• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

আন্তর্জাতিক

নিজের পা নিজেই কাটলেন ইউক্রেনীয় সেনা, তারপর ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন মৃত্যুপুরী থেকে

প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:০২
আপডেট: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:০২

নিজের পা নিজেই কাটলেন ইউক্রেনীয় সেনা, তারপর ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন মৃত্যুপুরী থেকে
 

বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের বয়লারের নিচে একটি গর্তে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলেন কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। তখনই তাঁকে একটি ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি বুঝতে পারেন, বেঁচে থাকতে হলে তাঁর অবশিষ্ট পা-টিও কেটে ফেলতে হবে।

এই ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় তাঁর বাঁ পা হারিয়েছিলেন। একই হামলায় তাঁর ডান পা ভেঙে বেঁকে গিয়েছিল। এর ফলে তিনি হামাগুড়িও দিতে পারছিলেন না।

প্রায় তিন মাস পর তিনি এই পা-টি কেটে ফেলতে বাধ্য হন। নিজের কাছে থাকা ছুরি দিয়ে পা-টি কেটে ফেলেন। রক্তপাত বন্ধ করতে সেখানে একটি ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন।
এর মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে যান।

গত ৪ অক্টোবর ৪৯ বছর বয়সী এই সেনাকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করা হয়। তিনি প্রায় আট মাস ওই বয়লারকক্ষে আটকে ছিলেন। আর ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে পার করেছিলেন টানা ৪৯১ দিন। একটি বিশাল ছয় পাখার ড্রোনকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। হার্নেস (নিরাপত্তা বেল্ট) পরা ঝুলন্ত ভ্লাসেনকোকে ড্রোনটি শূন্যে তুলে নেয়। এরপর তাঁকে ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়।

ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের মতে, আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা। পাঁচ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ড্রোনের এমন নজিরবিহীন মাত্রায় ব্যবহার দেখা গেছে। এটি আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একেবারে সামনের সারিতে (ফ্রন্টলাইন) সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো ইউক্রেনীয় সেনাদের মধ্যে এই পদাতিক সেনা একজন।

এলাকাটি মৃত্যুপুরী (কিল জোন) নামে পরিচিত। কারণ, সেখানকার আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ঘুরে বেড়ায়। সেখানে একটু নড়াচড়া করলেই মৃত্যু হতে পারে। কোনো জায়গাই সেখানে নিরাপদ নয়।

উভয় পক্ষের সেনারাই মাটির অনেক গভীরে পরিখা খুঁড়তে বাধ্য হন। অনেক সময় তাঁরা সেখানে মাসের পর মাস আটকা পড়ে থাকেন।

হতাহতের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। যদিও ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি অনেকাংশেই থমকে গেছে।

ড্রোন দিয়ে এই উদ্ধারকাজ ভ্লাসেনকোর জীবনে একটি অবিশ্বাস্য মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নিজের পা কাটার পরের যন্ত্রণাদায়ক মাসগুলোতে তিনি বাঁচার আশা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন।

ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই সেনাসদস্য রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’ ব্যান্ডেজ মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’

ভ্লাসেনকোর এই কষ্টের দিনগুলো এবং উদ্ধারের গল্পটি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। তাঁকে উদ্ধারকারী ড্রোনে বসানো ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও এর প্রমাণ দেয়। যদিও রয়টার্স স্বাধীনভাবে তাঁর গল্পের প্রতিটি তথ্য যাচাই করতে পারেনি।

ভ্লাসেনকো খারকিভ অঞ্চলে ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে মোতায়েন ছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাঁকে সামনের সারিতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে যোগ দেন।

ওই দুজন একটি ছোট মাটির গর্তে গাদাগাদি করে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিদিন ওপর থেকে তাঁদের খাবার ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেওয়া হতো। ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ড্রোন থেকে চকলেট ও দামি সিগারেটও ফেলা হয়েছিল।

ভ্লাসেনকো জানান, গত বছরের শরৎকালে যখন সেনাদের বদলি করার সময় আসে, তখন দুজন নতুন সেনা তিনি যেখানে ছিলেন সেখানে আসার পথেই নিহত হন। তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য পাঠানো আরও দুই সেনাকেও হত্যা করা হয়।

বিবাহিত এই সেনা বলেন, ‘আমার মনে আছে, তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বুঝতে পেরেছিলাম যে এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’

‘আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না’
একসঙ্গে ১০ মাস থাকার পর ভ্লাসেনকো ও বাস্কি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের জায়গা ছাড়তে বাধ্য হন। কারণ, তাঁদের গর্তে পানি ঢুকে গিয়েছিল। এরপর তাঁরা বাধ্য হয়ে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।

তবে এই স্বস্তি বেশি দিন টেকেনি। সহযোদ্ধাদের ফেলা শুকনা কাপড় এবং খাবারের প্যাকেট আনতে তাঁরা বাইরে বের হন। তখনই একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের দেখে ফেলে।

