শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছেন। কুঁচকে গেছে চামড়া, কমেছে দৃষ্টিশক্তি। হাঁটার গতিও আগের মতো নেই। যে বয়সে সন্তানের স্নেহের ছায়ায় নিশ্চিন্তে থাকার কথা, সেই বয়সে মাথায় ৭-৮ কেজি পাপড়ের গামলা তুলে রাস্তায় নামছেন আশির ঊর্ধ্ব আব্দুস সামাদ। এক গলি থেকে আরেক গলিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছেন পাপড়। প্রতি পিস ১০ টাকা। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই জোটে তার খাবার।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, মাথায় বড় গামলা নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছেন আব্দুস সামাদ। বয়সের ভারে শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, চোখেও আগের মতো দেখতে পান না। তবু থামছেন না। ক্রেতা ডাকলে গামলা নামিয়ে পাপড় তুলে দিচ্ছেন। মাথায় গামলা নিয়ে একটানা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কয়েক মুহূর্ত থেমে বিশ্রাম নেন, এরপর আবার শুরু করেন পথচলা। কারণ, তার প্রতিটি পাপড় বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দিনের খাবার। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে আজিমপুর কবরস্থানসহ আশপাশের এলাকায় পাপড় বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিদিন বিকালে গামলা মাথায় নিয়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অলিগলিতে ঘুরে পাপড় বিক্রি করেন। প্রতিদিন আয় হয় আনুমানিক ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর তার জীবন।
অসহায় বৃদ্ধ আব্দুস সামাদ যুগান্তরকে বলেন, আমি পাপড় ভাজা বিক্রি করি। মাথায় গামলা নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানসহ আশপাশের এলাকায় ঘুরি। প্রতি পিস পাপড় ১০ টাকা করে বিক্রি করি। দিনে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এই টাকা দিয়েই চলি। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করেই খাব।
বৃদ্ধ সামাদের কথায় নেই নিজের কষ্টের দীর্ঘ বর্ণনা। নেই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ। বয়সের ভারে শরীর যখন আর আগের মতো সায় দেয় না, তখনও তার মুখে একটাই দৃঢ়তা—অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমের বিনিময়ে খাবেন। তিনি বলেন, কারও কাছে হাত পাতিনি। যতদিন শ্বাস আছে, কাজ করেই খাব।
স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম সুমন বলেন, ‘সামাদ চাচাকে আমরা অনেক বছর ধরে এভাবেই দেখে আসছি। বয়স অনেক হয়েছে, শরীরও ভেঙে পড়েছে। তারপরও মাথায় গামলা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তার বয়সে মানুষের বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু তিনি এখনো নিজের খাবারের জন্য কাজ করছেন।’
আজিমপুর এলাকার স্থানীয় জসিম আহমেদ বলেন, অনেক সময় মানুষ তার বয়স ও কষ্ট দেখে বাড়তি টাকা দিতে চান। কিন্তু তিনি তা নিতে চান না। পাপড় কিনলে যে টাকা হয়, শুধু সেটাই নেন। তার আত্মসম্মান অনেক বেশি। তাকে দেখে ভালোও লাগে, আবার কষ্টও হয়।’
জানা গেছে, রাজধানীর লালবাগের শহীদনগর তিন নম্বর গলিতে মেয়ের সঙ্গে থাকেন আব্দুস সামাদ। তার সন্তান রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। উপযুক্ত এক ছেলেও রয়েছে। তবে শেষ বয়সে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানরা পুরোপুরি নিচ্ছেন না বলে জানা গেছে। ফলে আশির ঊর্ধ্ব বয়সেও নিজের জীবিকার জন্য তাকে কাজ করতে হচ্ছে।
সন্তানদের প্রসঙ্গ উঠলেও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না সামাদ। তার কণ্ঠে নেই ক্ষোভ, নেই অভিমান। নিজের কষ্টের জন্য কাউকে দায়ী না করে তিনি শুধু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথাই বলেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও তাই প্রতিদিন মাথায় গামলা তুলে বেরিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, অনেক পথচারী তার বয়স ও শারীরিক অবস্থা দেখে সহানুভূতি দেখান। কেউ বাড়তি টাকা দিতে চাইলে সামাদ অনেক সময় তা নিতে চান না। তার কাছে পাপড় বিক্রি করে পাওয়া ১০ টাকাই সম্মানের। দয়ার টাকা নয়, নিজের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া সামান্য অর্থেই তিনি বেঁচে থাকতে চান।
আশির ঊর্ধ্ব এক বৃদ্ধের মাথায় ৭-৮ কেজি পাপড়ের গামলা—দৃশ্যটি শুধু একজন ফেরিওয়ালার জীবিকার গল্প নয়; এর মধ্যে আছে বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, পরিবারের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার কঠিন লড়াই। যে বয়সে সন্তানের হাত ধরে নিশ্চিন্তে থাকার কথা, সেই বয়সে এক মুঠো ভাতের জন্য গলির পর গলি ঘুরে বেড়ান আব্দুস সামাদ। বিশ্রাম চাইলেও শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ নেই তার। মাথার গামলায় শুধু পাপড় নয়, রয়েছে বেঁচে থাকার তাগিদ ও আত্মসম্মান। সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে শরীর যতদিন সায় দেবে, ততদিন নিজের শ্রমেই বেঁচে থাকতে চান তিনি। তার ধীর পায়ে পথচলা যেন সমাজের কাছে রেখে যায় এক কঠিন প্রশ্ন—শেষ বয়সে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় কি তার নিজের শ্রমই হয়ে থাকবে?













