• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

ফিচার পোস্ট

শতকষ্টের মাঝেও একটু আনন্দের খোঁজে ‘মায়ের ডাক’

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:৫৮
আপডেট: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:৫৮

শতকষ্টের মাঝেও একটু আনন্দের খোঁজে ‘মায়ের ডাক’

কক্সবাজারের ঢেউয়ে দুঃখ ভুলে একদিনের জন্য হাসি-আনন্দে গুম হওয়া স্বজনদের পরিবার।
বিশেষ প্রতিনিধি
ছবিঃ সংগৃহীত
একদিকে বুকভরা অপেক্ষা—প্রিয় স্বজন একদিন ফিরে আসবেন। অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিশ্চয়তা, বেদনা, শূন্যতা আর বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের মাঝেই জীবন কাটছে গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের।
দীর্ঘ সংগ্রামের সেই ক্লান্ত মানুষগুলোই এবার একটু আনন্দ ভাগাভাগি করতে সমুদ্রের কাছে এসেছেন।

কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্র, নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের শব্দের মাঝে কয়েকটি দিনের জন্য বুকের ভেতরের কষ্টকে একটু পাশে সরিয়ে রেখে হাসতে চেয়েছেন তাঁরা।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, গুম হওয়া স্বজনদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর প্রধান সমন্বয়ক প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি এমপি-এর নেতৃত্বে সভাপতি হাজেরা খাতুনসহ প্রায় ৬০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল কক্সবাজারে আসে। প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজারের পাঁচ তারকা হোটেল রামাদা ইন্টারন্যাশনাল-এ অবস্থান করছে।
এটি শুধু একটি ভ্রমণ নয়; বরং দীর্ঘদিনের কষ্ট, অপেক্ষা ও সংগ্রামের মধ্যে পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে নেওয়ার একটি মানবিক প্রয়াস।


যে পরিবারগুলোর আনন্দেও মিশে থাকে অপেক্ষা
‘মায়ের ডাক’ কোনো সাধারণ সামাজিক সংগঠন নয়। এটি এমন সব পরিবারের একটি প্ল্যাটফর্ম, যাদের প্রিয়জন নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। সংগঠনটি গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও স্বজনদের সন্ধানের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। সংগঠনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে তারা এই দাবিগুলো সামনে রেখে কাজ করছে।
প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি নিজেও একজন গুম হওয়া স্বজনের পরিবারের সদস্য। তাঁর ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন ২০১৩ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তিনি অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে নিয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত হন।
বছরের পর বছর ধরে মায়েরা অপেক্ষা করেছেন সন্তানের জন্য, স্ত্রীরা অপেক্ষা করেছেন স্বামীর জন্য, সন্তানরা অপেক্ষা করেছে বাবার জন্য। অনেকের চোখে আজও সেই একই প্রশ্ন—
‘সে কোথায়?’
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাদের জীবনের অপেক্ষাও শেষ হয় না।
কক্সবাজারে একটু অন্যরকম দিন
সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কখনো কখনো নিজের কষ্টকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে পারে। সেই চেষ্টাই যেন এবার ‘মায়ের ডাক’-এর পরিবারগুলোর মধ্যে।
ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে। শিশুরা ছুটছে বালুর ওপর। কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখগুলো একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে।
হৃদি, আরোয়া, সুমাইয়া, আহাদদের মতো ছোট্ট শিশুদের হাসি যেন এই সফরের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
যে শিশুরা হয়তো স্বাভাবিক শৈশবের অনেক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাদের মুখে কয়েক মুহূর্তের হাসি দেখাও যেন পরিবারের বড়দের কাছে বিরাট প্রাপ্তি।
তাদের হাসির সঙ্গে হাসতে চেয়েছে পুরো ‘মায়ের ডাক’ পরিবার।
দুঃখকে অস্বীকার করে নয়, বরং দুঃখকে সঙ্গে নিয়েই একটু আনন্দ খুঁজে নেওয়া—এই সফরের সবচেয়ে মানবিক দিক সম্ভবত এখানেই।


আনন্দের আড়ালেও আছে গভীর বেদনা
কক্সবাজারের সমুদ্র যতই সুন্দর হোক, এসব পরিবারের বুকের ভেতরের শূন্যতা কিন্তু সেখানে হারিয়ে যায়নি।
সমুদ্রের ঢেউ হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য মন ভালো করে দিতে পারে; কিন্তু একজন মা তাঁর নিখোঁজ সন্তানের কথা ভুলে যেতে পারেন না। একজন স্ত্রী তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্বামীর কথা ভুলে যেতে পারেন না। একটি শিশু তার বাবার অপেক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
তাই এই আনন্দের মধ্যেও ফিরে আসে সেই চিরচেনা অপেক্ষা—
‘কবে ফিরবে আমাদের মানুষটি?’
এই অপেক্ষাই ‘মায়ের ডাক’-এর পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
দেড় দশকেরও বেশি সময়ের সংগ্রাম
গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশে পরিবারগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের একটি পরিচিত প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সংগঠনটির কার্যক্রম ও সদস্যদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চাপ, নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে।