এরপর আরেকটি রুশ ড্রোন তাঁদের ওপর বোমা ফেলে। এতে বাস্কি তাঁর ৫০তম জন্মদিনেই নিহত হন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মাটিতে পড়ে গিয়ে তিনি তাঁর অন্য পায়েও মারাত্মক আঘাত পান। তিনি নড়াচড়াই করতে পারছিলেন না। কোনোমতে একটি গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটি ছিল প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া। গর্তটি ছিল একসময় স্কুলকে গরম রাখার একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে।

ভ্লাসেনকো বলেন, তাঁর বাঁ পা ধীরে ধীরে ‘পচে গিয়েছিল’। এই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বেশ কষ্ট পাচ্ছিলেন।

তাঁর ডান পায়ের নিচের অংশ এতটাই মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল যে হাড় বেরিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই পা-টিও কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’
‘ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’

ভারী জিনিস তোলার নতুন এক বিশাল ড্রোন
ভ্লাসেনকো যখন আশা হারাতে শুরু করেন, তখন পেছনের সারিতে থাকা তাঁর কমান্ডাররা তাঁকে উদ্ধারের উপায় খুঁজতে থাকেন। তাঁরা ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেড এবং অন্য দলগুলোর সঙ্গে মিলে তাঁকে বের করে আনার পরিকল্পনা করেন।

এই উদ্ধার পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, ড্রোনের হুমকির কারণে মৃত্যুপুরী থেকে পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যানে করে আহত যোদ্ধাদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ওই কর্মকর্তা শুধু তাঁর ছদ্মনাম ‘অ্যালেক্স’ বলে নিজের পরিচয় দেন।

তিনি আরও জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী চাকাযুক্ত চালকবিহীন স্থলযান ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। কিন্তু এটাও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই ধরনের দুটি যান ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুটিই রুশ ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তাঁকে উদ্ধার করাটা তখন অসম্ভব মনে হচ্ছিল।

এরপর কর্মকর্তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় কোম্পানির তৈরি নতুন এক ভারী ড্রোনের কথা জানতে পারেন। ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর কারণে ড্রোনটিকে দেখতে বিশাল এক পোকার মতো লাগে। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ৯০ কেজি ওজন তুলে নিয়ে যেতে পারে।

কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, এক বছরেরও বেশি সময় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার পর ভ্লাসেনকোর ওজন প্রায় ৭০ কেজি হতে পারে। তাঁকে এই ড্রোনে করে ১৫ কিলোমিটার দূরে পেছনের সারির একটি নিরাপদ স্থানে উড়িয়ে নিতে হবে।

এই অভিযানটি বেশ বিপদে ঘেরা ছিল। কারণ, ইউক্রেনের বড় ড্রোনগুলো প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনগুলোর হামলার শিকার হয়। রাশিয়ার ওই ছোট ড্রোনগুলোর ক্যামেরার সাহায্যে দূর থেকে এর চালক সরাসরি যুদ্ধের মাঠ দেখতে পান।

অবশেষে উদ্ধার
অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকো দেখতে পান, ওপর থেকে ফেলা তাঁর নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটে কিছু অপ্রত্যাশিত জিনিস রয়েছে। এর মধ্যে ছিল একটি বেল্ট এবং নির্দেশনার ভিডিও সেভ করা একটি ফোন।

ভ্লাসেনকো এর ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন। তবে তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঁচার জন্য এটাই তাঁর সেরা ভরসা।

পরদিন ৪ অক্টোবর ছয় পাখার সেই বিশাল ড্রোনটি সেখানে পৌঁছায়। ড্রোনের তার থেকে ঝুলে থাকা একটি আংটায় (ক্যারাবিনার) নিজেকে আটকে নেন ভ্লাসেনকো। এরপর ড্রোনটি তাঁকে ৭০ মিটার (২৩০ ফুট) ওপরে শূন্যে তুলে নেয়।

রাশিয়ার আক্রমণকারী ড্রোনগুলোর মনোযোগ ঘোরাতে তিনটি ছোট ড্রোন মূল ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। শত্রুদের গুলি থামানোর জন্য ইউক্রেনের চারটি ছোট ড্রোন, গোলন্দাজ বাহিনী এবং বড় ডানাওয়ালা ড্রোনগুলো মিলে রুশ ড্রোনের অবস্থানগুলোতে টানা দুই ঘণ্টা বোমাবর্ষণ করে।

চরম উত্তেজনার ১৫ মিনিট পর উদ্ধারকারী ড্রোনটি তার গন্তব্যে পৌঁছায়। তবে নিরাপত্তার কারণে সামরিক বাহিনী এর সঠিক অবস্থানটি গোপন রেখেছে।

এত ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পরও, ভ্লাসেনকোর কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার এই যাত্রাটি ছিল এক অন্য রকম ভয়ের। তিনি বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম