জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের ৪টি ইউনিয়ন) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন এলাকার বিএনপি’র তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। সদ্য বিএনপিতে যোগ দেয়া জোটের পক্ষ থেকেই গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান দলীয় মনোনয়ন পেলেও ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মানতে নারাজ স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে জটিল ও বহুমাত্রিক সমীকরণ।
কালীগঞ্জ উপজেলার ১১টি ও সদরের ৪টি মোট ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনটি ঐতিহ্যগতভাবেই ১৯৯০ সাল থেকে বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এবার এ আসনে ধানের শীষের দাবিদার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজসহ স্থানীয় একাধিক নেতা। এখানে রাশেদ খানকে প্রথমে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়। পরে তিনি বিএনপিতে যোগদান করলে তাকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। কিন্তু রাশেদ খানকে মনোনয়ন দেয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়, যা কাফনের কাপড় পরে মিছিল পর্যন্ত গড়ায়। যদিও হাইকমান্ডের নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে হামিদুল ইসলাম হামিদ ও মুর্শিদা জামান রাশেদের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। তবে মাঠের বড় একটি অংশ এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী ফিরোজের পক্ষেই অনড় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ফিরোজ এলাকায় একজন জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ। সাংগঠনিক রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তার নিজস্ব অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, জোর করে কাউকে চাপিয়ে দিলে কালীগঞ্জের মানুষ বহিরাগতকে মানবেন না। রাশেদ খান কোনোদিন কালীগঞ্জে আসেননি। এলাকার ভোটাররা তাকে কেউ চেনেও না। ভোটের ডামাডোল শুরু হলে রাশেদ খান ঝিনাইদহ-২ আসনে গণসংযোগ করেছেন কয়েক মাস যাবৎ। কালীগঞ্জে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সুখ- দুঃখে পাশে থাকার কোনো অবদান তার নেই।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাইফুল ইসলাম ফিরোজের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে ভোটাররা। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা থাকায় এই আসনের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। ভোটারদের কথায় স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তি পরিচিতি, এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতিই প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার প্রবীণ ভোটার অখিলউদ্দিন বলেন, ‘ফিরোজ এলাকায় বহু সামাজিক কাজ করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে তার ব্যক্তি মূল্যায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
কালীগঞ্জ পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক জুয়েল রানা বলেন, ‘বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা কখনো রাশেদ খানকে পাশে পাইনি। তিনি কালীগঞ্জের বাসিন্দাও না। তিনি ঝিনাইদহ সদরের ভোটার। ভোট হয়ে গেলে তিনি ঝিনাইদহ চলে যাবেন।’ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সুজাউদ্দিন মাহমুদ পিয়াল বলেন, ‘ফিরোজের পক্ষে বিএনপি ও সকল অঙ্গ-সংগঠন ঐক্যবদ্ধ আছে। তাকে বিজয়ী করেই ঘরে ফিরবেন কালীগঞ্জ বিএনপি’র নেতাকর্মীরা।’ কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ফিরোজ আমাদের পরামর্শে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি তৃণমূলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের অনুমতি নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। আমরা ফিরোজের সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে শেষ পর্যন্ত থাকবো।’ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ৮০ শতাংশই তার সঙ্গে আছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘যে আমাদের এলাকার ভোটার না, তাকে আমরা পছন্দ করছি না। আমি ভোটের মাঠে না থাকলে সব ভোট জামায়াতের বাক্সে চলে যেত। কালীগঞ্জের মানুষ এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কালীগঞ্জে বিএনপি’র তৃণমূলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে ছিলাম, আছি, আগামীতেও থাকবো ইনশাআল্লাহ। তাই তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচনে বিএনপি’র নেতাকর্মী-সমর্থকরা বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবেন।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই আসনে উন্নয়ন ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই তার মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে, বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী রাশেদ খানও বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি নয়, ধানের শীষই এখানে মূল ফ্যাক্ট। বিএনপি’র যারা প্রকৃত জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করে, তারা তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না। এখানে অতীতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কেউ বিজয়ী হতে পারেন নাই। ঝিনাইদহ জেলা বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট এমএ মজিদও একই সুরে কথা বলেন। তার মতে, ‘সাময়িক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বিএনপি’র সমর্থকরা ধানের শীষেই ভোট দেবে। জামায়াতের ভোট জামায়াতই পাবে, বিএনপি’র ভোট জামায়াতের পাওয়ার সুযোগ নেই।’
ঝিনাইদহ-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬১ জন। এ আসনে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন বিএনপি’র শহীদুজ্জামান বেল্টু। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনটি নির্বাচনে নিশিরাতে এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের আনোয়ারুল আজম আনার নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালে ভারতের কলকাতায় খুন হন সাবেক এমপি আনার।












