শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
সরকারি অর্থের অপচয় ঠেকাতে এবং জরুরি জনসেবা সচল রাখতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। আর্থিক ক্ষতি বা সেবায় বিঘ্ন ঘটার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এত দিন সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া কর্মীদের ওপর নির্ভর করে নিরীক্ষার কাজ চলত। কার্যকরভাবে নিরীক্ষা পরিচালনার সক্ষমতাও ছিল সীমিত। এই অবস্থার পরিবর্তনে স্থায়ী জনবল নিয়োগ ও স্বাধীন তদারকির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) থেকে শনিবার (১০ অক্টোবর) গাজীপুরের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: স্থায়িত্ব ও করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থ বিভাগের স্ট্রেংদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি (এসপিএফএমএস) এর আওতায় ইন্টারনাল অডিট এন্ড অডিট ফলো-আপ স্কিম এই কর্মশালার আয়োজন করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার। তিনি সংশোধিত ‘মডেল ঝুঁকিভিত্তিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা সনদ ও নির্দেশিকা ২০২৬’ উন্মোচন করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পরিচালনার জন্য এতে হালনাগাদ কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব দিলরুবা শাহীনা এবং অতিরিক্ত সচিব ও এসপিএফএমএসের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক জিয়াউল আবেদীন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুল মতিন। সরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থা স্থায়ীভাবে চালু রাখার পরিকল্পনা নিয়ে মূল উপস্থাপনা প্রদান করেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজাদ ছাল্লাল।
অর্থসচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থা চালু করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অর্থসচিব বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা চালু করার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই উদ্যোগকে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করা, যাতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হয়।’
২০২৪ সালের গ্লোবাল ইন্টার ন্যাশনাল অডিট স্ট্যনডিার্ড এর ভিত্তিতে সংশোধিত ‘মডেল ঝুঁকিভিত্তিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা সনদ ও নির্দেশিকা ২০২৬’-এ নিরীক্ষকদের কাজের পরিধি, দায়িত্ব এবং কাদের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারি কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও এতে রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সম্পদের সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং দুর্বলতা দূর করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়ার পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, নিরীক্ষকেরা নিরীক্ষাসংক্রান্ত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটির কাছে জবাবদিহি করবেন। আর প্রশাসনিক বিষয়ে তারা সচিব বা প্রধান হিসাবদানকারী কর্মকর্তার অধীনে থাকবেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো নিরীক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা বাড়ানো। পাশাপাশি, দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বাইরেও নিরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা।
এই উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা, সড়ক ও সরকারি অবকাঠামোর মান সরাসরি যুক্ত। অর্থ ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, দৈনন্দিন কার্যক্রম ও তথ্যপ্রযুক্তির দুর্বলতা থেকে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে। প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যেতে পারে, এমনকি সেবাও বন্ধ হতে পারে। ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব সমস্যা আগেই চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাব্যবস্থা স্থায়ী করার রূপরেখায় প্রশাসনিক অনুমোদন সাপেক্ষে তিন বছরে তিন ধাপে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে স্থায়ী নিরীক্ষা ইউনিট বা অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য নির্দিষ্ট জনবল, নিয়োগবিধি, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত অর্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মশালায় তিনটি বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন ছিল। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাহানা সংশোধিত ঝুঁকিভিত্তিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা সনদ ও নির্দেশিকা উপস্থাপন করেন। আলোচনায় আইবাস++-এর সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল তদারকি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং সময়মতো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ও উঠে আসে।
বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন ও প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌস রওশন আরা, রহিমা বেগম, সাহানা, মোহাম্মদ আবুল হাশেম, কে এম আলী আজম এবং যুগ্ম সচিব সৈয়দ রাশেদুল হোসেন।
পাঁচটি অধিদপ্তরের উপস্থাপনায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকে স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত করার অগ্রগতি ও বাধাগুলো উঠে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৯৩টি ঝুঁকি চিহ্নিত এবং ছয়টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে। অধিদপ্তরটি অপচয় কমানো, নিয়ম মেনে কাজ করা ও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল, অর্থ বরাদ্দ, দাপ্তরিক সুবিধা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের ওপর গুরুত্ব দেয়। গণপূর্ত অধিদপ্তর ৭০টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে এবং বার্ষিক নিরীক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়েছে। তবে নিরীক্ষায় উঠে আসা অনেক সমস্যার সমাধান হয়নি। সীমিত স্বাধীনতা, শূন্য পদ ও দুর্বল সমন্বয় কাটাতে দায়িত্ব স্পষ্ট করা, সময়সীমা নির্ধারণ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে অগ্রগতি দেখা এবং কমিটির তদারকি বাড়ানোর প্রয়োজন তুলে ধরা হয়। এলজিইডি ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষায় এসে ৭৮টি ব্যয়কেন্দ্রে নিরীক্ষা চালিয়ে ৩০০টি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তবে অস্থায়ী জনবল, দক্ষতার ঘাটতি ও স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের ১৩ সদস্যের নিরীক্ষা ইউনিট, ৪১টি ঝুঁকি এবং রায়পুরা ও লক্ষ্মীপুর সদরে পরীক্ষামূলক নিরীক্ষার তথ্য তুলে ধরে।
জনবল, প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কারিগরি সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অধিদপ্তরটি ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরির কথা জানায়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ৮২টি ঝুঁকি চিহ্নিত এবং ছয়টি প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে।
এতে কেনাকাটা, চুক্তি, ভূমি অধিগ্রহণ, জনবল ও ডিজিটাল ব্যবস্থার দুর্বলতা উঠে আসে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নিরীক্ষার কাজ দেওয়ার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জনসেবায় স্থায়ী উন্নতি আনতে সব অধিদপ্তরই নিরীক্ষায় চিহ্নিত সমস্যা সমাধান এবং কমিটির নিয়মিত তদারকির ওপর জোর দেয়।
কর্মশালায় ২০২৬-২০৩১ সালের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। এতে স্থায়ী সরকারি কাঠামো, পর্যাপ্ত বাজেট, পেশাগত দক্ষতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষকদের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা দূর করার পদক্ষেপকে সরকারি প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ করে তোলা।












