলস্টেশনে যাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছিল। বন্যাদুর্গত এলাকায় সরবরাহ করার নিমিত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাশ্রমে গণ স্যালাইন তৈরির এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।

তৎকালীন ডাকসু’র উদ্যোগে মধুর ক্যান্টিনের বিপরীতে নব প্রতিষ্ঠিত ডাকসু ভবনের ক্যাফেতে দিনভর স্যালাইন বানানোর উৎসবে অংশ নিয়েছিলাম। ছাত্র শিক্ষক সবাই মিলে এ কাজে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছিলেন। সেদিন মানুষের জন্য কিছু একটা করার আকুতি নিয়ে সবাই দৌড়েছি এদিক ওদিক। সেই স্যালাইন প্রস্তুত কালে শিক্ষকদের গতিবিধির ওপর নজর রেখে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ও শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদ রচনা করেছিলেন এক অসাধারণ রম্যরচনা।

যা নিরঙ্কুশ আনন্দের খোরাক হয়েছিল সকলের। মনে পড়ে, সে সময়ে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি কলেজে লেকচারার পদে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা। বন্যায় ভেসে গেছে গোটা দেশ। ঢাকা ময়মনসিংহ সড়ক চালু থাকলেও কানায় কানায় বন্যার জলে ছুঁই ছুঁই। ময়মনসিংহ শহর থেকে অন্যত্র যাওয়া মানে নৌকার কোনো বিকল্প ছিল না। কোনো কোনো স্থানে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও রেল যোগাযোগও সাময়িক বন্ধ ছিল। ঢাকায় ফিরে আসার দীর্ঘ বিড়ম্বনার কাহিনী কখনো ভোলবার নয়।

১৯৯১ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ভেসে গিয়েছিল স্মরণ কালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রামের আশেপাশের উপজেলাসমূহের বিভিন্ন গ্রামে ও জনপদে। সরকারি চাকরির সুবাদে নিজেই অংশ নিয়েছিলাম ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে। চট্টগ্রামের
বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, কক্সবাজারের চকরিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালি ইত্যাদি এলাকা সাগরের জলোচ্ছ্বাসে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষের বসতি ঘরবাড়ি, গরু-মহিষের পাল, দোকান পাট, ব্যবসাপাতি যাবতীয় গ্রামীণ অর্থনীতির অনুষঙ্গ। খোলা আকাশের নিচে সন্দ্বীপের হাজার হাজার মানুষকে রাত্রিযাপন করতে দেখেছি। প্রাপ্ত দেশি-বিদেশি ত্রাণ কঠোর পরিশ্রম আর আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে দিয়েছিলাম নিঃস্ব সর্বহারা মানুষের হাতে। সেদিনও সরকারের পাশাপাশি শত শত এনজিও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিল।

দুর্যোগ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় উতরিয়ে ক্রমাগত সাফল্য অর্জন করার বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী বাংলাদেশ। আমাদের জন্মই হয়েছে প্রকৃতির বিরূপতাকে অকুতোভয় সাহসের সাথে মোকাবিলা করে। এখানে পরাজিত হওয়ার কোনো অতীত নেই, আছে অগণিত গৌরব গাঁথা। দুর্যোগে পরাভব মানে না বাঙালি। দলমত, ধর্ম বর্ণ ভেদ না করে একতা, সততা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমবোধ নিয়ে এগিয়ে আসলে এবারের বন্যাও সহজেই মোকাবেলা করা যাবে। তাছাড়া প্রতিটি দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা নতুন নতুন অভিজ্ঞতাও অর্জন করে চলেছি।

এ মুহূর্তে সমালোচনা করে সময় নষ্ট করার মতন কাজ থেকে সকলেরই বিরত থাকা জরুরি। শুরুতে সরকারের জনমুখী উদ্যোগকে সমর্থন ও সহযোগিতা করা দরকার; একই সাথে ত্রাণ তৎপরতা সহজিকরণ ও দ্রুততার সঙ্গে করার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। দেশে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করছে অসংখ্য এনজিও এবং  উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। তারাও কাল বিলম্ব না করে সরকারের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে মানুষের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াক। আর গোটা বৃহত্তর সিলেট সবসময় বিলাতের ঐতিহ্যে উদ্ভাসিত। তাঁরাও যেন বানবাসী, জলবাসী অসহায় মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। বন্যা কখনো হতে পারে না বাঙালির কান্না।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম