ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ছবি সংগৃহীত
একটি কারাম গাছের ডালকে ঘিরে নাচ, গান আর উৎসবের রঙে মুখর হয়ে উঠেছিল ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর এলাকা। উঠানের মাঝখানে একটি গাছের ডাল। চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বাজনার তালে তালে নাচছেন নারী-পুরুষ। কারও হাতে মাদল, কারও হাতে ঢোল, আবার কারও হাতে করতাল। কখনও গানের সুর, কখনও ধর্মীয় কাহিনি। বেদির পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ধান, সর্ষে, কলাই ও গমের বীজ। একটি কারাম গাছের ডালকে ঘিরেই যেন একসঙ্গে মিলেছে বিশ্বাস, প্রার্থনা আর উৎসব।
শুক্রবার রাতে শুরু হয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কারাম গাছের ডাল নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয় ওরাঁও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব। কারাম উৎসবকে ঘিরে কয়েক দিন আগে থেকেই সালন্দর ইউনিয়নের পাঁচপীরডাঙ্গা গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। রঙিন পোশাকে নারী-পুরুষ, হাতে ঢোল ও মাদল নিয়ে নাচ-গান করতে করতে উৎসবে অংশ নেন তারা। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এ আয়োজন দেখতে।
কারাম পূজার অন্যতম প্রধান আনুষ্ঠানিকতা হলো কারাম গাছের ডাল স্থাপন। এ উপলক্ষে ওরাঁও নারীরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন। পরে নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের তালে কারাম গাছের ডাল সংগ্রহ করে পূজার বেদিতে স্থাপন করা হয়।
পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ কেরকেটা বলেন, ‘বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি, ভালো ফসল এবং সুখ-সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় প্রতিবছর এ পূজার আয়োজন করা হয়।’
কারাম গাছের ডাল স্থাপনের পর শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। নারী-পুরুষের সঙ্গে নাচ-গানে যোগ দেন শিশু-কিশোররাও। ঢোল ও মাদলের তালে তালে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন পুরো গ্রামের মানুষ। এতে একদিকে যেমন নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির চর্চা হয়, অন্যদিকে তৈরি হয় পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মিলনের পরিবেশ।
শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন কারাম উৎসব দেখতে। ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান ও উৎসবের নানা আয়োজন উপভোগ করে মুগ্ধতার কথা জানান তারা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এমন আয়োজন প্রতিবছর যেন আরও বড় পরিসরে করা হয়।
উৎসবে অংশ নেওয়া অতিথিরাও ওরাঁও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের প্রশংসা করেন। তাদের জীবনমানের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা জানান জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ ও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান তানু।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘একটি কারাম গাছের ডালকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এ উৎসব একসময় মিলনমেলায় রূপ নেয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখছেন ওরাঁও সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই কারাম উৎসব তাদের কাছে শুধু পূজা নয়, এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ। ওরাঁও সম্প্রদায়ের এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আরও বড় পরিসরে করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো দরকার।’













