• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

দেশী সমস্যার বিদেশী সমাধান : রিন্টু আনোয়ার

প্রকাশ: শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩ ৮:২০
আপডেট: শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩ ৮:২০

দেশী সমস্যার বিদেশী সমাধান : রিন্টু আনোয়ার

দেশে রাজকীয় মেহমানময়। দেশের সমস্যা সমাধানের দাওয়াই তাদের হাতে! রোগী সারাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাই-প্রোফাইল অতিথিরা কর্মব্যস্ত দিন কাটিয়েছে। ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ মেহমানরাও। তাদের কাছে নালিশ দুপক্ষেরই। সেই সঙ্গে তারা দেশে থাকাবস্থায়ই জনসমাবেশ আয়োজন করে তাদের প্রদর্শন করেছে। বিএনপির এক দফা : এই সরকারকে চলে যেতে হবে, নির্বাচন দিতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। ক্ষমতাসীনদেরও মাত্র এক দফা : নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনেই হবে।

দফা বিষয়ে কিছুটা অভিনবত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নতুন ঘটনা। দফা বা দাবি পেশ করা হয় কর্তৃপক্ষ বা অথরিটির কাছে। সরকারি দল কার কাছে এক দফা উত্থাপন করল রীতিমতো দুর্বোধ্য। গণতন্ত্রের প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা এবং পশ্চিমা গণতন্ত্রের পতাকাবাহী ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এমন কাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ের মোটা দাগের ঘটনা হয়ে রইল। যার বিশ্লেষণ এখনই শেষ হবার মতো নয়। এই মেহমানদের জন্যও এটি অভিজ্ঞতা না হয়ে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশস্থ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক র‌্যাব এবং এর কর্মকর্তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা, জাতিসঙ্ঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশে থেকে ফোর্স প্রেরণের ব্যাপারে ‘মানবধিকার ভঙ্গ করা হচ্ছে না’ বলে প্রত্যয়নপত্র দাখিল করা এবং গণতন্ত্র প্রক্রিয়া বিনষ্টকারী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে নতুন ভিসানীতি প্রণয়নের বিষয় উপেক্ষা করে সরকারি দলের এক দফা বাস্তবায়ন করা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে আলোচনার নতুন দুয়ার খুলেছে।

বাংলাদেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। আগামী নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করার দাবিতে বাংলাদেশের প্রায় সব বিরোধী দল জোট বেঁধেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্রের প্রবক্তারা কোন দিকে ঝোঁকেন তা দেখার অপেক্ষা নানা মহলে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার বৈঠকের সারসংক্ষেপও এখনো ধোঁয়াশা। তারা ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় বৈঠক করেছেন। উজরা জেয়ার সঙ্গে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। সফরসঙ্গীদের মধ্যে আরো আছেন ইউএসএআইডি এশিয়া ব্যুরোর উপ-সহকারী প্রশাসক অঞ্জলি কৌর।

এমন এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হচ্ছে যখন সম্মিলিত বিরোধী দল শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের জন্য এক দফা দিয়েছে এবং সরকারি দল তাকে ক্ষমতায় রাখতে এক দফা দিয়েছে। বিরোধী দল সরকারকে আহ্বান করেছে পদত্যাগ করতে, কিন্তু সরকারি দল এক দফা কার কাছে উত্থাপন করছে? এমন ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। ধরে নেয়া যায়, উভয়পক্ষের দাবি বা নালিশ সফররত বিদেশীদের কাছেই। একই দিনে ঢাকায় বিশাল শো-ডাউন করে তারা একটি নজির তৈরি করেছে। যার টার্গেট বিদেশীরা। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে যুগপৎ ধারায় বৃহত্তর গণআন্দোলনের এক দফা ঘোষণার লক্ষ্যে নয়া পল্টনে সমাবেশ করছে বিএনপি আর আওয়ামী লীগ সমাবেশ করেছে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশে অবস্থানের সময় এমন সমাবেশ বা শো-ডাউনের জের কী হতে পারে, তা কি অপেক্ষা করে দেখার বিষয় নয়? নির্বাচনটি যে কি রকম শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হতে পারে তা বিদেশীদের বুঝতে আর বাকি থাকারও বিষয় নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এবং ইউএসএআইডির এশিয়া ব্যুরোর উপ-সরকারী অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অঞ্জলি কর বাংলাদেশে সফরের আগে ভারত হয়ে আসছেন নাকি সরাসরি ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় আসছেন তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত ছিল না। ভারতের মাটিতে ‘দি হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকায় উজরা জেয়া সাক্ষাৎকারে ‘এই অঞ্চলজুড়ে দেশগুলোর কাছে ‘ইতিবাচক বিকল্প’ প্রস্তাব করার জন্য কীভাবে ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসাথে কাজ করতে পারে, সে সম্পর্কে কথা বলেছেন। যাতে তারা এই সময়ে তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে যখন ‘চীনের অভ্যন্তরে ভিন্নমত দমন এবং এই মডেল বাইরের দেশে রফতানির প্রচেষ্টা’ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং নির্বাচন নিয়ে পত্রিকাটির প্রশ্ন ছিল : বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে, কারণ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সম্প্রতি বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ভিসা প্রদান সীমিত করার বিষয়ে একটি ঘোষণা দিয়েছে? জবাবে উজরা জেয়া বলেছেন, আমি প্রকাশ্যে দেয়া সেই ঘোষণার বিষয়ে উল্লেখ করব যে বাংলাদেশে সম্পূর্ণরূপে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে আমাদের বিভাগের মুখপাত্র একটি নতুন ভিসা নীতি অনুমোদন করেছেন। আমরা মনে করি প্রতিটি গণতন্ত্রের জন্য কাজ কঠিন, কিন্তু গণতন্ত্রের উন্নতির জন্য এটি অপরিহার্য।

বাংলাদেশ সফর শেষে উজরা জেয়ারা কী করবেন বা বলতে পারেন- সেই জিজ্ঞাসার অনেকটা হিন্দুস্তান টাইমসে বলে দিয়েছেন। এর মাঝে সমাবেশের একদিন পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি মহাসচিবের ‘পরপর দুই টার্মের অতিরিক্ত কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবে না মর্মে ৩১ দফা বাড়তি কিছু জিজ্ঞাসা তৈরি করেছে। কেন তার এ সময়ে জানানো জরুরি হয়ে গেল- প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই জন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাইতে হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুসমন্বয় করা হবে।

বিদ্যমান সংসদীয়ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সংসদে ‘উচ্চ-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা’ প্রবর্তন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নির্বাচনী ইশতেহারের মতো করে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।

গত দেড় দশকব্যাপী সংঘটিত অর্থ-পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং শ্বেতপত্রে চিহ্নিত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের বাইরে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ‘দুদকের’ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী ‘ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। ৩১ দফার সবশেষে বলা হয়েছে, একজাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে শহরে ও গ্রামে কৃষিজমি নষ্ট না করে এবং নগরে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ হ্রাস করে পরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়নের নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।

শেষ পর্যন্ত কে লাভবান হবে-তা অপেক্ষার বিষয়। তবে, রাজনীতির গতিধারা যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে তা রাজনীতি কম বোঝা মানুষও আঁচ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু চার দিনের সফরে ঢাকায় পৌঁছার ঘণ্টা কয়েক আগেই স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ওয়াশিংটনে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে মনে করে না যুক্তরাষ্ট্র। তার ওপর চীন, রাশিয়া এবং ইরান যেহেতু বাংলাদেশের ব্যাপারে মুখ খুলেছে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো রাখঢাক এখন রাখছে না। সবই এখন ওপেন সিক্রেট।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com