২০২৬ সালেও সংগঠনটির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে বৈঠক, স্মরণ অনুষ্ঠান, মানববন্ধন, ন্যায়বিচারের দাবি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের আহ্বান—বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা তাদের দাবিগুলো তুলে ধরছে। সংগঠনের ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালের একাধিক কর্মসূচির তথ্য রয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে ‘মায়ের ডাক’কে কেন্দ্র করে একটি প্রামাণ্যচিত্রের যাত্রা শুরু হয়। সেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের বিশেষ করে মা, স্ত্রী ও সন্তানদের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে।


হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য অপেক্ষাএই সংগঠনের প্রতিটি পরিবারের গল্প আলাদা। কারও স্বামী নেই, কারও বাবা নেই, কারও ভাই নেই, কারও সন্তান নেই। কিন্তু সবার গল্পের একটি জায়গায় এসে মিল রয়েছে—অপেক্ষা।
কেউ জানেন না তাঁদের স্বজন জীবিত আছেন কি না। কেউ জানেন না তিনি কোথায় আছেন। কেউ জানেন না তাঁকে শেষবার কোথায় দেখা হয়েছিল।
তবু তাঁরা আশা ছাড়েননি।
এই আশা থেকেই বারবার তাঁরা রাজপথে দাঁড়ান, সংবাদ সম্মেলন করেন, মানববন্ধন করেন, রাষ্ট্রের কাছে জবাব চান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তাঁদের দাবি প্রতিশোধ নয়—তাঁরা চান সত্য উদঘাটন, নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি।
যারা লড়াই করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি
‘মায়ের ডাক’-এর এই দীর্ঘ পথচলায় অনেক মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন, কেউ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কেউ রাজপথের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় তাঁদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
তাঁদের স্মৃতি আজও বহন করে চলেছেন স্বজনেরা।
আর যারা আজও বেঁচে আছেন, তারা যেন সেই অসমাপ্ত লড়াইকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
আনন্দও তাই এক ধরনের শক্তি
কখনো কখনো সংগ্রামরত মানুষের জন্য আনন্দ বিলাসিতা নয়; বরং নতুন করে লড়াই করার শক্তি।
কক্সবাজারের এই সফর হয়তো সেই শক্তিই জোগাবে।
একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা, সমুদ্র দেখা, শিশুদের সঙ্গে হাসা, ছবি তোলা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো হয়তো পরিবারগুলোর দীর্ঘ কষ্টের সমাধান নয়। কিন্তু এগুলো তাদের মনে করিয়ে দেয়—তারা একা নন।
একজনের কষ্টে অন্যজন পাশে আছেন। একজনের চোখের পানিতে অন্যজনের চোখও ভিজে ওঠে। আবার একজনের হাসিতে অন্যরাও হাসেন।
এটাই ‘মায়ের ডাক’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি—পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ঐক্য।
লড়াই এখনো শেষ হয়নি
কক্সবাজারের ঢেউ হয়তো আজ তাদের কিছুটা আনন্দ দিয়েছে। কিন্তু তাদের মূল দাবি এখনো অটুট।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।
তাঁরা চান, গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হোক। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা হোক। পরিবারের কাছে সত্য তুলে ধরা হোক। দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যথাযথ সহায়তা ও প্রতিকার পাক।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বাংলাদেশে জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনাগুলোর জবাবদিহি, সত্য উদঘাটন ও ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে।

গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে ‘মায়ের ডাক’-এর প্রধান সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য প্রকৌশলী সানজিদা ইসলাম তুলি-এর প্রতি রয়েছে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
কারণ, এই পরিবারগুলোর কাছে নেতৃত্ব মানে শুধু কোনো কর্মসূচির আয়োজন নয়; বরং দীর্ঘ দুঃখের সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।
কক্সবাজারের এই আয়োজনও তাই নিছক আনন্দভ্রমণ নয়—এটি একে অপরকে শক্তি দেওয়ার একটি মানবিক উদ্যোগ।
সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই তাঁদের সংগ্রামও যেন চলমান।
আজ তাঁরা হাসছেন, আগামীকাল আবার হয়তো রাজপথে দাঁড়াবেন। আজ শিশুরা সমুদ্রের পানিতে খেলছে, আগামীকাল তাদের মায়েরা আবার প্রিয় স্বজনের সন্ধানে কথা বলবেন।
কারণ তাঁদের হৃদয়ে একই সঙ্গে রয়েছে বেদনা, ভালোবাসা, অপেক্ষা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা।
সমুদ্রের ঢেউ ফিরে যায়, আবার আসে।
তেমনি ‘মায়ের ডাক’-এর পরিবারগুলোর আশাও ফিরে ফিরে আসে—
একদিন হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে সেই প্রিয় মানুষটি।
সেই প্রত্যাশা নিয়েই তাদের পথচলা।
স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি।
ন্যায়বিচারের লড়াইও শেষ হয়নি।
‘মায়ের ডাক’-এর পথচলাও শেষ হয়নি।

মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মায়ের ডাক


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com