শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
পাঁচ কক্ষের একটি বাড়ি। ভেতরে উচ্চ শব্দে গান, ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ আর বাইরে সারি সারি গাড়ি। সেখানে চলছিল ডিজে পার্টি। এমন একটি আয়োজনের খবর পেয়ে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। পুলিশের দাবি, বাড়িটিতে নিয়মিত এ ধরনের পার্টির আয়োজন করা হতো। অনলাইনে নিবন্ধন করে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া যেত। প্রতিবার জনপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। অভিযানে ওই বাড়ি থেকে ৮৫ জনকে আটক করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া ওই বাড়িতে ২০২৫ সাল থেকে এসব আয়োজন চলছিল বলে জানিয়েছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। অর্থাৎ, প্রায় প্রতি মাসেই একাধিকবার বসত এসব আসর। তবে আয়োজনের সঙ্গে বাড়ির মালিকের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে বিস্তারিত জানা যায়নি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে অভিযান ও উদ্ধারসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরেন ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে গিয়ে পুলিশ সদস্যরা ডিজে পার্টির আয়োজন দেখতে পান। বাড়ির আশপাশে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। ভেতরে উচ্চ শব্দে গান বাজছিল। সিসা সেবনের কারণে পরিবেশ ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বলেও জানান তিনি।
অনলাইনে নিবন্ধন, প্রতিবার জনপ্রতি ৬০০ টাকা
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব পার্টিতে অংশ নিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো। এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আয়োজনগুলো পরিচালিত হতো বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইলিয়াস কবির। অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করে অংশগ্রহণকারীরা পার্টিতে যোগ দিতেন। প্রতিটি আয়োজনে জনপ্রতি প্রায় ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। বাড়ি ভাড়া বাবদও অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিয়মিত আয়োজন, অনলাইন নিবন্ধন এবং অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার তথ্য সামনে আসায় এসব পার্টির ব্যবস্থাপনা ও অর্থ লেনদেনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আয়োজনগুলোর আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন এবং অর্থ আদায়ের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি গোয়েন্দা বিভাগের এই কর্মকর্তা।
পার্টিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ব্যাংকার
অভিযানের সময় বাড়িটিতে বিভিন্ন পেশা ও পরিচয়ের মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও ছিলেন। পুলিশের দাবি, সেখানে ২৬ জন তরুণীকে পাওয়া যায়। তাঁদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীও ছিলেন বলে জানান ডিসি ইলিয়াস কবির।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, অভিযান শুরু হওয়ার পর পার্টি বন্ধ হয়ে যায়। তখন উপস্থিত ব্যক্তিরা বাড়িটির বিভিন্ন কক্ষে চলে যান। পাঁচ কক্ষের বাড়িটিতে সে সময় পার্টির আয়োজন চলছিল। তবে উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা কিংবা আয়োজনে তাঁদের সম্পৃক্ততার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মদ ও মাদক উদ্ধারের দাবি পুলিশের
অভিযান শেষে বাড়িটি থেকে মদের তিনটি বোতল, ইয়াবা এবং ‘কুশ’ নামের একটি মাদকদ্রব্য উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। এ ছাড়া যৌনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কিছু সামগ্রীও পাওয়া গেছে বলে জানান ইলিয়াস কবির। এসব সামগ্রী কার কাছ থেকে বা বাড়ির ঠিক কোন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি দেননি।
উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের ধরন ও পরিমাণ, সেগুলোর মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত কোনো পৃথক মামলা হয়েছে কি না, তা পুলিশের বক্তব্যে স্পষ্ট নয়। ফলে উদ্ধারসংক্রান্ত দাবির পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আটক ৮৫ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
অভিযানে আটক ৮৫ জনের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিষয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও ১৫ দিন কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও তিন দিন কারাভোগ করতে হবে বলে জানান তিনি।
তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন আইনি বিধানের আওতায় এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে, শাস্তির আদেশ কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছেন এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন কী ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য জানা গেলে পুরো ঘটনার আইনি দিকটি আরও স্পষ্ট হবে।
একটি বাড়িতে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন, অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণ, জনপ্রতি নির্ধারিত ফি আদায় এবং অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে। এসব আয়োজন কীভাবে পরিচালিত হতো, অর্থ লেনদেনের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন এবং উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে—সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের পরবর্তী বক্তব্যে।













