শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বসিলাঘাটে ধর্মীয় উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন দিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ছবি: মাহবুব আলম/ঢাকা পোস্ট
আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে আজ (২১ অক্টোবর) শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে গেছেন দেবী দুর্গা।
পূজার আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী, বুধবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা। পরে সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পরস্পরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ‘আনন্দময়ীর’ আগমনে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচিত হয়। পরবর্তী পাঁচ দিন রাজধানীসহ দেশের সব পূজামণ্ডপে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে ভক্তরা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অবশেষে দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক (বাবার বাড়ি) থেকে স্বর্গলোকের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যান। আগামী বছর শরৎকালে তিনি পুনরায় ধরণীতে ফিরে আসবেন।
এর আগে দুপুরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা পলাশীর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন।
পরে শত শত ট্রাকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়। ঢাকেশ্বরী থেকে শুরু হয়ে এই প্রতিমা যাত্রাটি শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ সদর দপ্তর, গোলাপ শাহ মাজার ও কোর্ট এলাকা ঘুরে সদরঘাটে পৌঁছায়। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সড়ক ও আশপাশের ভবনে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ।
ঢাকের বাদ্য আর বিদায়ের আবহে একে একে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। একই সময়ে তুরাগ নদীতেও চলে বিসর্জন পর্ব। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সড়কে পুলিশ ও নদীতে নৌপুলিশের টহল ছিল চোখে পড়ার মতো, পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের টিমও দায়িত্ব পালন করে।
তবে দেশের অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। সেখানে কেবল পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।
প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জনের পর সেখান থেকে জল (শান্তিজল) এনে মঙ্গলঘটে রাখা হয় এবং সেটি হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর এই শান্তিজল আবার হৃদয় থেকে ঘটে এবং ঘট থেকে প্রতিমায় রেখে পূজা করা হবে। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন ও মিষ্টিমুখ করেন।
এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়।
উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রতিটি পূজা উদযাপন কমিটিও নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। মণ্ডপে মণ্ডপে বসানো হয় সিসিটিভি ক্যামেরা এবং পাহারার জন্য গঠন করা হয় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসব হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষকেও একত্রিত করে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।









